মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬
মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬
কওমী টাইমস

বাংলাদেশ-পাকিস্তান গ্রাস করে 'অখণ্ড ভারত' বানানোর দাবি করা ভারতীয় জেনারেলের ভাইরাল ভিডিওটি আসলে এআই দিয়ে তৈরি ডিপফেক

ভারতীয় জেনারেলের ‘অখণ্ড ভারত’ ও আঞ্চলিক বিস্তৃতি সংক্রান্ত ভাইরাল ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি



ভারতীয় জেনারেলের ‘অখণ্ড ভারত’ ও আঞ্চলিক বিস্তৃতি সংক্রান্ত ভাইরাল ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি

প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালকে গ্রাস করে 'অখণ্ড ভারত' গঠনের গোপন পরিকল্পনা ফাঁস করেছেন এক ভারতীয় জেনারেল—এমন দাবি সংবলিত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপির (AFP) একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রমাণিত হয়েছে যে, ভিডিওটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি (অল্টার্ড)। মূল ভিডিওতে ওই জেনারেল সামরিক খাতে চীনা যন্ত্রাংশ বর্জনের বিষয়ে কথা বলছিলেন।

চলতি বছরের ১৩ মার্চ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিও ক্লিপ দ্রুত ভাইরাল হতে শুরু করে। বিশেষ করে বাংলা ভাষায় লেখা কিছু পোস্টে দাবি করা হয়, "অত্যন্ত উদ্বেগজনক খবর। এই ভারতীয় জেনারেল ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপাল নিয়ে একটি 'অখণ্ড ভারত' গঠনের পরিকল্পনা ফাঁস করেছেন।"

ভাইরাল হওয়া এই ভিডিও ক্লিপে ভারতের সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল সিএস মান-কে (CS Mann) বলতে শোনা যায় যে, ভারত "সন্ত্রাসী ইরানি সরকারের" বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করছে। ভিডিওতে তাকে আরও বলতে শোনা যায়, "ইসরায়েলের শেষ লক্ষ্য যেমন ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ (বৃহত্তর ইসরায়েল) গঠন, তেমনি আমাদের শেষ লক্ষ্য হলো ‘অখণ্ড ভারত’।" একই সাথে ভিডিওতে বাংলাদেশ ও নেপালের তরফ থেকে আসা "হুমকি" পরে মোকাবিলা করা হবে বলেও উল্লেখ করা হয়।

ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

উল্লেখ্য, বাইবেলের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বলতে ফিলিস্তিনের গাজা ও পশ্চিম তীর ছাড়াও জর্ডান, লেবানন ও সিরিয়ার কিছু অংশকে বোঝানো হয়। অন্যদিকে, ভারতের সাথে ইরানের সুসম্পর্ক থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের সাথে ভারতের প্রতিরক্ষা, কৃষি, প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন, যার মাত্র কয়েকদিন পরেই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হয়। এই প্রেক্ষাপটকে কাজে লাগিয়েই মূলত বিভ্রান্তিকর ভিডিওটি ছড়ানো হয়েছে।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা আসল সত্য

এএফপি বাংলাদেশ-এর পক্ষ থেকে সাংবাদিক রাশীক মুজিব এই সংবাদের সত্যতা অনুসন্ধানে নামেন। ভিডিওর কিছু স্থিরচিত্র নিয়ে গুগলে ‘রিভার্স ইমেজ সার্চ’ (Reverse Image Search) করা হলে মূল ভিডিওটির সন্ধান মেলে।

প্রকৃতপক্ষে, আসল ভিডিওটি গত ৪ জুলাই, ২০২৫ তারিখে ভারতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ‘প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া’ (PTI)-এর অফিশিয়াল এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে প্রকাশ করা হয়েছিল

মূল ভিডিওতে জেনারেল সিএস মান ভারতীয় সামরিক সরঞ্জামে চীনা যন্ত্রাংশের ব্যবহার বন্ধ করা এবং ড্রোন প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে বক্তব্য রাখছিলেন। পুরো বক্তৃতার কোথাও তিনি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, পাকিস্তান, নেপাল, বাংলাদেশ কিংবা ‘অখণ্ড ভারত’ নিয়ে কোনো কথাই বলেননি।

এআই ডিটেকশন টুল: এএফপি ভাইরাল হওয়া ভিডিও ক্লিপটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শনাক্তকরণ টুল ‘হাইভ’ (Hive)-এর মাধ্যমে পরীক্ষা করেছে। ফলাফলে দেখা গেছে, এই ভিডিওর অডিওটি ৯৮.৮ শতাংশ এআই-জেনারেটেড বা কম্পিউটার দ্বারা কৃত্রিমভাবে তৈরি।

লিপ-সিঙ্ক বিভ্রাট: ভিডিওটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, জেনারেল মানের মুখের নড়াচড়ার (Lip movement) সাথে কথার শব্দের কোনো মিল নেই, যা এটি এআই দিয়ে তৈরি বা ‘ডিপফেক’ হওয়ার অন্যতম বড় প্রমাণ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ভুয়া ভিডিও দেখে অনেক সাধারণ ব্যবহারকারী বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং উসকানিমূলক মন্তব্য করছেন। তবে এএফপির বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধানে এটি পরিষ্কার যে, ভিডিওটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সাজানো।

বিষয় : ফ্যাক্টচেক

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬


ভারতীয় জেনারেলের ‘অখণ্ড ভারত’ ও আঞ্চলিক বিস্তৃতি সংক্রান্ত ভাইরাল ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি

প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬

featured Image

প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালকে গ্রাস করে 'অখণ্ড ভারত' গঠনের গোপন পরিকল্পনা ফাঁস করেছেন এক ভারতীয় জেনারেল—এমন দাবি সংবলিত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপির (AFP) একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রমাণিত হয়েছে যে, ভিডিওটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি (অল্টার্ড)। মূল ভিডিওতে ওই জেনারেল সামরিক খাতে চীনা যন্ত্রাংশ বর্জনের বিষয়ে কথা বলছিলেন।

চলতি বছরের ১৩ মার্চ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিও ক্লিপ দ্রুত ভাইরাল হতে শুরু করে। বিশেষ করে বাংলা ভাষায় লেখা কিছু পোস্টে দাবি করা হয়, "অত্যন্ত উদ্বেগজনক খবর। এই ভারতীয় জেনারেল ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপাল নিয়ে একটি 'অখণ্ড ভারত' গঠনের পরিকল্পনা ফাঁস করেছেন।"

ভাইরাল হওয়া এই ভিডিও ক্লিপে ভারতের সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল সিএস মান-কে (CS Mann) বলতে শোনা যায় যে, ভারত "সন্ত্রাসী ইরানি সরকারের" বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করছে। ভিডিওতে তাকে আরও বলতে শোনা যায়, "ইসরায়েলের শেষ লক্ষ্য যেমন ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ (বৃহত্তর ইসরায়েল) গঠন, তেমনি আমাদের শেষ লক্ষ্য হলো ‘অখণ্ড ভারত’।" একই সাথে ভিডিওতে বাংলাদেশ ও নেপালের তরফ থেকে আসা "হুমকি" পরে মোকাবিলা করা হবে বলেও উল্লেখ করা হয়।

ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

উল্লেখ্য, বাইবেলের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বলতে ফিলিস্তিনের গাজা ও পশ্চিম তীর ছাড়াও জর্ডান, লেবানন ও সিরিয়ার কিছু অংশকে বোঝানো হয়। অন্যদিকে, ভারতের সাথে ইরানের সুসম্পর্ক থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের সাথে ভারতের প্রতিরক্ষা, কৃষি, প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন, যার মাত্র কয়েকদিন পরেই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হয়। এই প্রেক্ষাপটকে কাজে লাগিয়েই মূলত বিভ্রান্তিকর ভিডিওটি ছড়ানো হয়েছে।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা আসল সত্য

এএফপি বাংলাদেশ-এর পক্ষ থেকে সাংবাদিক রাশীক মুজিব এই সংবাদের সত্যতা অনুসন্ধানে নামেন। ভিডিওর কিছু স্থিরচিত্র নিয়ে গুগলে ‘রিভার্স ইমেজ সার্চ’ (Reverse Image Search) করা হলে মূল ভিডিওটির সন্ধান মেলে।

প্রকৃতপক্ষে, আসল ভিডিওটি গত ৪ জুলাই, ২০২৫ তারিখে ভারতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ‘প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া’ (PTI)-এর অফিশিয়াল এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে প্রকাশ করা হয়েছিল

মূল ভিডিওতে জেনারেল সিএস মান ভারতীয় সামরিক সরঞ্জামে চীনা যন্ত্রাংশের ব্যবহার বন্ধ করা এবং ড্রোন প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে বক্তব্য রাখছিলেন। পুরো বক্তৃতার কোথাও তিনি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, পাকিস্তান, নেপাল, বাংলাদেশ কিংবা ‘অখণ্ড ভারত’ নিয়ে কোনো কথাই বলেননি।

এআই ডিটেকশন টুল: এএফপি ভাইরাল হওয়া ভিডিও ক্লিপটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শনাক্তকরণ টুল ‘হাইভ’ (Hive)-এর মাধ্যমে পরীক্ষা করেছে। ফলাফলে দেখা গেছে, এই ভিডিওর অডিওটি ৯৮.৮ শতাংশ এআই-জেনারেটেড বা কম্পিউটার দ্বারা কৃত্রিমভাবে তৈরি।

লিপ-সিঙ্ক বিভ্রাট: ভিডিওটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, জেনারেল মানের মুখের নড়াচড়ার (Lip movement) সাথে কথার শব্দের কোনো মিল নেই, যা এটি এআই দিয়ে তৈরি বা ‘ডিপফেক’ হওয়ার অন্যতম বড় প্রমাণ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ভুয়া ভিডিও দেখে অনেক সাধারণ ব্যবহারকারী বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং উসকানিমূলক মন্তব্য করছেন। তবে এএফপির বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধানে এটি পরিষ্কার যে, ভিডিওটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সাজানো।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ