বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
কওমী টাইমস

যুদ্ধবিরতি চুক্তির অধীনে গাজায় হামাসের হাতে থাকা ২০ ইসরায়েলিকে মুক্তি দিল আন্তর্জাতিক রেডক্রস, একই দিনে ইসরায়েল মুক্তি দিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তসহ ৯৬ ফিলিস্তিনি বন্দীকে

জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে মুক্ত হলেন ৯৬ ফিলিস্তিনি, উল্লাসে হামলা চালাল ইসরায়েলি সেনারা


কওমী টাইমস ডেস্ক
কওমী টাইমস ডেস্ক
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে মুক্ত হলেন ৯৬ ফিলিস্তিনি, উল্লাসে হামলা চালাল ইসরায়েলি সেনারা

গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপ হিসেবে সফলভাবে সম্পন্ন হলো এক গুরুত্বপূর্ণ বন্দী বিনিময় প্রক্রিয়া। হামাস জিম্মিদের আন্তর্জাতিক রেডক্রসের হাতে তুলে দেওয়ার পর ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ৯৬ জন ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দিয়েছে। এই বিনিময় একদিকে যেমন যুদ্ধের মানবিক দিকটিকে তুলে ধরেছে, অন্যদিকে তেমনি ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি ঘিরে সৃষ্ট উল্লাসে ইসরায়েলি সেনাদের হামলার ঘটনায় পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

১০ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে কার্যকর হওয়া ইসরায়েল ও হামাসের যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে গতকাল, ১৩ অক্টোবর, গাজায় বন্দী বিনিময়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। চুক্তির অংশ হিসেবে হামাস প্রথমে ২০ জন ইসরায়েলি জিম্মিকে আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির (ICRC) কাছে হস্তান্তর করে। গাজা উপত্যকার দক্ষিণাঞ্চলে খান ইউনিসে এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

প্রথমে সকাল ৮টার দিকে ৭ জন ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেয় হামাস। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নিশ্চিত করে যে এই জিম্মিদের রেডক্রসের কাছ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে এবং তারা সীমান্ত অতিক্রম করে ইসরায়েলে প্রবেশ করেছেন। প্রথম দফায় মুক্তি পাওয়া জিম্মিদের মধ্যে ছিলেন মাতান আঙ্গ্রেস্ট, অ্যালন ওহেল, গাই গিলবোয়া-দালাল, গাল্লি বারম্যান, জিভ বারম্যান, এইতান মূর এবং ওমরি মিরান। পরে অবশিষ্ট ১৩ জন জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হলে গাজায় হামাসের হাতে থাকা ২০ জন ইসরায়েলি জিম্মির সবাইকে মুক্তি দেওয়া সম্পন্ন হয়। ইসরায়েলে পৌঁছানোর পর সকল জিম্মিকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

এই বন্দী বিনিময়ের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, হামাস বন্দীদের মুক্তির আগে তাদের পরিবারের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার অনুমতি দেয়। ইসরায়েলি গণমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনোতের খবর অনুসারে, জিম্মি মাতান জাঙ্গাউকারের মা আইনভ ফোনে তার ছেলেকে বলেন, "মাতান, তুমি বাড়ি ফিরছো। তোমরা সবাই ফিরছো। যুদ্ধ শেষ হয়েছে। তোমরা বাড়ি ফিরছো।" এই ধরনের ফোন কল ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে অতীতের বন্দী বিনিময়ের ইতিহাসে প্রথমবার ঘটেছে, যা মানবিক দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

অন্যদিকে, বন্দী বিনিময় চুক্তির প্রথম ধাপ মেনে ইসরায়েলও ৯৬ জন ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দিয়েছে। এদের মধ্যে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীরাও রয়েছেন। ফিলিস্তিনের সরকারি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লার নিকটবর্তী ওফার কারাগার থেকে এই বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তির পর ফিলিস্তিনি বন্দীদের রামাল্লার সংস্কৃতি প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তাদের গাজা উপত্যকার দক্ষিণপ্রান্তে অবস্থিত নাসের হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়।

মুক্ত হওয়া বন্দীদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানোর জন্য গাজার সরকার পরিচালিত প্রেস অফিস জানায়, ৭ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রস্তুতি নিয়েছিলেন এবং ইসরায়েলি কারাগারে দীর্ঘ সময় কাটানো ফিলিস্তিনি বন্দীদের স্বাস্থ্যসেবাসহ অন্যান্য পরিষেবা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

তবে আনন্দের এই মুহূর্তে রামাল্লার কাছে ওফার কারাগারের বাইরে অপেক্ষমাণ ফিলিস্তিনিদের ভিড়ে ইসরায়েলি সেনারা আক্রমণ চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, এই হামলায় এক ফিলিস্তিনি যুবক পায়ে আসল গুলিতে আহত হন। সেনারা ভিড়ের উপর ড্রোন থেকে কাঁদানে গ্যাস ও সতর্কতা লেখা কাগজ নিক্ষেপ করে। কাগজগুলোতে "আমরা আপনাদের সবাইকে পর্যবেক্ষণ করছি, কেউ যেন কোনো আনন্দ প্রকাশ না করে" বলে হুমকি দেওয়া হয়। এছাড়াও, ইসরায়েলি সেনারা ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। ওফার কারাগারের রামাল্লামুখী গেটে বিপুল সংখ্যক সামরিক যান ও বুলডোজার মোতায়েন ছিল।

হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জেদিন আল-কাসসাম ব্রিগেডস এক লিখিত বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই যুদ্ধবিরতি এবং বন্দী বিনিময় ফিলিস্তিনি জনগণের দৃঢ়তা ও প্রতিরোধের ফল। তারা ঘোষণা করে, যতক্ষণ ইসরায়েল চুক্তি মেনে চলবে, ততক্ষণ তারাও চুক্তির শর্ত ও সময়সূচি মেনে চলবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, "শত্রু তার ক্ষমতা ও গোয়েন্দা থাকা সত্ত্বেও সামরিক চাপের মাধ্যমে তার বন্দীদের উদ্ধার করতে পারেনি। এখন তারা নতি স্বীকার করছে এবং প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বন্দী বিনিময়ের মাধ্যমে তার বন্দীদের ফিরিয়ে নিচ্ছে।"

এই চুক্তির মাধ্যমে গত ৮ অক্টোবর ২০২৩ থেকে যুদ্ধবিরতির আগে পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় নিহত ৬৭ হাজার ৬৮২ জন এবং আহত ১ লক্ষ ৭০ হাজার ৩৩ জনের পরিসংখ্যানের মাঝে একটি ক্ষণিকের স্বস্তি ও মানবিকতার বার্তা পৌঁছে গেল।

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে মুক্ত হলেন ৯৬ ফিলিস্তিনি, উল্লাসে হামলা চালাল ইসরায়েলি সেনারা

প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৫

featured Image

গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপ হিসেবে সফলভাবে সম্পন্ন হলো এক গুরুত্বপূর্ণ বন্দী বিনিময় প্রক্রিয়া। হামাস জিম্মিদের আন্তর্জাতিক রেডক্রসের হাতে তুলে দেওয়ার পর ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ৯৬ জন ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দিয়েছে। এই বিনিময় একদিকে যেমন যুদ্ধের মানবিক দিকটিকে তুলে ধরেছে, অন্যদিকে তেমনি ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি ঘিরে সৃষ্ট উল্লাসে ইসরায়েলি সেনাদের হামলার ঘটনায় পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

১০ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে কার্যকর হওয়া ইসরায়েল ও হামাসের যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে গতকাল, ১৩ অক্টোবর, গাজায় বন্দী বিনিময়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। চুক্তির অংশ হিসেবে হামাস প্রথমে ২০ জন ইসরায়েলি জিম্মিকে আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির (ICRC) কাছে হস্তান্তর করে। গাজা উপত্যকার দক্ষিণাঞ্চলে খান ইউনিসে এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

প্রথমে সকাল ৮টার দিকে ৭ জন ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেয় হামাস। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নিশ্চিত করে যে এই জিম্মিদের রেডক্রসের কাছ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে এবং তারা সীমান্ত অতিক্রম করে ইসরায়েলে প্রবেশ করেছেন। প্রথম দফায় মুক্তি পাওয়া জিম্মিদের মধ্যে ছিলেন মাতান আঙ্গ্রেস্ট, অ্যালন ওহেল, গাই গিলবোয়া-দালাল, গাল্লি বারম্যান, জিভ বারম্যান, এইতান মূর এবং ওমরি মিরান। পরে অবশিষ্ট ১৩ জন জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হলে গাজায় হামাসের হাতে থাকা ২০ জন ইসরায়েলি জিম্মির সবাইকে মুক্তি দেওয়া সম্পন্ন হয়। ইসরায়েলে পৌঁছানোর পর সকল জিম্মিকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

এই বন্দী বিনিময়ের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, হামাস বন্দীদের মুক্তির আগে তাদের পরিবারের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার অনুমতি দেয়। ইসরায়েলি গণমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনোতের খবর অনুসারে, জিম্মি মাতান জাঙ্গাউকারের মা আইনভ ফোনে তার ছেলেকে বলেন, "মাতান, তুমি বাড়ি ফিরছো। তোমরা সবাই ফিরছো। যুদ্ধ শেষ হয়েছে। তোমরা বাড়ি ফিরছো।" এই ধরনের ফোন কল ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে অতীতের বন্দী বিনিময়ের ইতিহাসে প্রথমবার ঘটেছে, যা মানবিক দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

অন্যদিকে, বন্দী বিনিময় চুক্তির প্রথম ধাপ মেনে ইসরায়েলও ৯৬ জন ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দিয়েছে। এদের মধ্যে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীরাও রয়েছেন। ফিলিস্তিনের সরকারি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লার নিকটবর্তী ওফার কারাগার থেকে এই বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তির পর ফিলিস্তিনি বন্দীদের রামাল্লার সংস্কৃতি প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তাদের গাজা উপত্যকার দক্ষিণপ্রান্তে অবস্থিত নাসের হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়।

মুক্ত হওয়া বন্দীদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানোর জন্য গাজার সরকার পরিচালিত প্রেস অফিস জানায়, ৭ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রস্তুতি নিয়েছিলেন এবং ইসরায়েলি কারাগারে দীর্ঘ সময় কাটানো ফিলিস্তিনি বন্দীদের স্বাস্থ্যসেবাসহ অন্যান্য পরিষেবা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

তবে আনন্দের এই মুহূর্তে রামাল্লার কাছে ওফার কারাগারের বাইরে অপেক্ষমাণ ফিলিস্তিনিদের ভিড়ে ইসরায়েলি সেনারা আক্রমণ চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, এই হামলায় এক ফিলিস্তিনি যুবক পায়ে আসল গুলিতে আহত হন। সেনারা ভিড়ের উপর ড্রোন থেকে কাঁদানে গ্যাস ও সতর্কতা লেখা কাগজ নিক্ষেপ করে। কাগজগুলোতে "আমরা আপনাদের সবাইকে পর্যবেক্ষণ করছি, কেউ যেন কোনো আনন্দ প্রকাশ না করে" বলে হুমকি দেওয়া হয়। এছাড়াও, ইসরায়েলি সেনারা ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। ওফার কারাগারের রামাল্লামুখী গেটে বিপুল সংখ্যক সামরিক যান ও বুলডোজার মোতায়েন ছিল।

হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জেদিন আল-কাসসাম ব্রিগেডস এক লিখিত বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই যুদ্ধবিরতি এবং বন্দী বিনিময় ফিলিস্তিনি জনগণের দৃঢ়তা ও প্রতিরোধের ফল। তারা ঘোষণা করে, যতক্ষণ ইসরায়েল চুক্তি মেনে চলবে, ততক্ষণ তারাও চুক্তির শর্ত ও সময়সূচি মেনে চলবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, "শত্রু তার ক্ষমতা ও গোয়েন্দা থাকা সত্ত্বেও সামরিক চাপের মাধ্যমে তার বন্দীদের উদ্ধার করতে পারেনি। এখন তারা নতি স্বীকার করছে এবং প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বন্দী বিনিময়ের মাধ্যমে তার বন্দীদের ফিরিয়ে নিচ্ছে।"

এই চুক্তির মাধ্যমে গত ৮ অক্টোবর ২০২৩ থেকে যুদ্ধবিরতির আগে পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় নিহত ৬৭ হাজার ৬৮২ জন এবং আহত ১ লক্ষ ৭০ হাজার ৩৩ জনের পরিসংখ্যানের মাঝে একটি ক্ষণিকের স্বস্তি ও মানবিকতার বার্তা পৌঁছে গেল।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মুস্তাইন বিল্লাহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত