মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন সামরিক সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যেই ইরানের রাজধানী তেহরানে আকস্মিক সফরে পৌঁছেছেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি। তেহরানের শীর্ষ কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা নেতৃত্বের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার এবং যৌথ নিরাপত্তা পদক্ষেপের লক্ষ্যেই এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক সংঘর্ষ এড়াতে পাকিস্তান যখন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখছে, ঠিক তখনই এই সফরের ঘোষণা এলো।
মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে নতুন করে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠার প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতা তীব্রতর হয়ে উঠেছে। একদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর নতুন অভিযানের আশঙ্কা, অন্যদিকে ইরানের কঠোর অবস্থানের মুখে পুরো অঞ্চলজুড়ে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই নাজুক ও সংকটময় পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী দেশ ইরানের সাথে সম্পর্ক মজবুত করা এবং উত্তেজনা হ্রাসের লক্ষ্য নিয়ে তেহরান পৌঁছেছেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি।
ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সংযোগ শক্তিশালী করা এবং চলমান কৌশলগত উদ্যোগগুলোর কার্যকর সমন্বয় সাধনের জন্যই এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নকভি ইরানি শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকে সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থায়িত্ব এবং সার্বিক উম্মাহর অর্থনৈতিক ও সামরিক স্থিতিশীলতার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চরম সামরিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন কমাতে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। দুই চিরবৈরী দেশের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করা ইসলামাবাদের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হলেও কূটনৈতিক সুরক্ষার স্বার্থে পাকিস্তান এ প্রচেষ্টায় অনড়। এর আগেও এই মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নকভি একাধিকবার তেহরানে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন।
উল্লেখ্য, কূটনৈতিক প্রচেষ্টার একটি বড় সাফল্য হিসেবে গত জুন মাসে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ওই সমঝোতাকে ভিত্তি করে স্থায়ী একটি চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে উভয় পক্ষ আলোচনার টেবিলে বসেছিল। কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ের সমঝোতা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
চুক্তিটি ভেস্তে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ ছিল নিরাপত্তা নিশ্চয়তার সুনির্দিষ্ট শর্তাবলী এবং কৌশলগতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ 'হরমুজ প্রণালী'-তে অবাধ ও নিরাপদ নৌ চলাচলের অধিকার। এ বিষয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার মতপার্থক্য তীব্র আকার ধারণ করলে আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ে।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেকোনো মুহূর্তে মার্কিন বাহিনী নতুন করে হামলা চালাতে পারে কিংবা হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হয়ে বৈশ্বিক সংকট তৈরি হতে পারে—এমন আতঙ্কে গোটা মধ্যপ্রাচ্য থমথমে হয়ে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা পাকিস্তানসহ পুরো মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক ও সামরিক নিরাপত্তায় আঘাত হানবে। এই বাস্তবতায় পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আকস্মিক তেহরান মিশন বৈশ্বিক কূটনৈতিক অঙ্গনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও আশার সঞ্চারকারী এক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মতামত