ইয়েমেনে চলমান সংঘাতে নতুন মোড় নিয়েছে পরিস্থিতি। দক্ষিণ ইয়েমেনের আবিয়ান প্রদেশ সরকারি বাহিনীর উপস্থিতিকে স্বাগত জানিয়েছে, যা দক্ষিণী ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) প্রভাব হ্রাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের রিয়াদে দক্ষিণ ইয়েমেনি পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে। সামরিক অগ্রগতি ও কূটনৈতিক তৎপরতা মিলিয়ে দেশটির রাজনৈতিক মানচিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন স্পষ্ট হচ্ছে।
ইয়েমেনে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দ্রুতগতির সামরিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। বৈধ ইয়েমেনি সরকার দেশটির মোট ভূখণ্ডের অর্ধেকেরও বেশি এলাকায় পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। মাত্র তিন দিন আগে সরকার হাদরামাউত ও মাহরা প্রদেশ পুনর্দখল করে, যা ডিসেম্বরের শুরুতে দক্ষিণী ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল।
৩০ ডিসেম্বর ইয়েমেনে এক নজিরবিহীন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সৌদি আরব অভিযোগ করে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাত দক্ষিণ ইয়েমেনকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পক্ষে থাকা এসটিসি বাহিনীকে সীমান্তবর্তী হাদরামাউত ও মাহরায় সামরিক অভিযানে উসকানি দিয়েছে। একই দিনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হাদরামাউতে আমিরাত থেকে আসা একটি অস্ত্রবাহী চালান লক্ষ্য করে হামলার ঘোষণা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের প্রধান রশাদ আল-আলিমি আমিরাতের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিল করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের বাহিনী প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে, আমিরাত এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, অস্ত্র চালানটি ছিল শুধুমাত্র তাদের নিজস্ব বাহিনীর জন্য। তারা ইয়েমেন থেকে অবশিষ্ট সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণাও দেয়।
দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী এসটিসি দীর্ঘদিন ধরে উত্তর ইয়েমেন থেকে আলাদা রাষ্ট্রের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে ইয়েমেনি সরকার এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার অবস্থানে অনড় রয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালের ২২ মে উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন একত্রিত হয়ে বর্তমান ইয়েমেন প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়।
আবিয়ান সরকারের পাশে
দক্ষিণ ইয়েমেনের আবিয়ান প্রদেশে এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখা গেছে। এসটিসির নিয়ন্ত্রণাধীন এই প্রদেশের নিরাপত্তা কমিটি মঙ্গলবার জানায়, তারা সরকারি বাহিনী ‘দিরা আল-ওয়াতান’-এর মোতায়েনকে স্বাগত জানিয়েছে। প্রদেশের গভর্নর ও সামরিক কমান্ডার আবু বকর হুসেইন সালেমের নেতৃত্বে জারি করা বিবৃতিতে বলা হয়, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং হুথি বিদ্রোহীদের সুবিধা দিতে পারে এমন অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ এড়াতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কমিটি সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোটের ভূমিকার প্রশংসা করে জানায়, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় জোটের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে আবিয়ানের সকল নিরাপত্তা ও সামরিক ইউনিটকে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
আদেনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি
আবিয়ানের অবস্থানের পর আদেন শহরের নিরাপত্তা কমিটি গভর্নর আহমেদ হামেদ লামলাসের সভাপতিত্বে বৈঠক করে। এসটিসি নিয়ন্ত্রিত এই কমিটি জানায়, আদেনের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল এবং নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তারা সরকারি প্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতার ওপর জোর দেয়।
হাদরামাউতে স্থিতিশীলতা জোরদার
সরকারি বাহিনী হাদরামাউতের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর প্রদেশটির গভর্নর আহমেদ আল-খানবাশি সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। মুকাল্লা শহরে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে নিরাপত্তা জোরদার, কারাগার ও সরকারি দপ্তর সুরক্ষা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
রিয়াদে সংলাপের প্রস্তুতি
এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে রিয়াদে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে। এসটিসির একাধিক প্রতিনিধি দল, যার একটির নেতৃত্বে রয়েছেন সংগঠনের প্রধান আইদরুস আল-জুবাইদি, সৌদি আরবে যাত্রা করেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, দক্ষিণ ইয়েমেন প্রশ্ন ও আন্তঃদলীয় সংলাপই হবে এ বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয়।
এরই মধ্যে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান এসটিসির উপপ্রধান আবদুর রহমান আল-মুহাররির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। উভয় পক্ষ ইয়েমেনের বর্তমান পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে মতবিনিময় করেন। যদিও সৌদি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি, বিশ্লেষকদের মতে এই আলোচনা ইয়েমেন সংকট সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।
বিষয় : ইয়েমেন

বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬
ইয়েমেনে চলমান সংঘাতে নতুন মোড় নিয়েছে পরিস্থিতি। দক্ষিণ ইয়েমেনের আবিয়ান প্রদেশ সরকারি বাহিনীর উপস্থিতিকে স্বাগত জানিয়েছে, যা দক্ষিণী ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) প্রভাব হ্রাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের রিয়াদে দক্ষিণ ইয়েমেনি পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে। সামরিক অগ্রগতি ও কূটনৈতিক তৎপরতা মিলিয়ে দেশটির রাজনৈতিক মানচিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন স্পষ্ট হচ্ছে।
ইয়েমেনে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দ্রুতগতির সামরিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। বৈধ ইয়েমেনি সরকার দেশটির মোট ভূখণ্ডের অর্ধেকেরও বেশি এলাকায় পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। মাত্র তিন দিন আগে সরকার হাদরামাউত ও মাহরা প্রদেশ পুনর্দখল করে, যা ডিসেম্বরের শুরুতে দক্ষিণী ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল।
৩০ ডিসেম্বর ইয়েমেনে এক নজিরবিহীন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সৌদি আরব অভিযোগ করে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাত দক্ষিণ ইয়েমেনকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পক্ষে থাকা এসটিসি বাহিনীকে সীমান্তবর্তী হাদরামাউত ও মাহরায় সামরিক অভিযানে উসকানি দিয়েছে। একই দিনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হাদরামাউতে আমিরাত থেকে আসা একটি অস্ত্রবাহী চালান লক্ষ্য করে হামলার ঘোষণা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের প্রধান রশাদ আল-আলিমি আমিরাতের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিল করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের বাহিনী প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে, আমিরাত এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, অস্ত্র চালানটি ছিল শুধুমাত্র তাদের নিজস্ব বাহিনীর জন্য। তারা ইয়েমেন থেকে অবশিষ্ট সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণাও দেয়।
দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী এসটিসি দীর্ঘদিন ধরে উত্তর ইয়েমেন থেকে আলাদা রাষ্ট্রের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে ইয়েমেনি সরকার এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার অবস্থানে অনড় রয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালের ২২ মে উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন একত্রিত হয়ে বর্তমান ইয়েমেন প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়।
আবিয়ান সরকারের পাশে
দক্ষিণ ইয়েমেনের আবিয়ান প্রদেশে এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখা গেছে। এসটিসির নিয়ন্ত্রণাধীন এই প্রদেশের নিরাপত্তা কমিটি মঙ্গলবার জানায়, তারা সরকারি বাহিনী ‘দিরা আল-ওয়াতান’-এর মোতায়েনকে স্বাগত জানিয়েছে। প্রদেশের গভর্নর ও সামরিক কমান্ডার আবু বকর হুসেইন সালেমের নেতৃত্বে জারি করা বিবৃতিতে বলা হয়, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং হুথি বিদ্রোহীদের সুবিধা দিতে পারে এমন অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ এড়াতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কমিটি সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোটের ভূমিকার প্রশংসা করে জানায়, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় জোটের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে আবিয়ানের সকল নিরাপত্তা ও সামরিক ইউনিটকে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
আদেনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি
আবিয়ানের অবস্থানের পর আদেন শহরের নিরাপত্তা কমিটি গভর্নর আহমেদ হামেদ লামলাসের সভাপতিত্বে বৈঠক করে। এসটিসি নিয়ন্ত্রিত এই কমিটি জানায়, আদেনের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল এবং নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তারা সরকারি প্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতার ওপর জোর দেয়।
হাদরামাউতে স্থিতিশীলতা জোরদার
সরকারি বাহিনী হাদরামাউতের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর প্রদেশটির গভর্নর আহমেদ আল-খানবাশি সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। মুকাল্লা শহরে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে নিরাপত্তা জোরদার, কারাগার ও সরকারি দপ্তর সুরক্ষা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
রিয়াদে সংলাপের প্রস্তুতি
এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে রিয়াদে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে। এসটিসির একাধিক প্রতিনিধি দল, যার একটির নেতৃত্বে রয়েছেন সংগঠনের প্রধান আইদরুস আল-জুবাইদি, সৌদি আরবে যাত্রা করেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, দক্ষিণ ইয়েমেন প্রশ্ন ও আন্তঃদলীয় সংলাপই হবে এ বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয়।
এরই মধ্যে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান এসটিসির উপপ্রধান আবদুর রহমান আল-মুহাররির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। উভয় পক্ষ ইয়েমেনের বর্তমান পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে মতবিনিময় করেন। যদিও সৌদি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি, বিশ্লেষকদের মতে এই আলোচনা ইয়েমেন সংকট সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।

আপনার মতামত লিখুন