যুক্তরাজ্যে ক্রমবর্ধিত ইসলামোফোবিয়া ও মুসলিমবিরোধী সংঘাত চরম আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি ‘ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্ট’ (বিএমটি)-এর প্রকাশিত এক নতুন প্রতিবেদনে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে দেশে গড়ে প্রতি পাঁচ দিনে অন্তত একটি মসজিদে হামলা চালানো হয়েছে। এই চার মাসে ২৩টি শহর ও এলাকায় অন্তত ২৭টি সুনির্দিষ্ট বিদ্বেষমূলক ঘটনার মাধ্যমে ২৫টি আলাদা মসজিদ ও ইসলামী সেন্টারকে সরাসরি নিশানা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুসলিম স্বার্থ রক্ষায় বিশ্বস্ত সংবাদ সংস্থা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব ঘটনা কেবল সাধারণ ভাঙচুর নয়; বরং ব্রিটিশ মুসলিমদের স্বকীয়তা ও নাগরিক অবস্থানকে নিশ্চিহ্ন করার একটি সুসংগঠিত উগ্রপন্থী প্রচেষ্টা।
যুক্তরাজ্যে মুসলিমবিরোধী চরমপন্থা এবং ইসলামোফোবিয়ার মাত্রা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশটির সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদার এবং মুসলিমবিদ্বেষী অপরাধ পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্ট’ (BMT) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে মুসলিম উপাসনালয়গুলোর নিরাপত্তা নিয়ে এক চরম উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে।
‘বিভাজনের গ্রীষ্ম: দেশজুড়ে মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষের ঊর্ধ্বগতি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর মাসের এই সংক্ষিপ্ত সময়সীমার মধ্যে যুক্তরাজ্যের ২৩টি ভিন্ন ভিন্ন শহর ও মফস্বলে মুসলিমদের নিশানা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়— উইরাল, এপসম এবং ওয়াটফোর্ড অঞ্চলে মসজিদগুলোকে বারবার বা দলবদ্ধভাবে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে উগ্রপন্থীরা।
প্রতীকী হুমকি ও পরিকল্পিত সহিংসতা
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হামলাগুলোর ধরন দিন দিন কেবল বিচ্ছিন্ন ভাঙচুর থেকে একটি সমন্বিত প্রতীকী ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সরাসরি সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে:
প্রতীক ও খ্রিষ্টীয় চিহ্নের ব্যবহার (৪১%): মসজিদগুলোকে ভয় দেখানো ও শাসানোর উদ্দেশ্যে ৪১ শতাংশ হামলায় জোরপূর্বক ক্রস, সেন্ট জর্জ ক্রস ফ্ল্যাগ, যুক্তরাজ্যের জাতীয় পতাকা (ইউনিয়ন জ্যাক) বা অন্যান্য খ্রিষ্টীয় প্রতীক ও স্লোগান ব্যবহার করা হয়েছে।
সরাসরি সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগ (২৬%): ২৬ শতাংশ ঘটনা ছিল সরাসরি সহিংস— যেখানে মসজিদের জানালা ভাঙচুর, মুসল্লিদের ওপর হামলা এবং অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটেছে।
সমন্বিত আক্রমণ: জুলাই থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ঘটনা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত স্তরের অপরাধ থেকে অপরাধীরা অতিদ্রুত সংগঠিত সহিংসতা ও পুনঃপুন হামলার পথ বেছে নিয়েছে।
মুসলিম সম্প্রদায়ের অনুভূতি ও পরিচয় সংকটের আঘাত
ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব ঘটনাকে সাধারণ কোনো র্যান্ডম ভাঙচুর বা তথাকথিত "দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ" হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো মূলত সাধারণ ব্রিটিশ মুসলিম নাগরিকদের মনে তাদের নিজেদের দেশ ও সমাজে নিজস্ব অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ও ভয় তৈরি করার গভীর ষড়যন্ত্র। নিজের ধর্ম ও বিশ্বাসের কারণে নিজ মাতৃভূমিতেই তাঁদের নাগরিক অধিকার ও সদস্যপদকে প্রশ্নের মুখে ফেলা হচ্ছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচারে ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্ট (BMT) যুক্তরাজ্য সরকার, স্থানীয় পুলিশ ও কাউনসিলগুলোর প্রতি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে:
১. ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদ ও সংলগ্ন মুসলিম জনগোষ্ঠীকে অবিলম্বে দ্রুত ও কার্যকর আইনি ও নিরাপত্তা সহায়তা দিতে হবে।
২. মসজিদ ও উপাসনালয়কেন্দ্রিক বিদ্বেষমূলক অপরাধ মোকাবিলায় "র্যাপিড রেসপন্স প্রোটোকল" বা দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গঠন করতে হবে।
৩. উগ্রপন্থীদের আগাম রুখে দিতে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বমঞ্চে যেকোনো সংখ্যালঘু এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মানবাধিকার সুরক্ষা ও উপাসনালয়ের নিরাপত্তা মৌলিক অধিকারের অংশ। উগ্র ডানপন্থী ও ইসলামোফোবিক গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্ব যুক্তরাজ্যে বহুসংস্কৃতিবাদ ও সামাজিক শান্তির জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে।
বিষয় : যুক্তরাজ্য সংখ্যালঘু

বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুলাই ২০২৬
যুক্তরাজ্যে ক্রমবর্ধিত ইসলামোফোবিয়া ও মুসলিমবিরোধী সংঘাত চরম আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি ‘ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্ট’ (বিএমটি)-এর প্রকাশিত এক নতুন প্রতিবেদনে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে দেশে গড়ে প্রতি পাঁচ দিনে অন্তত একটি মসজিদে হামলা চালানো হয়েছে। এই চার মাসে ২৩টি শহর ও এলাকায় অন্তত ২৭টি সুনির্দিষ্ট বিদ্বেষমূলক ঘটনার মাধ্যমে ২৫টি আলাদা মসজিদ ও ইসলামী সেন্টারকে সরাসরি নিশানা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুসলিম স্বার্থ রক্ষায় বিশ্বস্ত সংবাদ সংস্থা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব ঘটনা কেবল সাধারণ ভাঙচুর নয়; বরং ব্রিটিশ মুসলিমদের স্বকীয়তা ও নাগরিক অবস্থানকে নিশ্চিহ্ন করার একটি সুসংগঠিত উগ্রপন্থী প্রচেষ্টা।
যুক্তরাজ্যে মুসলিমবিরোধী চরমপন্থা এবং ইসলামোফোবিয়ার মাত্রা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশটির সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদার এবং মুসলিমবিদ্বেষী অপরাধ পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্ট’ (BMT) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে মুসলিম উপাসনালয়গুলোর নিরাপত্তা নিয়ে এক চরম উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে।
‘বিভাজনের গ্রীষ্ম: দেশজুড়ে মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষের ঊর্ধ্বগতি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর মাসের এই সংক্ষিপ্ত সময়সীমার মধ্যে যুক্তরাজ্যের ২৩টি ভিন্ন ভিন্ন শহর ও মফস্বলে মুসলিমদের নিশানা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়— উইরাল, এপসম এবং ওয়াটফোর্ড অঞ্চলে মসজিদগুলোকে বারবার বা দলবদ্ধভাবে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে উগ্রপন্থীরা।
প্রতীকী হুমকি ও পরিকল্পিত সহিংসতা
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হামলাগুলোর ধরন দিন দিন কেবল বিচ্ছিন্ন ভাঙচুর থেকে একটি সমন্বিত প্রতীকী ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সরাসরি সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে:
প্রতীক ও খ্রিষ্টীয় চিহ্নের ব্যবহার (৪১%): মসজিদগুলোকে ভয় দেখানো ও শাসানোর উদ্দেশ্যে ৪১ শতাংশ হামলায় জোরপূর্বক ক্রস, সেন্ট জর্জ ক্রস ফ্ল্যাগ, যুক্তরাজ্যের জাতীয় পতাকা (ইউনিয়ন জ্যাক) বা অন্যান্য খ্রিষ্টীয় প্রতীক ও স্লোগান ব্যবহার করা হয়েছে।
সরাসরি সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগ (২৬%): ২৬ শতাংশ ঘটনা ছিল সরাসরি সহিংস— যেখানে মসজিদের জানালা ভাঙচুর, মুসল্লিদের ওপর হামলা এবং অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটেছে।
সমন্বিত আক্রমণ: জুলাই থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ঘটনা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত স্তরের অপরাধ থেকে অপরাধীরা অতিদ্রুত সংগঠিত সহিংসতা ও পুনঃপুন হামলার পথ বেছে নিয়েছে।
মুসলিম সম্প্রদায়ের অনুভূতি ও পরিচয় সংকটের আঘাত
ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব ঘটনাকে সাধারণ কোনো র্যান্ডম ভাঙচুর বা তথাকথিত "দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ" হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো মূলত সাধারণ ব্রিটিশ মুসলিম নাগরিকদের মনে তাদের নিজেদের দেশ ও সমাজে নিজস্ব অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ও ভয় তৈরি করার গভীর ষড়যন্ত্র। নিজের ধর্ম ও বিশ্বাসের কারণে নিজ মাতৃভূমিতেই তাঁদের নাগরিক অধিকার ও সদস্যপদকে প্রশ্নের মুখে ফেলা হচ্ছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচারে ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্ট (BMT) যুক্তরাজ্য সরকার, স্থানীয় পুলিশ ও কাউনসিলগুলোর প্রতি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে:
১. ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদ ও সংলগ্ন মুসলিম জনগোষ্ঠীকে অবিলম্বে দ্রুত ও কার্যকর আইনি ও নিরাপত্তা সহায়তা দিতে হবে।
২. মসজিদ ও উপাসনালয়কেন্দ্রিক বিদ্বেষমূলক অপরাধ মোকাবিলায় "র্যাপিড রেসপন্স প্রোটোকল" বা দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গঠন করতে হবে।
৩. উগ্রপন্থীদের আগাম রুখে দিতে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বমঞ্চে যেকোনো সংখ্যালঘু এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মানবাধিকার সুরক্ষা ও উপাসনালয়ের নিরাপত্তা মৌলিক অধিকারের অংশ। উগ্র ডানপন্থী ও ইসলামোফোবিক গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্ব যুক্তরাজ্যে বহুসংস্কৃতিবাদ ও সামাজিক শান্তির জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে।

আপনার মতামত লিখুন