গাজায় ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি জোরদারের চলমান আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার মধ্যেই গাজা সিটির পৌর পুলিশ সদর দপ্তরে নৃশংস বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। বুধবার (১৯ আগস্ট ২০২৬) চালানো এই হামলায় নারী পুলিশ বিভাগের প্রধান কর্নেল ফাতেন আল-সাহহারসহ অন্তত ৯ জন নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়েছেন। নিরস্ত্র বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর এই হামলাকে "নিষ্ঠুর গণহত্যা" হিসেবে আখ্যায়িত করে গাজার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পুলিশকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে অবরুদ্ধ উপত্যকায় কৃত্রিম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাই তেল আবিবের মূল লক্ষ্য।
গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে মধ্যস্থতাকারীদের কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই অবরুদ্ধ উপত্যকাটিতে রক্তক্ষয়ী হামলা অব্যাহত রেখেছে দখলদার ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। বুধবার গাজা সিটির গভর্নরেট পৌরসভাগুলোর পুলিশ সদর দপ্তর লক্ষ্য করে একাধিক শক্তিশালী বোমানিক্ষেপ করে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান।
ফিলিস্তিনি প্যারামেডিক ও উদ্ধারকারীদের সূত্রমতে, ভয়াবহ এই বিমান হামলায় ঘটনাস্থলেই অন্তত ৯ জন নিহত হন এবং ১৫ জনেরও বেশি আহত হন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, নিহতদের মধ্যে গাজার নারী পুলিশ বিভাগের প্রধান কর্নেল ফাতেন আল-সাহহারসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়েছেন।
গাজার পুলিশ বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথ বিবৃতিতে এই হামলাকে দখলদার শক্তির একটি "নিষ্ঠুর গণহত্যা" বলে অভিহিত করেছে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় বেসামরিক নাগরিকদের সেবা ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে গাজায় অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দেওয়াই ইসরায়েলের কুৎসিত কৌশল।
এর আগের দিন, মঙ্গলবার গাজা সিটির একটি জনাকীর্ণ ক্যাফেতে ইসরায়েলি বোমাহামলায় শিশুসহ অন্তত সাতজন নিহত হন, যা ছিল সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী একক হামলা। এছাড়া বুধবার মধ্য গাজায় পৃথক বিমান হামলায় আরও এক ফিলিস্তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে স্পষ্ট "যুদ্ধাপরাধ" হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, মধ্যস্থতাকারীদের যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করাই তেল আবিবের মূল উদ্দেশ্য। অন্যদিকে, বরাবরের মতোই কোনোপ্রকার তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন ছাড়াই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলি সেনাদের ওপর হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত "হামাস কর্মীদের" লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছে।
কুশনারের 'সবুজ সংকেত' ও মার্কিন ভূমিকা: উত্তেজনার এই নতুন রূপ এমন এক সময়ে সামনে এলো, যার মাত্র কয়েক দিন আগেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার। পরিবার সূত্রে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ কুশনার ইসরায়েল সফরের আগে মিশরে গিয়ে হামাস নেতাদের সঙ্গেও আলোচনায় বসেছিলেন।
তবে নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কুশনার সাফ জানিয়ে দেন, হামাস অস্ত্র ত্যাগ না করা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র গাজায় কোনো পুনর্গঠন কাজ শুরু করতে দেবে না। এমনকি হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করতে না পারলে ইসরায়েলকে তাদের সামরিক অভিযান "শেষ করার" জন্য একপ্রকার গোপন সবুজ সংকেত দিয়েছে ওয়াশিংটন।
এর আগে হামাস জানিয়েছিল যে, ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ এবং উপত্যকা থেকে দখলদার বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের শর্তে তারা পর্যায়ক্রমে নিরস্ত্রীকরণ ও মার্কিন নেতৃত্বাধীন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু ইসরায়েল সরকারের অটল আগ্রাসী মনোভাবের কারণে সেই প্রস্তাব আলোর মুখ দেখেনি।
গাজায় হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম সাম্প্রতিক এই উত্তেজনার জন্য মার্কিন নেতৃত্বাধীন তথাকথিত "শান্তি পরিষদকে" সরাসরি দায়ী করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, দখলদারদের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে এবং চুক্তি মানতে বাধ্য করতে এই পরিষদ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
উল্লেখ্য, অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রধান লক্ষ্য ছিল গাজায় দুই বছর ধরে চলা ইসরায়েলি গণহত্যার অবসান ঘটানো যে সময়টিতে দখলদার বাহিনী ৭৩,০০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে এবং গাজার ৯০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেও প্রায় প্রতিদিনই বিমান হামলা ও অবরোধের মাধ্যমে চুক্তি লঙ্ঘন করে আসছে তেল আবিব, যার ফলে গত কয়েক মাসেই ৩০০ শিশুসহ ১,২০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।
মতামত