বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬
কওমী টাইমস

কাজের মজুরি চাওয়ায় তিন মুসলিম শ্রমিককে রাতভর আটকে রেখে লোহার পাইপ দিয়ে নৃশংস নির্যাতন; পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষুব্ধ স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়

পাওনা টাকা চাওয়ায় মুসলিম শ্রমিকদের অপহরণ ও নির্যাতন, বন্দুকের মুখে হিন্দুত্ববাদী স্লোগান দিতে বাধ্য করার অভিযোগ



পাওনা টাকা চাওয়ায় মুসলিম শ্রমিকদের অপহরণ ও নির্যাতন, বন্দুকের মুখে হিন্দুত্ববাদী স্লোগান দিতে বাধ্য করার অভিযোগ

ভারতের রাজস্থান রাজ্যের বেওয়ার জেলায় বকেয়া মজুরি চাওয়ায় তিন মুসলিম শ্রমিককে নির্মমভাবে অপহরণ, জিম্মি ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। গত ২৮ জুন দিবাগত রাতে ঝুটা গ্রামের একটি খনিতে এই ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাদের মুসলিম ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে লক্ষ্যবস্তু করা হয় এবং খনি মালিক ও তার সহযোগীরা বন্দুকের মুখে তাদের ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি দিতে বাধ্য করে। এই ঘটনায় স্থানীয় থানায় একটি মামলা (এফআইআর) দায়ের করা হয়েছে এবং পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।

ভারতের রাজস্থানে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদী সহিংসতার আরও একটি উদ্বেগজনক ঘটনা সামনে এসেছে। রাজ্যের বেওয়ার (Beawar) জেলায় মেরামতের কাজের পাওনা টাকা চাওয়ায় তিন মুসলিম শ্রমিককে অপহরণ, জিম্মি এবং রাতভর পৈশাচিক নির্যাতন করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক খনি মালিক ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।

ভুক্তভোগী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ জুন ৪০ বছর বয়সী সাজিদ খান, তার ভাই জুনায়েদ এবং ভাগ্নে সাহিল ঝুটা গ্রামের একটি খনিতে একটি মেশিন মেরামতের জন্য যান। রাত আনুমানিক ১টার দিকে কাজ শেষ করে তারা তাদের ন্যায্য মজুরি দাবি করলে, খনি কর্তৃপক্ষ তাদের সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলে।

টাকা না পেয়ে শ্রমিকরা যখন খনি এলাকা ত্যাগ করছিলেন, তখন খনি মালিক মুকেশ মালি ৪-৫ জন সহযোগী নিয়ে একটি এসইউভি (SUV) গাড়ি চড়ে সেখানে হাজির হয়। সাজিদ খানের দায়ের করা এজাহারে বলা হয়েছে, "তারা আমাদের গালিগালাজ করে, মারধর শুরু করে এবং জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে নেয়।" এরপর তাদের একটি অফিসে নিয়ে গিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাতভর আটকে রাখা হয়।

এজাহারে ভুক্তভোগীরা স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণেই তাদের এই বর্বরোচিত হামলার শিকার হতে হয়েছে। হামলাকারীরা চিৎকার করে বলতে থাকে, "আমরা হিন্দু, তোদের মুসলিমদের আজ মেরেই ফেলব।" এরপর মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে তাদের জোরপূর্বক ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিতে বাধ্য করা হয়। সাজিদ জানান, "প্রাণের ভয়ে আমরা ‘জয় শ্রী রাম’ বলতে বাধ্য হই, কিন্তু তারপরও তারা আমাদের রেহাই দেয়নি। লোহার পাইপ, বেলচা ও লাঠি দিয়ে আমাদের পুরো রাত ধরে পেটানো হয়েছে।"

নৃশংস এই নির্যাতনের ফলে জুনায়েদের মাথায় মারাত্মক জখম হয়েছে, তার মাথার চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। তিনজনের শরীরেই পাইপ ও লাঠির আঘাতের অসংখ্য চিহ্ন রয়েছে। এছাড়া হামলাকারীরা তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার রুপি। বর্তমানে তারা বেওয়ারের অমৃত কৌর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের পক্ষে আইনজীবী রহমত কাঠাত জানিয়েছেন, ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS), ২০২৩-এর প্রাসঙ্গিক ধারায় পুলিশ একটি মামলা নথিভুক্ত করেছে এবং ২-৩ জন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে মূল অভিযুক্ত খনি মালিক মুকেশ মালি এখনো পলাতক রয়েছে।

এদিকে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। পুলিশ সুপারের (SP) কাছে দেওয়া এক স্মারকলিপিতে তারা অভিযোগ করেছেন যে, দায়ের করা এফআইআর-এ ঘটনার সাম্প্রদায়িক রূপটিকে যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়নি। তারা মামলায় অস্ত্র আইন (Arms Act) সহ আরও কঠোর ধারা যুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।

স্মারকলিপিতে বলা হয়, "এই ধরনের ঘৃণ্য অপরাধ কেবল মানবতাকেই লজ্জিত করে না, বরং সামাজিক সম্প্রীতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য এক মারাত্মক হুমকি।" স্থানীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দ ভুক্তভোগী জুনায়েদ ও সাহিলের নতুন করে মেডিকেল পরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন। কারণ প্রথম মেডিকেল রিপোর্টে তাদের যৌনাঙ্গে ও শরীরের অন্যান্য সংবেদনশীল অংশে থাকা গুরুতর আঘাতের কথা গোপন করা হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেন। একই সাথে কর্তব্যরত যেসব পুলিশ কর্মকর্তা মামলাটি হালকা করার চেষ্টা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি জানানো হয়েছে।

বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬


পাওনা টাকা চাওয়ায় মুসলিম শ্রমিকদের অপহরণ ও নির্যাতন, বন্দুকের মুখে হিন্দুত্ববাদী স্লোগান দিতে বাধ্য করার অভিযোগ

প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুলাই ২০২৬

featured Image

ভারতের রাজস্থান রাজ্যের বেওয়ার জেলায় বকেয়া মজুরি চাওয়ায় তিন মুসলিম শ্রমিককে নির্মমভাবে অপহরণ, জিম্মি ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। গত ২৮ জুন দিবাগত রাতে ঝুটা গ্রামের একটি খনিতে এই ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাদের মুসলিম ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে লক্ষ্যবস্তু করা হয় এবং খনি মালিক ও তার সহযোগীরা বন্দুকের মুখে তাদের ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি দিতে বাধ্য করে। এই ঘটনায় স্থানীয় থানায় একটি মামলা (এফআইআর) দায়ের করা হয়েছে এবং পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।

ভারতের রাজস্থানে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদী সহিংসতার আরও একটি উদ্বেগজনক ঘটনা সামনে এসেছে। রাজ্যের বেওয়ার (Beawar) জেলায় মেরামতের কাজের পাওনা টাকা চাওয়ায় তিন মুসলিম শ্রমিককে অপহরণ, জিম্মি এবং রাতভর পৈশাচিক নির্যাতন করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক খনি মালিক ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।

ভুক্তভোগী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ জুন ৪০ বছর বয়সী সাজিদ খান, তার ভাই জুনায়েদ এবং ভাগ্নে সাহিল ঝুটা গ্রামের একটি খনিতে একটি মেশিন মেরামতের জন্য যান। রাত আনুমানিক ১টার দিকে কাজ শেষ করে তারা তাদের ন্যায্য মজুরি দাবি করলে, খনি কর্তৃপক্ষ তাদের সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলে।

টাকা না পেয়ে শ্রমিকরা যখন খনি এলাকা ত্যাগ করছিলেন, তখন খনি মালিক মুকেশ মালি ৪-৫ জন সহযোগী নিয়ে একটি এসইউভি (SUV) গাড়ি চড়ে সেখানে হাজির হয়। সাজিদ খানের দায়ের করা এজাহারে বলা হয়েছে, "তারা আমাদের গালিগালাজ করে, মারধর শুরু করে এবং জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে নেয়।" এরপর তাদের একটি অফিসে নিয়ে গিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাতভর আটকে রাখা হয়।

এজাহারে ভুক্তভোগীরা স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণেই তাদের এই বর্বরোচিত হামলার শিকার হতে হয়েছে। হামলাকারীরা চিৎকার করে বলতে থাকে, "আমরা হিন্দু, তোদের মুসলিমদের আজ মেরেই ফেলব।" এরপর মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে তাদের জোরপূর্বক ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিতে বাধ্য করা হয়। সাজিদ জানান, "প্রাণের ভয়ে আমরা ‘জয় শ্রী রাম’ বলতে বাধ্য হই, কিন্তু তারপরও তারা আমাদের রেহাই দেয়নি। লোহার পাইপ, বেলচা ও লাঠি দিয়ে আমাদের পুরো রাত ধরে পেটানো হয়েছে।"

নৃশংস এই নির্যাতনের ফলে জুনায়েদের মাথায় মারাত্মক জখম হয়েছে, তার মাথার চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। তিনজনের শরীরেই পাইপ ও লাঠির আঘাতের অসংখ্য চিহ্ন রয়েছে। এছাড়া হামলাকারীরা তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার রুপি। বর্তমানে তারা বেওয়ারের অমৃত কৌর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের পক্ষে আইনজীবী রহমত কাঠাত জানিয়েছেন, ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS), ২০২৩-এর প্রাসঙ্গিক ধারায় পুলিশ একটি মামলা নথিভুক্ত করেছে এবং ২-৩ জন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে মূল অভিযুক্ত খনি মালিক মুকেশ মালি এখনো পলাতক রয়েছে।

এদিকে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। পুলিশ সুপারের (SP) কাছে দেওয়া এক স্মারকলিপিতে তারা অভিযোগ করেছেন যে, দায়ের করা এফআইআর-এ ঘটনার সাম্প্রদায়িক রূপটিকে যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়নি। তারা মামলায় অস্ত্র আইন (Arms Act) সহ আরও কঠোর ধারা যুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।

স্মারকলিপিতে বলা হয়, "এই ধরনের ঘৃণ্য অপরাধ কেবল মানবতাকেই লজ্জিত করে না, বরং সামাজিক সম্প্রীতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য এক মারাত্মক হুমকি।" স্থানীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দ ভুক্তভোগী জুনায়েদ ও সাহিলের নতুন করে মেডিকেল পরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন। কারণ প্রথম মেডিকেল রিপোর্টে তাদের যৌনাঙ্গে ও শরীরের অন্যান্য সংবেদনশীল অংশে থাকা গুরুতর আঘাতের কথা গোপন করা হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেন। একই সাথে কর্তব্যরত যেসব পুলিশ কর্মকর্তা মামলাটি হালকা করার চেষ্টা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি জানানো হয়েছে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ