মিয়ানমারে চলমান তীব্র গৃহযুদ্ধ এবং সহিংসতার কারণে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমের নিজ ভূমি আরাকানে (রাখাইন) ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন ফের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। জাতিসংঘের মিয়ানমার স্বাধীন তদন্ত মেকানিজমের (IIMM) প্রধান নিকোলা কৌমজিয়ান এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই ভয়াবহ বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেছেন।
মিয়ানমারে ভয়াবহ সংঘাত ও বেসামরিকদের দুর্দশা
নিকোলা কৌমজিয়ান জানান, বর্তমানে মিয়ানমারজুড়ে এক অত্যন্ত তীব্র ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলছে। দেশের কেন্দ্রবহির্ভূত অঞ্চল, সমস্ত সীমান্ত এবং সাগাইংয়ের মতো প্লাবনভূমিগুলোতে এই সংঘাতের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। তবে আরাকান রাজ্যে অবস্থানরত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের পরিস্থিতি আরও বেশি মর্মান্তিক ও ভয়াবহ। সেখানে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র মধ্যে অতিমাত্রায় ধ্বংসাত্মক লড়াই চলছে। সামরিক জান্তা সম্প্রতি হারানো ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের জন্য মরিয়া হয়ে হামলা চালালেও তারা দেশের ১৭টি প্রশাসনিক অঞ্চলের ১৪টির ওপর থেকেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। এই ত্রিমুখী ও বহুমুখী সংঘাতে সাধারণ মানুষ তথা মুসলিমরাই সবচেয়ে বেশি মূল্য পরিশোধ করছে। অবিরাম বিমান হামলা ও ভারী আর্টিলারি শেলিংয়ে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে স্কুল, হাসপাতাল এবং উপাসনালয়ের মতো বেসামরিক স্থাপনাগুলোকে।
জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে ভিন্নমতের লোকজনকে নির্বিচারে আটক করা হচ্ছে। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সামান্যতম টু শব্দ করলেই বা গত বছরের শেষ ও চলতি বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত একপাক্ষিক নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা করলেই সাধারণ নাগরিকদের কারাগারে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। জাতিসংঘের এই তদন্ত দলের প্রধান জানান, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ অতীতে বা বর্তমানে কখনোই তাদের দেশে প্রবেশ করতে দেয়নি; এমনকি ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের আগের গণতান্ত্রিক সরকারও তাদের প্রবেশাধিকার অস্বীকার করেছিল। ফলে তাদের সম্পূর্ণ কার্যক্রম চালাতে হয় দেশটিতে থাকা বিভিন্ন সূত্র ও প্রবাসী নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করে। তবে জান্তা সরকার এখন নজরদারির জন্য উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করায় অভ্যন্তরীণ উৎসগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করাও দিন দিন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কক্সবাজারের মানবেতর ক্যাম্পজীবন ও নিরাপত্তাহীনতা
সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করা কৌমজিয়ান জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। এর মধ্যে ১৯৯০-এর দশকে পালিয়ে এসে স্থায়ী হওয়া এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে আসা মানুষরাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। এর বাইরেও ২০২৪ সাল থেকে নতুন করে পালিয়ে আসা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষসহ মোট ১.৩ মিলিয়ন মানুষ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ কক্সবাজারের পাহাড়ি ক্যাম্পে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
ক্যাম্পগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বনের জমি কেটে খাড়া পাহাড়ি ঢালে এসব তাবু ও বসতি তৈরি করা হয়েছে। ফলে সামান্য বর্ষা নামলেই ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া তাঁবুগুলো এতটাই কাছাকাছি এবং গায়ে গায়ে লাগানো যে, প্রায়শই ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ডে শত শত ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কর্মসংস্থান, স্বাধীনভাবে চলাফেরা এবং শিক্ষার সুযোগ না থাকায় এই বিশাল জনগোষ্ঠী দীর্ঘ ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে এক অবরুদ্ধ ও অনিশ্চিত বন্দিদশায় দিন কাটাচ্ছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালের সহিংসতার শিকার প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে কেবল একটি নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের আশার প্রহর গুনছেন।
প্রত্যাবর্তনের পথে পাহাড়সম বাধা
কৌমজিয়ান আরও জানান, কক্সবাজারের ক্যাম্পে নতুন আশ্রয় নেওয়া উত্তর আরাকানের মানুষরা জানিয়েছেন যে, আরাকান আর্মি কর্তৃক সাধারণ মানুষকে অপহরণ, জোরপূর্বক দুই পক্ষের সামরিক বাহিনীতে (মিয়ানমার সেনাবাহিনী বা আরাকান আর্মি) নিয়োগ দেওয়ার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়মিত ঘটছে। অনেক রোহিঙ্গা মুসলিমের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং স্থানীয় মিলিশিয়ারা তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে। অনেকেরই পরিবারের প্রিয়জন এখনও নিখোঁজ বা জিম্মি রয়েছে। এমন একটি মৃত্যুউপত্যকায় পরিণত হওয়া জনপদে কোনোভাবেই রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক সহায়তা
মিয়ানমারের নির্যাতিত সাধারণ মানুষ নিজেদের দেশে একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের অধিকার চায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সংকটের স্থায়ী সমাধানে আরও কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান কৌমজিয়ান। একই সঙ্গে সংকটের এই দীর্ঘস্থায়ী মুহূর্তে বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর অবদান প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেন। বিশেষ করে, বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবা প্রদানে নিয়োজিত ‘তুর্কি ফিল্ড হসপিটাল’ (Türk Sahra Hastanesi)-এর কার্যক্রম রোহিঙ্গা মুসলিমদের জন্য একটি বিরাট আশীর্বাদ ও অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত বলে তিনি তুরস্ক সরকারকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যত দ্রুত ও দৃঢ়ভাবে এই বর্বরতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে, মাঠের পরিস্থিতি বদলানোর গতি ততই ত্বরান্বিত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মতামত