বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬
কওমী টাইমস

কঠোর বিধিনিষেধ ও আইডি কার্ড পরীক্ষার নামে হয়রানি সত্ত্বেও ইসলামের প্রথম কিবলায় ঢল নেমেছিল ফিলিস্তিনিদের; ঐতিহাসিক স্থিতাবস্থা লঙ্ঘনের অভিযোগ ওআইসি ও ওয়াকফ প্রশাসনের

বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে মসজিদুল আকসায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার মুসল্লির ঈদুল আজহার নামাজ আদায়



বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে মসজিদুল আকসায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার মুসল্লির ঈদুল আজহার নামাজ আদায়

ইসরায়েলি পুলিশের তীব্র কড়াকড়ি এবং বহুমুখী বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমের ওল্ড সিটি এলাকায় অবস্থিত পবিত্র মসিজদুল আল-আকসায় ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করেছেন লাখো ফিলিস্তিনি। ইসলামের প্রথম কিবলা হিসেবে পরিচিত এই পবিত্র প্রাঙ্গণে উৎসবের দিনেও ছিল ইসরায়েলি বাহিনীর কড়া নজরদারি ও তল্লাশি। শত বাধা পেরিয়ে ফিলিস্তিনিদের এই জমায়েত তাদের ধর্মীয় অধিকার ও প্রতিরোধের অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছে।

জেরুজালেম ইসলামি ওয়াকফ প্রশাসনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুযায়ী, এবারের ঈদুল আজহায় পবিত্র আল-আকসা মসজিদে প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার মুসলিম সমবেত হয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন। তবে এই উপস্থিতি সহজ ছিল না। সকাল থেকেই পুরো জেরুজালেম এবং এর আশেপাশের এলাকায় ইসরায়েলি পুলিশ কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে রাখে।

দীর্ঘ সারি ও প্রবেশে বাধা

পূর্ব জেরুজালেমের দূরবর্তী এলাকা এবং ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বসবাসরত বিভিন্ন ফিলিস্তিনি শহর থেকে আসা মানুষ আল-আকসায় পৌঁছানোর চেষ্টা করলে ওল্ড সিটির প্রবেশপথগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ঈদের নামাজ শুরুর আগে মসজিদের প্রতিটি ফটকে অবস্থান করা ইসরায়েলি পুলিশ সদস্যরা ফিলিস্তিনিদের পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) পরীক্ষা করতে শুরু করে। এই তল্লাশির নামে অনেককে দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে রাখা হয় এবং বেশ কিছু ফিলিস্তিনিকে কোনো কারণ ছাড়াই পবিত্র মসজিদে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

তা সত্ত্বেও, ভোর থেকেই হাজার হাজার ফিলিস্তিনি আল-আকসা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত এবং তাকবির ধ্বনিতে মুখরিত করে তোলেন। জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনের প্রধান মুফতি মুহাম্মদ হুসেইন ঈদের নামাজ পরিচালনা করেন এবং নামাজ শেষে ফিলিস্তিনের শান্তি ও স্বাধীনতার আহ্বান জানিয়ে খুতবা পাঠ করেন।

চলতি বছরের শুরুর দিকে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলার অজুহাত দেখিয়ে ইসরায়েল টানা ৪১ দিন পবিত্র আল-আকসা মসজিদ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিল। যার ফলে, ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীর দখলের পর ইতিহাসের প্রথমবারের মতো এবার পবিত্র ঈদুল ফিতরের (রমজানের ঈদ) নামাজ আল-আকসা মসজিদে অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। সেই সময় আল-আকসার আশেপাশে বা রাস্তায় নামাজ পড়তে চাওয়া ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি পুলিশ নির্মম হামলাও চালিয়েছিল। সেই ক্ষত কাটিয়ে এবারের ঈদুল আজহার বিশাল জমায়েত ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি বড় আবেগীয় বিজয়।

সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন

১৯৯৪ সালে ইসরায়েলের সাথে স্বাক্ষরিত 'ওয়াদি আরাবা' চুক্তি অনুযায়ী জেরুজালেমের মুসলিম ধর্মীয় স্থানগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব জর্ডানের ওপর ন্যস্ত। ২০১৩ সালে জর্ডানের রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ এবং ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের মধ্যকার চুক্তিতেও এই অধিকার জর্ডানকে দেওয়া হয়। বর্তমানে এটি জর্ডানের ওয়াকফ ও ইসলামি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ 'জেরুজালেম ইসলামি ওয়াকফ প্রশাসন' দ্বারা পরিচালিত।

২০০৩ সাল থেকে ইসরায়েল এই চুক্তি ও ওয়াকফ প্রশাসনের সার্বভৌমত্ব বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একতরফাভাবে পুলিশি পাহারায় ইহুদিদের আল-আকসায় প্রবেশের অনুমতি দিয়ে আসছে। ওয়াকফ প্রশাসন ইসরায়েলের এই একতরফা সিদ্ধান্তকে স্বীকৃতি দেয় না এবং একে 'অবৈধ অনুপ্রবেশ' বা 'বর্বর হানা' হিসেবে আখ্যায়িত করে।

তেল আবিব সরকার আন্তর্জাতিক মহলে দাবি করে যে, আল-আকসায় ঐতিহাসিক স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখা হয়েছে—যেখানে কেবল মুসলিমরা ইবাদত করবে এবং অন্য ধর্মের লোকেরা শুধু পরিদর্শনে যাবে। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। কট্টরপন্থী উগ্রবাদী ইহুদিরা ইসরায়েলি পুলিশের প্রকাশ্য সুরক্ষায় প্রতিনিয়ত আল-আকসা প্রাঙ্গণে ঢুকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও প্রার্থনা পরিচালনা করছে, যা প্রায়শই ক্যামেরায় ধরা পড়ে এবং মুসলিম উম্মাহর আবেগকে উস্কে দেয়।

বিষয় : ফিলিস্তিন আল-আকসা

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬


বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে মসজিদুল আকসায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার মুসল্লির ঈদুল আজহার নামাজ আদায়

প্রকাশের তারিখ : ২৮ মে ২০২৬

featured Image

ইসরায়েলি পুলিশের তীব্র কড়াকড়ি এবং বহুমুখী বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমের ওল্ড সিটি এলাকায় অবস্থিত পবিত্র মসিজদুল আল-আকসায় ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করেছেন লাখো ফিলিস্তিনি। ইসলামের প্রথম কিবলা হিসেবে পরিচিত এই পবিত্র প্রাঙ্গণে উৎসবের দিনেও ছিল ইসরায়েলি বাহিনীর কড়া নজরদারি ও তল্লাশি। শত বাধা পেরিয়ে ফিলিস্তিনিদের এই জমায়েত তাদের ধর্মীয় অধিকার ও প্রতিরোধের অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছে।

জেরুজালেম ইসলামি ওয়াকফ প্রশাসনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুযায়ী, এবারের ঈদুল আজহায় পবিত্র আল-আকসা মসজিদে প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার মুসলিম সমবেত হয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন। তবে এই উপস্থিতি সহজ ছিল না। সকাল থেকেই পুরো জেরুজালেম এবং এর আশেপাশের এলাকায় ইসরায়েলি পুলিশ কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে রাখে।

দীর্ঘ সারি ও প্রবেশে বাধা

পূর্ব জেরুজালেমের দূরবর্তী এলাকা এবং ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বসবাসরত বিভিন্ন ফিলিস্তিনি শহর থেকে আসা মানুষ আল-আকসায় পৌঁছানোর চেষ্টা করলে ওল্ড সিটির প্রবেশপথগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ঈদের নামাজ শুরুর আগে মসজিদের প্রতিটি ফটকে অবস্থান করা ইসরায়েলি পুলিশ সদস্যরা ফিলিস্তিনিদের পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) পরীক্ষা করতে শুরু করে। এই তল্লাশির নামে অনেককে দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে রাখা হয় এবং বেশ কিছু ফিলিস্তিনিকে কোনো কারণ ছাড়াই পবিত্র মসজিদে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

তা সত্ত্বেও, ভোর থেকেই হাজার হাজার ফিলিস্তিনি আল-আকসা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত এবং তাকবির ধ্বনিতে মুখরিত করে তোলেন। জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনের প্রধান মুফতি মুহাম্মদ হুসেইন ঈদের নামাজ পরিচালনা করেন এবং নামাজ শেষে ফিলিস্তিনের শান্তি ও স্বাধীনতার আহ্বান জানিয়ে খুতবা পাঠ করেন।

চলতি বছরের শুরুর দিকে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলার অজুহাত দেখিয়ে ইসরায়েল টানা ৪১ দিন পবিত্র আল-আকসা মসজিদ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিল। যার ফলে, ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীর দখলের পর ইতিহাসের প্রথমবারের মতো এবার পবিত্র ঈদুল ফিতরের (রমজানের ঈদ) নামাজ আল-আকসা মসজিদে অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। সেই সময় আল-আকসার আশেপাশে বা রাস্তায় নামাজ পড়তে চাওয়া ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি পুলিশ নির্মম হামলাও চালিয়েছিল। সেই ক্ষত কাটিয়ে এবারের ঈদুল আজহার বিশাল জমায়েত ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি বড় আবেগীয় বিজয়।

সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন

১৯৯৪ সালে ইসরায়েলের সাথে স্বাক্ষরিত 'ওয়াদি আরাবা' চুক্তি অনুযায়ী জেরুজালেমের মুসলিম ধর্মীয় স্থানগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব জর্ডানের ওপর ন্যস্ত। ২০১৩ সালে জর্ডানের রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ এবং ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের মধ্যকার চুক্তিতেও এই অধিকার জর্ডানকে দেওয়া হয়। বর্তমানে এটি জর্ডানের ওয়াকফ ও ইসলামি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ 'জেরুজালেম ইসলামি ওয়াকফ প্রশাসন' দ্বারা পরিচালিত।

২০০৩ সাল থেকে ইসরায়েল এই চুক্তি ও ওয়াকফ প্রশাসনের সার্বভৌমত্ব বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একতরফাভাবে পুলিশি পাহারায় ইহুদিদের আল-আকসায় প্রবেশের অনুমতি দিয়ে আসছে। ওয়াকফ প্রশাসন ইসরায়েলের এই একতরফা সিদ্ধান্তকে স্বীকৃতি দেয় না এবং একে 'অবৈধ অনুপ্রবেশ' বা 'বর্বর হানা' হিসেবে আখ্যায়িত করে।

তেল আবিব সরকার আন্তর্জাতিক মহলে দাবি করে যে, আল-আকসায় ঐতিহাসিক স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখা হয়েছে—যেখানে কেবল মুসলিমরা ইবাদত করবে এবং অন্য ধর্মের লোকেরা শুধু পরিদর্শনে যাবে। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। কট্টরপন্থী উগ্রবাদী ইহুদিরা ইসরায়েলি পুলিশের প্রকাশ্য সুরক্ষায় প্রতিনিয়ত আল-আকসা প্রাঙ্গণে ঢুকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও প্রার্থনা পরিচালনা করছে, যা প্রায়শই ক্যামেরায় ধরা পড়ে এবং মুসলিম উম্মাহর আবেগকে উস্কে দেয়।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ