ইসরায়েলের বর্বর গণহত্যা ও বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কোনো কোলাহলময় মিছিল নয়, বরং একাকী এক প্রতিবাদের প্রাচীর গড়ে তুলেছেন জাপানের টোকিওর বাসিন্দা ইউসুকে ফুরি সাওয়া। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের ভয়াবহ আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে নিজের মানবিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে প্রতিদিন রাজপথে নামছেন এই তরুণ। শুধু ফিলিস্তিন নয়, সুদান ও মিয়ানমারে নিপীড়িত মানুষের পক্ষে এবং আন্তর্জাতিক উদাসীনতার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিদিন অন্ততঃ এক ঘণ্টা চিৎকার করে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করার আহ্বান জানাচ্ছেন।
বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার যখন ভুলুণ্ঠিত এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আশকারায় যখন ফিলিস্তিনের গাজায় চলছে ভয়াবহ গণহত্যা, ঠিক তখন উদাসীন টোকিওর রাজপথে এক অনন্য নীরব প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন জাপানি নাগরিক ইউসুকে ফুরি সাওয়া। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় ও পশ্চিম তীরে নির্মম আগ্রাসন শুরু করার পর থেকেই তিনি প্রতিদিন একা একা প্রতিবাদের ব্যানার হাতে নিয়ে রাস্তায় নামছেন। ফিলিস্তিন ছাড়া সুদান, মিয়ানমারসহ পৃথিবীর যে প্রান্তেই সাধারণ মানুষ শিকার হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধের, তাদের অধিকার রক্ষায় একাকী কণ্ঠ তুলে ধরেছেন তিনি।
আনাদোলু এজেন্সি (AA)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউসুকে বলেন, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে তিনি জাপানের বিভিন্ন শহরের ব্যস্ততম স্থানে প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন। তার ব্যানারে লেখা থাকে—"ফিলিস্তিন মুক্ত কর", "গণহত্যা বন্ধ কর" এবং "এখনই যুদ্ধবিরতি চাই"।
ইউসুকে জোর দিয়ে বলেন, "আমার এই প্রতিবাদের মূল লক্ষ্য মানুষকে মৌলিক মানবাধিকারের কথা মনে করিয়ে দেওয়া। জন্মসূত্রে মানুষের যেসব অধিকার প্রাপ্য, তা কোনো শক্তি কেড়ে নিতে পারে না। এই অধিকার রক্ষায় মানুষকে অবশ্যই রুখে দাঁড়াতে হবে।"
পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ফিলিস্তিন, মিয়ানমার ও সুদানে নিরপরাধ মানুষের ওপর যে নির্মম নির্যাতন চলছে, তা তাকে দীর্ঘ দিন ধরে ক্ষোভ, হতাশা ও প্রতিবাদী হওয়ার তাগিদ জুগিয়েছে। সেই তাগিদ থেকেই তিনি বিশাল কোনো দলের জন্য অপেক্ষা না করে একাই প্রতিবাদের পতাকা হাতে তুলে নিয়েছেন।
বিবেক ও সচেতনতার লড়াই
জাপানি সমাজের রাজনৈতিক উদাসীনতার কথা উল্লেখ করে ইউসুকে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, জাপানের সাধারণ মানুষ বিশ্ব রাজনীতি তো দূরের কথা, নিজ দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও খুব একটা আগ্রহী নয়। এমনকি দেশটির তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ 'গণহত্যা' (Genocide) শব্দটির গভীরতা ও অর্থ সম্পর্কেও অনবহিত।
তিনি বলেন, "একজন জাপানি নাগরিক হিসেবে এটা আমার জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি একা হলেও জনমনে প্রভাব ফেলতে চাই। দলবদ্ধ আন্দোলন অনেক সময় কেবল একটি সাধারণ সামাজিক কর্মসূচি হিসেবে গৃহীত হয় এবং সাধারণ মানুষের আলাদা দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হয়। কিন্তু একা দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষকে দেখে পথচারীরা অন্তত ভাবে—'এই লোকটা কে এবং কেন দাঁড়িয়ে আছে?' এতে তাদের কৌতূহল জাগে।"
একাকী প্রতিবাদের সুবিধাও বর্ণনা করেন তিনি। কারো সাথে সমন্বয় না করে নিজের সুবিধাজনক সময়েযেকোনো স্থানে দাঁড়িয়ে নিজের মূল বক্তব্য নির্দ্বিধায় তুলে ধরা যায়। তবে অনেক সময় বিশাল জনতার মাঝে একক কণ্ঠস্বর হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় তিনি কোনো দিন বাদ না দিয়ে প্রতিদিন রাজপথে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
জাপানিদের উদাসীনতা ও আন্তর্জাতিক সমর্থন
রাজপথে দাঁড়িয়ে কেমন প্রতিক্রিয়া পান—এমন প্রশ্নের জবাবে ইউসুকে এক কষ্টকর সত্য প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "বেশিরভাগ স্থানীয় জাপানি নাগরিক একদম উদাসীন। মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে আমি চিৎকার করলেও অনেকে এমন ভাব করে যেন আমি সেখানে নেই-ই। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে আমার হাতের ব্যানারের দিকে চোখ না রেখে এড়িয়ে যায়। তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।"
তবে বিপরীতে বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে ব্যাপক সমর্থন ও সংহতি পান তিনি। ইউসুকে জানান, কখনো কখনো কড়া সমালোচনার মুখোমুখি হলেও অন্তত বিদেশি পর্যটকরা প্রতিক্রিয়া দেখান, যা শূন্যতার চেয়ে ভালো। জাপানি সমাজের এই চরম নির্বিকারত্বকে তিনি দুঃখজনক কিন্তু নির্মম বাস্তবতা বলে আখ্যা দেন।
নিরাশা ও হতাশা সত্ত্বেও নিজের প্রতিবাদের সিদ্ধান্ত থেকে বিন্দুমাত্র সরে আসতে চান না এই তরুণ। তিনি বলেন, "কখনো কখনো মনে হয় আমার এই চেষ্টা হয়তো লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। কিন্তু আমি এই সংগ্রামকে নিজের আত্মরক্ষা ও বিবেকের প্রতি দায়িত্ব বলে মনে করি। বিশ্ব শান্তি আজ চরমভাবে বিপর্যস্ত, গাজায় নির্বিচার হত্যাকাণ্ড থামছেই না। হয়তো অনেকে এটাকে 'ফাঁকা আদর্শ' বলে উপহাস করবে, কিন্তু আমি ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষের পক্ষে, নির্যাতিতদের পক্ষে শেষ পর্যন্ত লড়ে যাব।"
তিনি প্রতিজ্ঞা করে বলেন, "সারা বিশ্ব বধির হয়ে গেলেও আমি বলব—মানুষের রক্ষা করুন, মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান দিন, সমান অধিকার দিন। এই আহ্বান কারো কানে না পৌঁছালেও আমার নিজের ও বিবেকের দায় মেটাতে আমি প্রতিবাদ চালিয়ে যাব।"
বিষয় : জাপান

সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ আগস্ট ২০২৬
ইসরায়েলের বর্বর গণহত্যা ও বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কোনো কোলাহলময় মিছিল নয়, বরং একাকী এক প্রতিবাদের প্রাচীর গড়ে তুলেছেন জাপানের টোকিওর বাসিন্দা ইউসুকে ফুরি সাওয়া। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের ভয়াবহ আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে নিজের মানবিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে প্রতিদিন রাজপথে নামছেন এই তরুণ। শুধু ফিলিস্তিন নয়, সুদান ও মিয়ানমারে নিপীড়িত মানুষের পক্ষে এবং আন্তর্জাতিক উদাসীনতার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিদিন অন্ততঃ এক ঘণ্টা চিৎকার করে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করার আহ্বান জানাচ্ছেন।
বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার যখন ভুলুণ্ঠিত এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আশকারায় যখন ফিলিস্তিনের গাজায় চলছে ভয়াবহ গণহত্যা, ঠিক তখন উদাসীন টোকিওর রাজপথে এক অনন্য নীরব প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন জাপানি নাগরিক ইউসুকে ফুরি সাওয়া। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় ও পশ্চিম তীরে নির্মম আগ্রাসন শুরু করার পর থেকেই তিনি প্রতিদিন একা একা প্রতিবাদের ব্যানার হাতে নিয়ে রাস্তায় নামছেন। ফিলিস্তিন ছাড়া সুদান, মিয়ানমারসহ পৃথিবীর যে প্রান্তেই সাধারণ মানুষ শিকার হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধের, তাদের অধিকার রক্ষায় একাকী কণ্ঠ তুলে ধরেছেন তিনি।
আনাদোলু এজেন্সি (AA)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউসুকে বলেন, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে তিনি জাপানের বিভিন্ন শহরের ব্যস্ততম স্থানে প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন। তার ব্যানারে লেখা থাকে—"ফিলিস্তিন মুক্ত কর", "গণহত্যা বন্ধ কর" এবং "এখনই যুদ্ধবিরতি চাই"।
ইউসুকে জোর দিয়ে বলেন, "আমার এই প্রতিবাদের মূল লক্ষ্য মানুষকে মৌলিক মানবাধিকারের কথা মনে করিয়ে দেওয়া। জন্মসূত্রে মানুষের যেসব অধিকার প্রাপ্য, তা কোনো শক্তি কেড়ে নিতে পারে না। এই অধিকার রক্ষায় মানুষকে অবশ্যই রুখে দাঁড়াতে হবে।"
পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ফিলিস্তিন, মিয়ানমার ও সুদানে নিরপরাধ মানুষের ওপর যে নির্মম নির্যাতন চলছে, তা তাকে দীর্ঘ দিন ধরে ক্ষোভ, হতাশা ও প্রতিবাদী হওয়ার তাগিদ জুগিয়েছে। সেই তাগিদ থেকেই তিনি বিশাল কোনো দলের জন্য অপেক্ষা না করে একাই প্রতিবাদের পতাকা হাতে তুলে নিয়েছেন।
বিবেক ও সচেতনতার লড়াই
জাপানি সমাজের রাজনৈতিক উদাসীনতার কথা উল্লেখ করে ইউসুকে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, জাপানের সাধারণ মানুষ বিশ্ব রাজনীতি তো দূরের কথা, নিজ দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও খুব একটা আগ্রহী নয়। এমনকি দেশটির তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ 'গণহত্যা' (Genocide) শব্দটির গভীরতা ও অর্থ সম্পর্কেও অনবহিত।
তিনি বলেন, "একজন জাপানি নাগরিক হিসেবে এটা আমার জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি একা হলেও জনমনে প্রভাব ফেলতে চাই। দলবদ্ধ আন্দোলন অনেক সময় কেবল একটি সাধারণ সামাজিক কর্মসূচি হিসেবে গৃহীত হয় এবং সাধারণ মানুষের আলাদা দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হয়। কিন্তু একা দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষকে দেখে পথচারীরা অন্তত ভাবে—'এই লোকটা কে এবং কেন দাঁড়িয়ে আছে?' এতে তাদের কৌতূহল জাগে।"
একাকী প্রতিবাদের সুবিধাও বর্ণনা করেন তিনি। কারো সাথে সমন্বয় না করে নিজের সুবিধাজনক সময়েযেকোনো স্থানে দাঁড়িয়ে নিজের মূল বক্তব্য নির্দ্বিধায় তুলে ধরা যায়। তবে অনেক সময় বিশাল জনতার মাঝে একক কণ্ঠস্বর হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় তিনি কোনো দিন বাদ না দিয়ে প্রতিদিন রাজপথে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
জাপানিদের উদাসীনতা ও আন্তর্জাতিক সমর্থন
রাজপথে দাঁড়িয়ে কেমন প্রতিক্রিয়া পান—এমন প্রশ্নের জবাবে ইউসুকে এক কষ্টকর সত্য প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "বেশিরভাগ স্থানীয় জাপানি নাগরিক একদম উদাসীন। মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে আমি চিৎকার করলেও অনেকে এমন ভাব করে যেন আমি সেখানে নেই-ই। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে আমার হাতের ব্যানারের দিকে চোখ না রেখে এড়িয়ে যায়। তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।"
তবে বিপরীতে বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে ব্যাপক সমর্থন ও সংহতি পান তিনি। ইউসুকে জানান, কখনো কখনো কড়া সমালোচনার মুখোমুখি হলেও অন্তত বিদেশি পর্যটকরা প্রতিক্রিয়া দেখান, যা শূন্যতার চেয়ে ভালো। জাপানি সমাজের এই চরম নির্বিকারত্বকে তিনি দুঃখজনক কিন্তু নির্মম বাস্তবতা বলে আখ্যা দেন।
নিরাশা ও হতাশা সত্ত্বেও নিজের প্রতিবাদের সিদ্ধান্ত থেকে বিন্দুমাত্র সরে আসতে চান না এই তরুণ। তিনি বলেন, "কখনো কখনো মনে হয় আমার এই চেষ্টা হয়তো লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। কিন্তু আমি এই সংগ্রামকে নিজের আত্মরক্ষা ও বিবেকের প্রতি দায়িত্ব বলে মনে করি। বিশ্ব শান্তি আজ চরমভাবে বিপর্যস্ত, গাজায় নির্বিচার হত্যাকাণ্ড থামছেই না। হয়তো অনেকে এটাকে 'ফাঁকা আদর্শ' বলে উপহাস করবে, কিন্তু আমি ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষের পক্ষে, নির্যাতিতদের পক্ষে শেষ পর্যন্ত লড়ে যাব।"
তিনি প্রতিজ্ঞা করে বলেন, "সারা বিশ্ব বধির হয়ে গেলেও আমি বলব—মানুষের রক্ষা করুন, মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান দিন, সমান অধিকার দিন। এই আহ্বান কারো কানে না পৌঁছালেও আমার নিজের ও বিবেকের দায় মেটাতে আমি প্রতিবাদ চালিয়ে যাব।"

আপনার মতামত লিখুন