শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
কওমী টাইমস

ভিন্ন রাজ্যে কর্মসংস্থানে গিয়ে হামলার শিকার বাংলার শ্রমিক; জাতীয় সড়ক অবরোধ করে বিচারের দাবিতে উত্তাল জনতা

মুসলিম শ্রমিকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার: বাংলাদেশি অপবাদে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুসলিম শ্রমিকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার: বাংলাদেশি অপবাদে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ

ভারতের ঝাড়খণ্ডে এক পরিযায়ী শ্রমিকের রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। পরিবারের অভিযোগ, নিহত ব্যক্তিকে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে। এই দাবিকে ঘিরে সড়ক ও রেল অবরোধে অচল হয়ে পড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা, শুরু হয় রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি অভিযোগ।

ঝাড়খণ্ডে ভাড়া করা ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া এক পরিযায়ী শ্রমিকের মরদেহ ঘিরে শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বেলডাঙ্গা এলাকায় ব্যাপক বিক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। নিহত ব্যক্তির নাম আলাউদ্দিন শেখ ওরফে আলাই শেখ (৩০)। তিনি মুর্শিদাবাদের বেলডাঙ্গা ব্লকের কুমারপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীন সুজাপুর গ্রামের বাসিন্দা।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, জীবিকার সন্ধানে প্রায় পাঁচ বছর আগে আলাউদ্দিন ঝাড়খণ্ডে পাড়ি দেন এবং সেখানে ফেরিওয়ালার কাজ করতেন। বৃহস্পতিবার তাঁর ভাড়া করা ঘর থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঝাড়খণ্ড পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করলেও পরিবার এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দেয়।

আলাউদ্দিনের মায়ের অভিযোগ, “দুষ্কৃতকারীরা প্রথমে তাঁকে মারধর ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে, পরে আত্মহত্যা বলে চালানোর জন্য মরদেহ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।” পরিবারের আরও দাবি, আলাউদ্দিনকে বারবার তাঁর ভাষা ও পরিচয়ের কারণে হেনস্তা করা হচ্ছিল। স্থানীয় কিছু মানুষ তাঁকে ‘বাংলাদেশি’ বলে চিহ্নিত করে টার্গেট করেছিল বলে অভিযোগ করা হয়।

এই মৃত্যুসংবাদের পর শুক্রবার সকাল থেকেই মুর্শিদাবাদের বেলডাঙ্গায় ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা ডালহৌসি–বকখালি জাতীয় সড়ক ১২ অবরোধ করে টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানায়। উত্তরবঙ্গ ও কলকাতার মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ থাকায় পর্যটকবাহী ও পণ্যবাহী বহু যানবাহন আটকে পড়ে।

একই সঙ্গে বেলডাঙ্গা রেলস্টেশনে বিক্ষোভকারীরা বাঁশ ফেলে শিয়ালদহ–লালগোলা রেল শাখায় ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয়। বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল, অবিলম্বে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।

বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, বিজেপি-শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিকরা ক্রমবর্ধমান হামলার শিকার হচ্ছেন। তাঁদের ভাষায়, “মুখ্যমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে দেখা না করা পর্যন্ত আমরা আন্দোলন প্রত্যাহার করব না।”

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপার কুমার সানি রাজ ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি বিক্ষোভকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন, “ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি যাই হোক, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

শুক্রবার নিহতের মরদেহ গ্রামে পৌঁছালে আবেগ আরও তীব্র হয়ে ওঠে এবং অল্পের জন্য সংঘর্ষ এড়ানো যায়। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর পরিবারকে এক সদস্যের জন্য সরকারি চাকরি ও আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এরপর ধীরে ধীরে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।

ঘটনাটি দ্রুত রাজনৈতিক মাত্রা পায়। প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ও বহরমপুরের সাবেক সাংসদ অধীর রঞ্জন চৌধুরী নিহতের বাড়িতে গিয়ে শোকপ্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “ভারতের যে কোনো নাগরিকের দেশের যেকোনো প্রান্তে কাজ করার অধিকার আছে। মানুষ কেন ভয়ে পালাবে?”

একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন রাজ্যে বাংলা ভাষাভাষী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ বাড়ছে এবং এই বিষয়ে রাজ্য সরকারকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।

শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসও কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের সঙ্গে ফোনে কথা বলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। হেমন্ত সোরেন আশ্বাস দেন যে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে এবং কোনো গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ন্যায়বিচারের দাবিতে সহিংসতার পথে না যাওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছেন তিনি।

পরিবারের দাবি অনুযায়ী, আলাউদ্দিন ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন গ্রামে কাজের সময় হয়রানির কথা আগেও জানিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়, এর কয়েক ঘণ্টা পরই মৃত্যুসংবাদ আসে।

এই ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—বাইরের রাজ্যগুলোতে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকরা কতটা নিরাপদ? শুধু মুর্শিদাবাদ জেলা থেকেই প্রতিবছর লক্ষাধিক শ্রমিক নির্মাণ, ফেরিওয়ালা ও অন্যান্য কাজে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে পাড়ি দেন। আলাউদ্দিন শেখের মৃত্যু সেই বাস্তবতারই এক উদ্বেগজনক প্রতিফলন।

বিষয় : ভারত ইসলামফোবিয়া

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


মুসলিম শ্রমিকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার: বাংলাদেশি অপবাদে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

ভারতের ঝাড়খণ্ডে এক পরিযায়ী শ্রমিকের রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। পরিবারের অভিযোগ, নিহত ব্যক্তিকে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে। এই দাবিকে ঘিরে সড়ক ও রেল অবরোধে অচল হয়ে পড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা, শুরু হয় রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি অভিযোগ।

ঝাড়খণ্ডে ভাড়া করা ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া এক পরিযায়ী শ্রমিকের মরদেহ ঘিরে শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বেলডাঙ্গা এলাকায় ব্যাপক বিক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। নিহত ব্যক্তির নাম আলাউদ্দিন শেখ ওরফে আলাই শেখ (৩০)। তিনি মুর্শিদাবাদের বেলডাঙ্গা ব্লকের কুমারপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীন সুজাপুর গ্রামের বাসিন্দা।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, জীবিকার সন্ধানে প্রায় পাঁচ বছর আগে আলাউদ্দিন ঝাড়খণ্ডে পাড়ি দেন এবং সেখানে ফেরিওয়ালার কাজ করতেন। বৃহস্পতিবার তাঁর ভাড়া করা ঘর থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঝাড়খণ্ড পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করলেও পরিবার এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দেয়।

আলাউদ্দিনের মায়ের অভিযোগ, “দুষ্কৃতকারীরা প্রথমে তাঁকে মারধর ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে, পরে আত্মহত্যা বলে চালানোর জন্য মরদেহ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।” পরিবারের আরও দাবি, আলাউদ্দিনকে বারবার তাঁর ভাষা ও পরিচয়ের কারণে হেনস্তা করা হচ্ছিল। স্থানীয় কিছু মানুষ তাঁকে ‘বাংলাদেশি’ বলে চিহ্নিত করে টার্গেট করেছিল বলে অভিযোগ করা হয়।

এই মৃত্যুসংবাদের পর শুক্রবার সকাল থেকেই মুর্শিদাবাদের বেলডাঙ্গায় ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা ডালহৌসি–বকখালি জাতীয় সড়ক ১২ অবরোধ করে টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানায়। উত্তরবঙ্গ ও কলকাতার মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ থাকায় পর্যটকবাহী ও পণ্যবাহী বহু যানবাহন আটকে পড়ে।

একই সঙ্গে বেলডাঙ্গা রেলস্টেশনে বিক্ষোভকারীরা বাঁশ ফেলে শিয়ালদহ–লালগোলা রেল শাখায় ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয়। বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল, অবিলম্বে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।

বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, বিজেপি-শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিকরা ক্রমবর্ধমান হামলার শিকার হচ্ছেন। তাঁদের ভাষায়, “মুখ্যমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে দেখা না করা পর্যন্ত আমরা আন্দোলন প্রত্যাহার করব না।”

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপার কুমার সানি রাজ ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি বিক্ষোভকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন, “ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি যাই হোক, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

শুক্রবার নিহতের মরদেহ গ্রামে পৌঁছালে আবেগ আরও তীব্র হয়ে ওঠে এবং অল্পের জন্য সংঘর্ষ এড়ানো যায়। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর পরিবারকে এক সদস্যের জন্য সরকারি চাকরি ও আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এরপর ধীরে ধীরে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।

ঘটনাটি দ্রুত রাজনৈতিক মাত্রা পায়। প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ও বহরমপুরের সাবেক সাংসদ অধীর রঞ্জন চৌধুরী নিহতের বাড়িতে গিয়ে শোকপ্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “ভারতের যে কোনো নাগরিকের দেশের যেকোনো প্রান্তে কাজ করার অধিকার আছে। মানুষ কেন ভয়ে পালাবে?”

একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন রাজ্যে বাংলা ভাষাভাষী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ বাড়ছে এবং এই বিষয়ে রাজ্য সরকারকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।

শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসও কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের সঙ্গে ফোনে কথা বলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। হেমন্ত সোরেন আশ্বাস দেন যে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে এবং কোনো গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ন্যায়বিচারের দাবিতে সহিংসতার পথে না যাওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছেন তিনি।

পরিবারের দাবি অনুযায়ী, আলাউদ্দিন ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন গ্রামে কাজের সময় হয়রানির কথা আগেও জানিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়, এর কয়েক ঘণ্টা পরই মৃত্যুসংবাদ আসে।

এই ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—বাইরের রাজ্যগুলোতে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকরা কতটা নিরাপদ? শুধু মুর্শিদাবাদ জেলা থেকেই প্রতিবছর লক্ষাধিক শ্রমিক নির্মাণ, ফেরিওয়ালা ও অন্যান্য কাজে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে পাড়ি দেন। আলাউদ্দিন শেখের মৃত্যু সেই বাস্তবতারই এক উদ্বেগজনক প্রতিফলন।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মুস্তাইন বিল্লাহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত