কাজের সন্ধানে মুম্বাইয়ে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিক সাহিদা ফকিরকে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক করে বেআইনিভাবে বাংলাদেশে ‘পুশ-আউট’ করার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে ভারতের সীমান্তরক্ষী ও পুলিশের বিরুদ্ধে। পর্যাপ্ত আইনি প্রক্রিয়া ও নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়াই এই চরম পদক্ষেপ নেওয়ায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ মোদি সরকারের কাছে জবাব তলব করেছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। ভুক্তভোগীর ছেলে সাহিন ফকিরের দায়ের করা রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে দেশের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর চব্বিশ পরগনার গোবিন্দপুরের স্থায়ী বাসিন্দা ও বৈধ ভারতীয় নাগরিক সাহিদা ফকিরকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে পুশ-আউট করার এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। কাজের সূত্রে গত প্রায় দুই দশক ধরে মুম্বাইয়ে গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন সাহিদা। কিন্তু গত ১৯ জুলাই স্থানীয় বাজারে রুটি-তরকারি কিনতে গেলে তাকে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক করে নাভি মুম্বাই পুলিশ।
সাহিদার পরিবারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, আটকের পর তাকে কোনো বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়নি এবং আইনি পরামর্শ বা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ন্যূনতম সুযোগও দেওয়া হয়নি। কোনো সঠিক তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই Assam সীমান্ত দিয়ে তাকে জোরপূর্বক আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়।
ঘটনার শিকার সাহিদার ছেলে সাহিন ফকির সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন (সাহিন ফকির বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া অ্যান্ড আদার্স) দায়ের করে তার মাকে অবিলম্বে সসম্মানে ভারতে ফিরিয়ে আনা এবং সুরক্ষার দাবি জানান। বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই মামলার শুনানি গ্রহণ করেন। রিট আবেদনকারীর পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস মুরলীধর আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করেন।
আদালতে পেশ করা নথিতে দেখানো হয় যে, সাহিদা ফকিরের কাছে তার ভারতীয় নাগরিকত্বের সপক্ষে ভোটার কার্ড, জন্মনিবন্ধন সনদ, প্যান কার্ড, রেশন কার্ড এবং জমি-সংক্রান্ত যাবতীয় বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। এমনকি তার পরিবারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৫২ সালের ভারতীয় ভোটার তালিকায় তার দাদুর নাম এবং ২০০২ সালের তালিকায় তার বাবা-মায়ের নাম ছিল।
আইনজীবীরা আদালতকে অবহিত করেন, মোদি সরকারের অধীনে ভারতীয় মুসলিম ও সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে যে যাচাইবাছাই চালানো হচ্ছে, তার শিকার হয়েছেন সাহিদা। আইনি যাচাই ছাড়া কোনো নাগরিককে বহিস্কার করা ভারতীয় সংবিধানের ১৪, ১৯, ২১ ও ২২ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন। অবৈধ অভিবাসী শনাক্তকরণে ২০২৫ সালের প্রচলিত ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট’-এর নিয়মকানুনও সাহিদার ক্ষেত্রে তোয়াক্কা করা হয়নি।
সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা ও জবাব তলব করেছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ ও সরকারের প্রতিক্রিয়া আসার পর সাহিদাকে ফিরিয়ে আনার পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে। উল্লেখ্য, এর আগেও মানবিক ও আইনি ভুলের কারণে ভারতীয় মুসলিমদের বেআইনিভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে তাদের ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছিল ভারত সরকার।
মতামত