ফিলিস্তিনে জায়নবাদী প্রকল্প যে চরম অন্যায় করছে, তা আমি সবসময়ই জানতাম। এই অবিচারকে অনুধাবন করতে হলে আপনাকে ইসরায়েলি সমাজের গণ্ডি থেকে বের হতে হবে, কারণ ইসরায়েলে এই চরম জুলুমকে খুবই স্বাভাবিক বিষয় বানিয়ে ফেলা হয়েছে।— কথাগুলো কোনো ফিলিস্তিনির নয়, বরং উত্তর ইসরায়েলের গালিলি অঞ্চলের এক ইহুদি পরিবারে জন্ম নেওয়া জোহর চেম্বারলিন রেগেভের, যিনি ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা নির্মমতার প্রতিবাদ করতে গিয়ে পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।
গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং ইসরায়েলের অবৈধ অবরোধ ভাঙার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লিট’ (Global Sumud Flotilla)-এ অংশ নিয়েছিলেন ইসরায়েলি বংশোদ্ভূত অধিকারকর্মী জোহর চেম্বারলিন রেগেভ। আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী কর্তৃক অবৈধভাবে আটক হওয়ার পর সম্প্রতি মুক্তি পেয়ে ফিলিস্তিনের বেথলেহেম ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে আনাদোলু এজেন্সির (AA) কাছে নিজের জীবন, ইসলাম গ্রহণ এবং ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরতার লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি। ইসরায়েল তাকে ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দেওয়া প্রসঙ্গে গর্বভরে রেগেভ বলেন, "আমার দেশ যদি আমাকে দেশদ্রোহী মনে করে, তবে তা আমার জন্য বড় সম্মানের। কারণ এই জঘন্য অন্যায়ের অংশীদার হওয়ার চেয়ে দেশদ্রোহী হওয়া অনেক ভালো।"
জায়নবাদের বিরোধিতা ও দেশত্যাগ
ইহুদি পরিবারে জন্ম নিলেও ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা অবিচারের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই সোচ্চার ছিলেন রেগেভ। তার মতে, অধিকৃত ভূখণ্ডে বসবাস করা মানেই পরোক্ষভাবে জায়নবাদী প্রকল্পকে সমর্থন করা। এই অপরাধবোধ থেকে তিনি দেশ ছাড়েন এবং ২০১২ সাল থেকে নিজেকে গাজা অবরোধ মুক্ত করার আন্দোলনে নিয়োজিত করেন। ফিলিস্তিনিদের শরণার্থী শিবিরে তাদের দুঃখ-কষ্টের সঙ্গী হতে হতেই একপর্যায়ে তিনি ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন। রেগেভ জানান, ১৭ বছর বয়সে একটি দুর্ঘটনাজনিত কারণে পা হারানোর ফলে তিনি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া থেকে বেঁচে যান, যা তাকে বাকি ১০টা ইসরায়েলি নাগরিকের চেয়ে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে ও সত্যের সন্ধান পেতে সাহায্য করেছে।
যেভাবে এলেন ইসলামের শীতল ছায়ায়
২০২১ সালে করোনা মহামারির ভয়াবহ সময়ে বেথলেহেমের ‘দেয়েশে শরণার্থী শিবির’ (Dheisheh Refugee Camp)-এর একটি ফিলিস্তিনি পরিবারের সাথে পরিচয়ের সূত্র ধরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। রেগেভ বলেন:
"মানুষ যখন একদিকে ভাইরাসের ভয়ে কাঁপছিল, অন্যদিকে যুদ্ধের নামে একে অপরকে হত্যা করছিল, তখন আমার মন এক পরম শক্তির কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করতে চাইল। ইহুদি ধর্ম অত্যন্ত সংকীর্ণ ও বর্জনীয়, কিন্তু ইসলাম ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মের সকল নবী-রাসূলকে স্বীকৃতি দিয়ে এক সুতোয় গেঁথেছে।"
ইসলাম গ্রহণের পর নিজের জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "ইসলাম আমাকে আরও ভালো মানুষ বানিয়েছে। আমার মা নিজেই আমাকে বলেছেন, ‘আমি ইসলামের প্রতি কৃতজ্ঞ, কারণ মুসলিম হওয়ার পর তুমি আমার আরও যত্নশীল কন্যা হয়ে উঠেছ।’" গাজার বর্তমান গণহত্যা ও বিশ্বজুড়ে চলা অবিচারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আধ্যাত্মিক শক্তি বা আল্লাহর ওপর ভরসা না থাকলে এই পরিস্থিতিতে মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখা অসম্ভব হতো।
ফ্লিটে ইসরায়েলি কমান্ডোদের বর্বর নির্যাতন
গাজা অবরোধকারী ফ্লিটে ইসরায়েলি বাহিনীর আক্রমণের বিবরণ দিতে গিয়ে রেগেভ জানান, আন্তর্জাতিক জলসীমায় পোল্যান্ডের পতাকাবাহী জাহাজে থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলি সেনারা তাদের ওপর চড়াও হয়। অধিকারকর্মীদের দুই দিন সাগরে খাঁচার মতো একটি জায়গায় আটকে রাখা হয়। ওপর থেকে প্লাস্টিক বুলেট ছোড়া হয়, যার আঘাতে একজন নারী আহত হন।
রেগেভ ইসরায়েলি নাগরিক হওয়ায় ফিলিস্তিনি বা অন্যান্য বিদেশিদের মতো চরম শারীরিক নির্যাতন না পেলেও মানসিক হেনস্থার শিকার হন। তিনি বলেন, "সেনারা আমাকে গালিগালাজ করেছে, আমার মাথা নিচের দিকে চেপে ধরেছে এবং তাদের একজন আমাকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলারও চেষ্টা করেছিল।" পরবর্তীতে তুরস্ক সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতায় ফ্লিটের অন্য সদস্যরা দ্রুত মুক্তি পান। ইসরায়েলি আদালত রেগেভকে আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে আটক করায় ‘অবৈধ অনুপ্রবেশের’ হাস্যকর অভিযোগে বিচার করতে পারেনি, তবে আগামী ৬০ দিন গাজা অভিমুখে কোনো অভিযানে না যাওয়ার শর্তে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
ফিলিস্তিনের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে
রেগেভ জোর দিয়ে বলেন, ইসরায়েলের বিচার ব্যবস্থা বলে কিছু নেই, এটি বর্ণবাদী ও দখলদারিত্বের হাতিয়ার মাত্র। ইসরায়েলি কারাগারে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বন্দি নিয়মতান্ত্রিক ও পদ্ধতিগত নির্যাতনের (Systematic Torture) শিকার হচ্ছে, যা বিশ্ব মিডিয়া এড়িয়ে যায়। ইসরায়েলি সমাজকে ‘ব্রেনওয়াশড’ বা মগজধোলাইকৃত উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানকার সৈন্যরা নিজেদের ভালো মানুষ দাবি করলেও ফিলিস্তিনিদের মানুষই মনে করে না।
সবশেষে এক দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে এই নব্য মুসলিম অধিকারকর্মী বলেন, "সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী। ফিলিস্তিন যতদিন স্বাধীন ও মুক্ত না হবে, ততদিন আমাদের অধিকারের জাহাজ সাগরে ভাসানো আমরা বন্ধ করব না।"
বিষয় : পশ্চিম তীর

মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মে ২০২৬
ফিলিস্তিনে জায়নবাদী প্রকল্প যে চরম অন্যায় করছে, তা আমি সবসময়ই জানতাম। এই অবিচারকে অনুধাবন করতে হলে আপনাকে ইসরায়েলি সমাজের গণ্ডি থেকে বের হতে হবে, কারণ ইসরায়েলে এই চরম জুলুমকে খুবই স্বাভাবিক বিষয় বানিয়ে ফেলা হয়েছে।— কথাগুলো কোনো ফিলিস্তিনির নয়, বরং উত্তর ইসরায়েলের গালিলি অঞ্চলের এক ইহুদি পরিবারে জন্ম নেওয়া জোহর চেম্বারলিন রেগেভের, যিনি ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা নির্মমতার প্রতিবাদ করতে গিয়ে পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।
গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং ইসরায়েলের অবৈধ অবরোধ ভাঙার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লিট’ (Global Sumud Flotilla)-এ অংশ নিয়েছিলেন ইসরায়েলি বংশোদ্ভূত অধিকারকর্মী জোহর চেম্বারলিন রেগেভ। আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী কর্তৃক অবৈধভাবে আটক হওয়ার পর সম্প্রতি মুক্তি পেয়ে ফিলিস্তিনের বেথলেহেম ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে আনাদোলু এজেন্সির (AA) কাছে নিজের জীবন, ইসলাম গ্রহণ এবং ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরতার লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি। ইসরায়েল তাকে ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দেওয়া প্রসঙ্গে গর্বভরে রেগেভ বলেন, "আমার দেশ যদি আমাকে দেশদ্রোহী মনে করে, তবে তা আমার জন্য বড় সম্মানের। কারণ এই জঘন্য অন্যায়ের অংশীদার হওয়ার চেয়ে দেশদ্রোহী হওয়া অনেক ভালো।"
জায়নবাদের বিরোধিতা ও দেশত্যাগ
ইহুদি পরিবারে জন্ম নিলেও ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা অবিচারের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই সোচ্চার ছিলেন রেগেভ। তার মতে, অধিকৃত ভূখণ্ডে বসবাস করা মানেই পরোক্ষভাবে জায়নবাদী প্রকল্পকে সমর্থন করা। এই অপরাধবোধ থেকে তিনি দেশ ছাড়েন এবং ২০১২ সাল থেকে নিজেকে গাজা অবরোধ মুক্ত করার আন্দোলনে নিয়োজিত করেন। ফিলিস্তিনিদের শরণার্থী শিবিরে তাদের দুঃখ-কষ্টের সঙ্গী হতে হতেই একপর্যায়ে তিনি ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন। রেগেভ জানান, ১৭ বছর বয়সে একটি দুর্ঘটনাজনিত কারণে পা হারানোর ফলে তিনি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া থেকে বেঁচে যান, যা তাকে বাকি ১০টা ইসরায়েলি নাগরিকের চেয়ে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে ও সত্যের সন্ধান পেতে সাহায্য করেছে।
যেভাবে এলেন ইসলামের শীতল ছায়ায়
২০২১ সালে করোনা মহামারির ভয়াবহ সময়ে বেথলেহেমের ‘দেয়েশে শরণার্থী শিবির’ (Dheisheh Refugee Camp)-এর একটি ফিলিস্তিনি পরিবারের সাথে পরিচয়ের সূত্র ধরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। রেগেভ বলেন:
"মানুষ যখন একদিকে ভাইরাসের ভয়ে কাঁপছিল, অন্যদিকে যুদ্ধের নামে একে অপরকে হত্যা করছিল, তখন আমার মন এক পরম শক্তির কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করতে চাইল। ইহুদি ধর্ম অত্যন্ত সংকীর্ণ ও বর্জনীয়, কিন্তু ইসলাম ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মের সকল নবী-রাসূলকে স্বীকৃতি দিয়ে এক সুতোয় গেঁথেছে।"
ইসলাম গ্রহণের পর নিজের জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "ইসলাম আমাকে আরও ভালো মানুষ বানিয়েছে। আমার মা নিজেই আমাকে বলেছেন, ‘আমি ইসলামের প্রতি কৃতজ্ঞ, কারণ মুসলিম হওয়ার পর তুমি আমার আরও যত্নশীল কন্যা হয়ে উঠেছ।’" গাজার বর্তমান গণহত্যা ও বিশ্বজুড়ে চলা অবিচারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আধ্যাত্মিক শক্তি বা আল্লাহর ওপর ভরসা না থাকলে এই পরিস্থিতিতে মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখা অসম্ভব হতো।
ফ্লিটে ইসরায়েলি কমান্ডোদের বর্বর নির্যাতন
গাজা অবরোধকারী ফ্লিটে ইসরায়েলি বাহিনীর আক্রমণের বিবরণ দিতে গিয়ে রেগেভ জানান, আন্তর্জাতিক জলসীমায় পোল্যান্ডের পতাকাবাহী জাহাজে থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলি সেনারা তাদের ওপর চড়াও হয়। অধিকারকর্মীদের দুই দিন সাগরে খাঁচার মতো একটি জায়গায় আটকে রাখা হয়। ওপর থেকে প্লাস্টিক বুলেট ছোড়া হয়, যার আঘাতে একজন নারী আহত হন।
রেগেভ ইসরায়েলি নাগরিক হওয়ায় ফিলিস্তিনি বা অন্যান্য বিদেশিদের মতো চরম শারীরিক নির্যাতন না পেলেও মানসিক হেনস্থার শিকার হন। তিনি বলেন, "সেনারা আমাকে গালিগালাজ করেছে, আমার মাথা নিচের দিকে চেপে ধরেছে এবং তাদের একজন আমাকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলারও চেষ্টা করেছিল।" পরবর্তীতে তুরস্ক সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতায় ফ্লিটের অন্য সদস্যরা দ্রুত মুক্তি পান। ইসরায়েলি আদালত রেগেভকে আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে আটক করায় ‘অবৈধ অনুপ্রবেশের’ হাস্যকর অভিযোগে বিচার করতে পারেনি, তবে আগামী ৬০ দিন গাজা অভিমুখে কোনো অভিযানে না যাওয়ার শর্তে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
ফিলিস্তিনের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে
রেগেভ জোর দিয়ে বলেন, ইসরায়েলের বিচার ব্যবস্থা বলে কিছু নেই, এটি বর্ণবাদী ও দখলদারিত্বের হাতিয়ার মাত্র। ইসরায়েলি কারাগারে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বন্দি নিয়মতান্ত্রিক ও পদ্ধতিগত নির্যাতনের (Systematic Torture) শিকার হচ্ছে, যা বিশ্ব মিডিয়া এড়িয়ে যায়। ইসরায়েলি সমাজকে ‘ব্রেনওয়াশড’ বা মগজধোলাইকৃত উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানকার সৈন্যরা নিজেদের ভালো মানুষ দাবি করলেও ফিলিস্তিনিদের মানুষই মনে করে না।
সবশেষে এক দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে এই নব্য মুসলিম অধিকারকর্মী বলেন, "সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী। ফিলিস্তিন যতদিন স্বাধীন ও মুক্ত না হবে, ততদিন আমাদের অধিকারের জাহাজ সাগরে ভাসানো আমরা বন্ধ করব না।"

আপনার মতামত লিখুন