রোববার, ১৪ জুন ২০২৬
রোববার, ১৪ জুন ২০২৬
কওমী টাইমস

আইজিএমজি (IGMG) ও হাসানে ইন্টারন্যাশনাল-এর উদ্যোগে কোলন শহরে বিশ্ব মুসলিম নেতৃত্বের মিলনমেলা; ইসলামোফোবিয়া মোকাবেলা, ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা এবং আঞ্চলিক সংকট সমাধানে বৈশ্বিক সংহতির ডাক

জার্মানিতে আন্তর্জাতিক মুসলিম সম্মেলন: পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার ধর্মীয় সংকট ও বৈশ্বিক সংহতির আহ্বান



জার্মানিতে আন্তর্জাতিক মুসলিম সম্মেলন: পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার ধর্মীয় সংকট ও বৈশ্বিক সংহতির আহ্বান

জার্মানির কোলন শহরে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর অধিকার রক্ষা, পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সমস্যা নিরসনে অনুষ্ঠিত হয়েছে একটি ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক সম্মেলন। ‘ইসলামিক কমিউনিটি মিল্লি গুরুশ’ (IGMG) এবং মানবিক সহায়তা সংস্থা ‘হাসানে ইন্টারন্যাশনাল’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই মহাসম্মেলনে পূর্ব ইউরোপ, বলকান, ককেশাস এবং মধ্য এশিয়ার ১৭টিরও বেশি দেশের গ্র্যান্ড মুফতি, ধর্মীয় নেতা ও সংস্থার প্রধানরা অংশ নেন। মুসলিম সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা, ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই এবং তরুণ প্রজন্মের ধর্মীয় পরিচয় টিকিয়ে রাখতে যৌথ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের লক্ষ্যে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন এবং বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো সম্মিলিতভাবে মোকাবেলার লক্ষ্যে জার্মানির কোলন শহরের 'গেনোহোটেল'-এ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল একটি ব্যতিক্রমী আন্তর্জাতিক মুসলিম সম্মেলন। পূর্ব ইউরোপ, বলকান, ককেশাস ও মধ্য এশিয়ায় সক্রিয় মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ছাতা সংগঠনগুলোর (Umbrella Organizations) শীর্ষ প্রতিনিধিরা এই গুরুত্বপূর্ণ সংলাপে অংশ নেন।

সম্মেলনে জার্মানি, অস্ট্রিয়া, স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, হাঙ্গেরি, ইউক্রেন, জর্জিয়া, কিরগিজস্তান, মঙ্গোলিয়া, গ্রিস, পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, বুলগেরিয়া এবং উত্তর মেসিডোনিয়ার প্রধান মুফতি, গ্র্যান্ড মুফতি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন দেশের মুসলিম সমাজের বাস্তব চিত্র, প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং টেকসই দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করাই ছিল এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য।

আঞ্চলিক সমস্যার সমাধান কেবল বৈশ্বিক সংহতির মাধ্যমেই সম্ভব

সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে আইজিএমজি (IGMG) সাধারণ সভাপতির উপদেষ্টা ও সম্মেলন কমিটির চেয়ারম্যান আব্দি তাশদোয়েন এক বিশাল ভৌগোলিক অঞ্চলের মুসলিম প্রতিনিধিদের একক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার তাৎপর্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন,

"আমাদের সমস্যাগুলো হয়তো আঞ্চলিক বা স্থানীয়, কিন্তু এর সমাধান কেবল একটি বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি, পারস্পরিক সংহতি ও যৌথ চেতনার মাধ্যমেই সম্ভব।"

আইজিএমজি-র উপ-প্রধান এবং হাসানে ইন্টারন্যাশনাল-এর সভাপতি বেকির আলতাশ মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, "সহায়তা মানে কেবল কিছু দান-অনুদানের ক্যাম্পেইন বা সাময়িক কোনো সাহায্য নয়। মানবিক সহায়তা হলো মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা এবং একটি টেকসই কল্যাণমুখী সমাজ বিনির্মাণের দায়িত্ব।"

প্রথম অধিবেশন: জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও স্লোভেনিয়ার অধিকারের লড়াই

প্রথম অধিবেশনে আয়োজক দেশ জার্মানি সহ অস্ট্রিয়া ও স্লোভেনিয়ার প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন। জার্মানির পক্ষে আইজিএমজি-র ইরশাদ প্রধান জলিল ইয়ালিনকিলিক বলেন, "জার্মানির মুসলমানরা কোনো বিশেষ সুযোগ-সুবিধা চায় না, তারা কেবল দেশের সংবিধান অনুযায়ী সমান অধিকারের দাবিদার।" তিনি মুসলিমদের সাংবিধানিক অধিকার, ধর্মীয় শিক্ষা, ইমাম প্রশিক্ষণ এবং ক্রমবর্ধমান ইসলামোফোবিয়া (মুসলিম বিদ্বেষ) নিয়ে আলোচনা করেন।

অস্ট্রিয়ার মুফতি মুস্তফা মুল্লাওগ্লু সেদেশে ইসলামের সরকারি মর্যাদা, আইনি বিতর্ক ও 'ইসলাম আইন' নিয়ে কথা বলেন। অন্যদিকে, স্লোভেনিয়ার মুফতি নেভজেত পোরিচ দেশটির মুসলিমদের ঐতিহাসিক পটভূমি এবং লুব্লিয়ানায় নবনির্মিত ইসলামিক কালচারাল সেন্টারের মাধ্যমে আন্তঃধর্মীয় সংলাপের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

পূর্ব ইউরোপের মুসলিম ও যুদ্ধের ক্ষত

পূর্ব ইউরোপীয় অধিবেশনে ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, হাঙ্গেরি ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ক্রোয়েশিয়ার মুফতি ড. আজিজ হাসানোভিচ রাষ্ট্র ও মুসলিম সমাজের চমৎকার আইনি মডেল তুলে ধরেন। সার্বিয়ার গ্র্যান্ড মুফতি সেনাদ হালিতোভিচ সানজাক অঞ্চলের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, ওয়াকফ সম্পত্তি রক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজনের কথা উল্লেখ করেন।

যুদ্ধে বিপর্যস্ত ইউক্রেনের মুফতি এইদের রুস্তামভ বলেন, "রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউক্রেনের মুসলিম ও ক্রিমিয়ান তাতারদের জনসংখ্যার মানচিত্র বদলে গেছে। যুদ্ধের কারণে মুসলমানরা বাস্তুচ্যুত হলেও আমাদের ঐক্য আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে।"

পশ্চিম থ্রেস ও বাল্টিক দেশসমূহের সংখ্যালঘুদের সংকট

দ্বিতীয় অধিবেশনে গ্রিস (পশ্চিম থ্রেস), পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া ও এস্তোনিয়ার প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন। গ্রিসের পশ্চিম থ্রেস অঞ্চলের জান্থি (Xanthi) অঞ্চলের মুফতি মুস্তফা ট্রাম্পা এবং কমোতিনি (Komotini) অঞ্চলের মুফতি ইব্রাহিম শেরিফ গ্রিক সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির কথা তুলে ধরেন। তারা জানান, তুর্কি মুসলিম সংখ্যালঘুরা পরিচয়, শিক্ষা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, ওয়াকফ সম্পত্তি এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে তীব্র অধিকার হরণের শিকার হচ্ছেন।

পোল্যান্ডের মুফতি তোমাস মিসকিউইচ মুসলিম বিদ্বেষ দূরীকরণে শিক্ষার গুরুত্ব এবং লিথুয়ানিয়ার মুফতি আলেকজান্দ্রাস বেগান্সকাস রাজধানী ভিলনিয়াসে মসজিদ নির্মাণের অনুমতি ও ঐতিহাসিক মুসলিম কবরস্থান পুনরুদ্ধারের আইনি জটিলতা তুলে ধরেন।

ককেশাস ও মধ্য এশিয়া: নতুন যুগের চ্যালেঞ্জ

জর্জিয়া, কিরগিজস্তান ও মঙ্গোলিয়ার মুসলিম প্রতিনিধিরা এই অধিবেশনে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক চাহিদার কথা জানান। পূর্ব জর্জিয়ার গ্র্যান্ড মুফতি ইতিবার এমিনভ তরুণ প্রজন্মের মাঝে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর ও চরমপন্থী মতাদর্শের বিরুদ্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করে একে "সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ" হিসেবে উল্লেখ করেন। পশ্চিম জর্জিয়ার গ্র্যান্ড মুফতি আদম শান্তাদজে মানসম্মত ধর্মীয় শিক্ষার অভাব এবং ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

কিরগিজস্তানের মুফতি আবদুল আজিজ জাকিরভ জানান, তার দেশে প্রায় ৪,০০০ মসজিদ এবং ২০০টি মাদ্রাসা চালু রয়েছে। তবে ইন্টারনেটে ভুল ধর্মীয় তথ্যের বিস্তার রোধে ইমামদের আধুনিক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন তিনি।

মঙ্গোলিয়ার প্রতিনিধি আজাতখান মুখান জানান, মঙ্গোলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী কাজাখ মুসলিম সংখ্যালঘুরা চরম ইমাম সংকট ও স্থানীয় ভাষায় ইসলামিক বইপত্রের অভাবে ভুগছেন। তিনি তুরস্কের মরহুম প্রধানমন্ত্রী প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকানের অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, এরবাকান সাহেবের মঙ্গোলিয়ার মুসলমানদের পাশে দাঁড়ানোর ঐতিহাসিক আহ্বানের পর থেকেই আইজিএমজি আজ পর্যন্ত রমজান, কোরবানি ও এতিম প্রকল্প পরিচালনা করে আসছে।

আমাদের লক্ষ্য শুধু একবার দেখা করে চলে যাওয়া নয়

সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে বসনিয়া-হার্জেগোভিনার সাবেক রইসুল উলামা (গ্র্যান্ড মুফতি) ড. মুস্তফা চেরিচ এবং আইজিএমজি-র জেনারেল প্রেসিডেন্ট কেমাল এরগুন বক্তব্য রাখেন। ড. চেরিচ বলেন, "বসনিয়ার মুসলমানরা যুদ্ধ ও গণহত্যার শিকার হয়েছে, কিন্তু আজ আমরা ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়েও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি।"

আইজিএমজি-র প্রেসিডেন্ট কেমাল এরগুন দৃঢ়তার সাথে বলেন,

"আমাদের উদ্দেশ্য শুধু এখানে এসে কিছু আলোচনা করে চলে যাওয়া নয়। আমরা তরুণদের শিক্ষা, ধর্মীয় সেবা এবং মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী বিশ্বব্যাপী যৌথ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে চাই।"

পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও যৌথ আলোকচিত্র ধারণের মধ্য দিয়ে এই ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের সমাপ্তি ঘটে।

বিষয় : জার্মানি

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

রোববার, ১৪ জুন ২০২৬


জার্মানিতে আন্তর্জাতিক মুসলিম সম্মেলন: পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার ধর্মীয় সংকট ও বৈশ্বিক সংহতির আহ্বান

প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুন ২০২৬

featured Image

জার্মানির কোলন শহরে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর অধিকার রক্ষা, পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সমস্যা নিরসনে অনুষ্ঠিত হয়েছে একটি ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক সম্মেলন। ‘ইসলামিক কমিউনিটি মিল্লি গুরুশ’ (IGMG) এবং মানবিক সহায়তা সংস্থা ‘হাসানে ইন্টারন্যাশনাল’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই মহাসম্মেলনে পূর্ব ইউরোপ, বলকান, ককেশাস এবং মধ্য এশিয়ার ১৭টিরও বেশি দেশের গ্র্যান্ড মুফতি, ধর্মীয় নেতা ও সংস্থার প্রধানরা অংশ নেন। মুসলিম সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা, ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই এবং তরুণ প্রজন্মের ধর্মীয় পরিচয় টিকিয়ে রাখতে যৌথ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের লক্ষ্যে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন এবং বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো সম্মিলিতভাবে মোকাবেলার লক্ষ্যে জার্মানির কোলন শহরের 'গেনোহোটেল'-এ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল একটি ব্যতিক্রমী আন্তর্জাতিক মুসলিম সম্মেলন। পূর্ব ইউরোপ, বলকান, ককেশাস ও মধ্য এশিয়ায় সক্রিয় মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ছাতা সংগঠনগুলোর (Umbrella Organizations) শীর্ষ প্রতিনিধিরা এই গুরুত্বপূর্ণ সংলাপে অংশ নেন।

সম্মেলনে জার্মানি, অস্ট্রিয়া, স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, হাঙ্গেরি, ইউক্রেন, জর্জিয়া, কিরগিজস্তান, মঙ্গোলিয়া, গ্রিস, পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, বুলগেরিয়া এবং উত্তর মেসিডোনিয়ার প্রধান মুফতি, গ্র্যান্ড মুফতি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন দেশের মুসলিম সমাজের বাস্তব চিত্র, প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং টেকসই দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করাই ছিল এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য।

আঞ্চলিক সমস্যার সমাধান কেবল বৈশ্বিক সংহতির মাধ্যমেই সম্ভব

সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে আইজিএমজি (IGMG) সাধারণ সভাপতির উপদেষ্টা ও সম্মেলন কমিটির চেয়ারম্যান আব্দি তাশদোয়েন এক বিশাল ভৌগোলিক অঞ্চলের মুসলিম প্রতিনিধিদের একক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার তাৎপর্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন,

"আমাদের সমস্যাগুলো হয়তো আঞ্চলিক বা স্থানীয়, কিন্তু এর সমাধান কেবল একটি বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি, পারস্পরিক সংহতি ও যৌথ চেতনার মাধ্যমেই সম্ভব।"

আইজিএমজি-র উপ-প্রধান এবং হাসানে ইন্টারন্যাশনাল-এর সভাপতি বেকির আলতাশ মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, "সহায়তা মানে কেবল কিছু দান-অনুদানের ক্যাম্পেইন বা সাময়িক কোনো সাহায্য নয়। মানবিক সহায়তা হলো মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা এবং একটি টেকসই কল্যাণমুখী সমাজ বিনির্মাণের দায়িত্ব।"

প্রথম অধিবেশন: জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও স্লোভেনিয়ার অধিকারের লড়াই

প্রথম অধিবেশনে আয়োজক দেশ জার্মানি সহ অস্ট্রিয়া ও স্লোভেনিয়ার প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন। জার্মানির পক্ষে আইজিএমজি-র ইরশাদ প্রধান জলিল ইয়ালিনকিলিক বলেন, "জার্মানির মুসলমানরা কোনো বিশেষ সুযোগ-সুবিধা চায় না, তারা কেবল দেশের সংবিধান অনুযায়ী সমান অধিকারের দাবিদার।" তিনি মুসলিমদের সাংবিধানিক অধিকার, ধর্মীয় শিক্ষা, ইমাম প্রশিক্ষণ এবং ক্রমবর্ধমান ইসলামোফোবিয়া (মুসলিম বিদ্বেষ) নিয়ে আলোচনা করেন।

অস্ট্রিয়ার মুফতি মুস্তফা মুল্লাওগ্লু সেদেশে ইসলামের সরকারি মর্যাদা, আইনি বিতর্ক ও 'ইসলাম আইন' নিয়ে কথা বলেন। অন্যদিকে, স্লোভেনিয়ার মুফতি নেভজেত পোরিচ দেশটির মুসলিমদের ঐতিহাসিক পটভূমি এবং লুব্লিয়ানায় নবনির্মিত ইসলামিক কালচারাল সেন্টারের মাধ্যমে আন্তঃধর্মীয় সংলাপের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

পূর্ব ইউরোপের মুসলিম ও যুদ্ধের ক্ষত

পূর্ব ইউরোপীয় অধিবেশনে ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, হাঙ্গেরি ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ক্রোয়েশিয়ার মুফতি ড. আজিজ হাসানোভিচ রাষ্ট্র ও মুসলিম সমাজের চমৎকার আইনি মডেল তুলে ধরেন। সার্বিয়ার গ্র্যান্ড মুফতি সেনাদ হালিতোভিচ সানজাক অঞ্চলের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, ওয়াকফ সম্পত্তি রক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজনের কথা উল্লেখ করেন।

যুদ্ধে বিপর্যস্ত ইউক্রেনের মুফতি এইদের রুস্তামভ বলেন, "রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউক্রেনের মুসলিম ও ক্রিমিয়ান তাতারদের জনসংখ্যার মানচিত্র বদলে গেছে। যুদ্ধের কারণে মুসলমানরা বাস্তুচ্যুত হলেও আমাদের ঐক্য আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে।"

পশ্চিম থ্রেস ও বাল্টিক দেশসমূহের সংখ্যালঘুদের সংকট

দ্বিতীয় অধিবেশনে গ্রিস (পশ্চিম থ্রেস), পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া ও এস্তোনিয়ার প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন। গ্রিসের পশ্চিম থ্রেস অঞ্চলের জান্থি (Xanthi) অঞ্চলের মুফতি মুস্তফা ট্রাম্পা এবং কমোতিনি (Komotini) অঞ্চলের মুফতি ইব্রাহিম শেরিফ গ্রিক সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির কথা তুলে ধরেন। তারা জানান, তুর্কি মুসলিম সংখ্যালঘুরা পরিচয়, শিক্ষা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, ওয়াকফ সম্পত্তি এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে তীব্র অধিকার হরণের শিকার হচ্ছেন।

পোল্যান্ডের মুফতি তোমাস মিসকিউইচ মুসলিম বিদ্বেষ দূরীকরণে শিক্ষার গুরুত্ব এবং লিথুয়ানিয়ার মুফতি আলেকজান্দ্রাস বেগান্সকাস রাজধানী ভিলনিয়াসে মসজিদ নির্মাণের অনুমতি ও ঐতিহাসিক মুসলিম কবরস্থান পুনরুদ্ধারের আইনি জটিলতা তুলে ধরেন।

ককেশাস ও মধ্য এশিয়া: নতুন যুগের চ্যালেঞ্জ

জর্জিয়া, কিরগিজস্তান ও মঙ্গোলিয়ার মুসলিম প্রতিনিধিরা এই অধিবেশনে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক চাহিদার কথা জানান। পূর্ব জর্জিয়ার গ্র্যান্ড মুফতি ইতিবার এমিনভ তরুণ প্রজন্মের মাঝে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর ও চরমপন্থী মতাদর্শের বিরুদ্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করে একে "সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ" হিসেবে উল্লেখ করেন। পশ্চিম জর্জিয়ার গ্র্যান্ড মুফতি আদম শান্তাদজে মানসম্মত ধর্মীয় শিক্ষার অভাব এবং ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

কিরগিজস্তানের মুফতি আবদুল আজিজ জাকিরভ জানান, তার দেশে প্রায় ৪,০০০ মসজিদ এবং ২০০টি মাদ্রাসা চালু রয়েছে। তবে ইন্টারনেটে ভুল ধর্মীয় তথ্যের বিস্তার রোধে ইমামদের আধুনিক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন তিনি।

মঙ্গোলিয়ার প্রতিনিধি আজাতখান মুখান জানান, মঙ্গোলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী কাজাখ মুসলিম সংখ্যালঘুরা চরম ইমাম সংকট ও স্থানীয় ভাষায় ইসলামিক বইপত্রের অভাবে ভুগছেন। তিনি তুরস্কের মরহুম প্রধানমন্ত্রী প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকানের অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, এরবাকান সাহেবের মঙ্গোলিয়ার মুসলমানদের পাশে দাঁড়ানোর ঐতিহাসিক আহ্বানের পর থেকেই আইজিএমজি আজ পর্যন্ত রমজান, কোরবানি ও এতিম প্রকল্প পরিচালনা করে আসছে।

আমাদের লক্ষ্য শুধু একবার দেখা করে চলে যাওয়া নয়

সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে বসনিয়া-হার্জেগোভিনার সাবেক রইসুল উলামা (গ্র্যান্ড মুফতি) ড. মুস্তফা চেরিচ এবং আইজিএমজি-র জেনারেল প্রেসিডেন্ট কেমাল এরগুন বক্তব্য রাখেন। ড. চেরিচ বলেন, "বসনিয়ার মুসলমানরা যুদ্ধ ও গণহত্যার শিকার হয়েছে, কিন্তু আজ আমরা ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়েও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি।"

আইজিএমজি-র প্রেসিডেন্ট কেমাল এরগুন দৃঢ়তার সাথে বলেন,

"আমাদের উদ্দেশ্য শুধু এখানে এসে কিছু আলোচনা করে চলে যাওয়া নয়। আমরা তরুণদের শিক্ষা, ধর্মীয় সেবা এবং মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী বিশ্বব্যাপী যৌথ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে চাই।"

পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও যৌথ আলোকচিত্র ধারণের মধ্য দিয়ে এই ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের সমাপ্তি ঘটে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ