যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যপ্রাচ্য নীতি চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে এবং এই সংঘাতের মাধ্যমে ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী একটি ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র লাভ করেছে বলে মন্তব্য করেছে ব্রিটিশ প্রভাবশালী পত্রিকা 'দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট'। পত্রিকাটির সাম্প্রতিক এক সম্পাদকীয় বিশ্লেষণে বলা হয়, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ভিয়েতনাম বা পার্ল হারবার ট্র্যাজেডির চেয়েও বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ওয়াশিংটনের সামরিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কৌশল তেহরানকে দমাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
যুক্তরাজ্য ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির দাপট দেখিয়ে ইরানকে বশ করার মার্কিন পরিকল্পনা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আমেরিকা ও ইসরায়েলের এই আগ্রাসী পদক্ষেপ তেহরানের কোনো ক্ষতি করা দূরে থাক, উল্টো তাদের হাতে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার অভূতপূর্ব ক্ষমতা তুলে দিয়েছে।
ব্যর্থ সামরিক ও অর্থনৈতিক কৌশল
নিবন্ধে প্রশ্ন তোলা হয়, “ইরানকে যদি অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করা সম্ভব হতো, তবে তেহরানকে ধ্বংস করে দেওয়ার মার্কিন হুমকি কেন দিতে হলো?” এটি ট্রাম্প প্রশাসনের স্পষ্ট নীতিহীনতা ও কৌশলগত ব্যর্থতার প্রমাণ।
ছয় মাস আগে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংঘাতের মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে নিবন্ধে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল সামরিক শক্তিতে ইরানকে শর্তহীন আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে ইরান এখনো তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বজায় রেখেছে এবং অঞ্চলে নিজেদের অক্ষ ও প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক টিকিয়ে রেখেছে।
আমেরিকার ওপর কৌশলগত আঘাত
যুক্তরাষ্ট্রের ঔদ্ধত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়:
অর্থনৈতিক মোর্চাতেও যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়
সামরিক শক্তি ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জোরদারের দিকে নজর দেয়। কিন্তু এই নীতিও বাস্তবতার মুখে টিকছে না। চীন, ভারত ও জাপানের মতো বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোকে মার্কিন ফাঁদ থেকে বাঁচতে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা ও পেট্রোকেমিক্যাল সরবরাহ বিসর্জন দিতে বাধ্য করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অসম্ভব।
একদিকে জাপানের অর্থনীতিকে সমর্থন দেওয়া আর অন্যদিকে তেল আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দেওয়ার এই মার্কিন নীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চরম পরিহাসমূলক। তদুপরি, চীন ও ভারতের মতো অর্থনৈতিক পরাশক্তি এবং রাশিয়ার সাথে ইরানের গভীর কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকায় যুক্তরাষ্ট্র নিজের বাণিজ্যিক প্রভাব খাটানোর যে চেষ্টা করছে, তা পুরোপুরি অবাস্তব।
পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও কার্যকর হাতিয়ার
দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের বিশ্লেষণে সবচেয়ে বিস্ফোরক পর্যবেক্ষণটি তুলে ধরা হয় এভাবে— আমেরিকা ও ইসরায়েলের যুদ্ধের ফলে তেহরান কোনো পারমাণবিক বোমার চেয়েও কার্যকর একটি 'অস্ত্র' হাতে পেয়েছে। তা হলো 'পশ্চিমা বিশ্বের সমগ্র জ্বালানি সরবরাহের ওপর ইরানের একক ও পূর্ণ কর্তৃত্ব'।
কয়েক ডজন পারমাণবিক ওয়ারহেডের চেয়েও এই জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর আধিপত্য প্রতিদিনের ভূ-রাজনীতিতে অনেক বেশি কার্যকর ও ব্যবহারযোগ্য। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর মার্কিন দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তেহরানের হাতে এই মোক্ষম অস্ত্রটি তুলে দিয়েছে ওয়াশিংটন নিজেই।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভবিষ্যৎ সংকট
প্রতিবেদনে মার্কিন জনগণের তীব্র ক্ষোভের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়, ট্রাম্প ও তার দলের নীতি আমেরিকান ভোটারদের চরমভাবে হতাশ করেছে। নভেম্বর নির্বাচনে এই ক্ষোভের প্রতিফল ঘটতে পারে। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আবারও অভিশংশন (Impeachment) প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে তৈরি হওয়া এই রাজনৈতিক অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে এই ব্যর্থ ও বিপর্যয়কর যুদ্ধ থেকে সরে আসতে বাধ্য করতে পারে।
বিষয় : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরান

শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ আগস্ট ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যপ্রাচ্য নীতি চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে এবং এই সংঘাতের মাধ্যমে ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী একটি ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র লাভ করেছে বলে মন্তব্য করেছে ব্রিটিশ প্রভাবশালী পত্রিকা 'দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট'। পত্রিকাটির সাম্প্রতিক এক সম্পাদকীয় বিশ্লেষণে বলা হয়, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ভিয়েতনাম বা পার্ল হারবার ট্র্যাজেডির চেয়েও বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ওয়াশিংটনের সামরিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কৌশল তেহরানকে দমাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
যুক্তরাজ্য ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির দাপট দেখিয়ে ইরানকে বশ করার মার্কিন পরিকল্পনা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আমেরিকা ও ইসরায়েলের এই আগ্রাসী পদক্ষেপ তেহরানের কোনো ক্ষতি করা দূরে থাক, উল্টো তাদের হাতে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার অভূতপূর্ব ক্ষমতা তুলে দিয়েছে।
ব্যর্থ সামরিক ও অর্থনৈতিক কৌশল
নিবন্ধে প্রশ্ন তোলা হয়, “ইরানকে যদি অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করা সম্ভব হতো, তবে তেহরানকে ধ্বংস করে দেওয়ার মার্কিন হুমকি কেন দিতে হলো?” এটি ট্রাম্প প্রশাসনের স্পষ্ট নীতিহীনতা ও কৌশলগত ব্যর্থতার প্রমাণ।
ছয় মাস আগে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংঘাতের মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে নিবন্ধে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল সামরিক শক্তিতে ইরানকে শর্তহীন আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে ইরান এখনো তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বজায় রেখেছে এবং অঞ্চলে নিজেদের অক্ষ ও প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক টিকিয়ে রেখেছে।
আমেরিকার ওপর কৌশলগত আঘাত
যুক্তরাষ্ট্রের ঔদ্ধত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়:
অর্থনৈতিক মোর্চাতেও যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়
সামরিক শক্তি ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জোরদারের দিকে নজর দেয়। কিন্তু এই নীতিও বাস্তবতার মুখে টিকছে না। চীন, ভারত ও জাপানের মতো বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোকে মার্কিন ফাঁদ থেকে বাঁচতে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা ও পেট্রোকেমিক্যাল সরবরাহ বিসর্জন দিতে বাধ্য করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অসম্ভব।
একদিকে জাপানের অর্থনীতিকে সমর্থন দেওয়া আর অন্যদিকে তেল আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দেওয়ার এই মার্কিন নীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চরম পরিহাসমূলক। তদুপরি, চীন ও ভারতের মতো অর্থনৈতিক পরাশক্তি এবং রাশিয়ার সাথে ইরানের গভীর কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকায় যুক্তরাষ্ট্র নিজের বাণিজ্যিক প্রভাব খাটানোর যে চেষ্টা করছে, তা পুরোপুরি অবাস্তব।
পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও কার্যকর হাতিয়ার
দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের বিশ্লেষণে সবচেয়ে বিস্ফোরক পর্যবেক্ষণটি তুলে ধরা হয় এভাবে— আমেরিকা ও ইসরায়েলের যুদ্ধের ফলে তেহরান কোনো পারমাণবিক বোমার চেয়েও কার্যকর একটি 'অস্ত্র' হাতে পেয়েছে। তা হলো 'পশ্চিমা বিশ্বের সমগ্র জ্বালানি সরবরাহের ওপর ইরানের একক ও পূর্ণ কর্তৃত্ব'।
কয়েক ডজন পারমাণবিক ওয়ারহেডের চেয়েও এই জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর আধিপত্য প্রতিদিনের ভূ-রাজনীতিতে অনেক বেশি কার্যকর ও ব্যবহারযোগ্য। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর মার্কিন দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তেহরানের হাতে এই মোক্ষম অস্ত্রটি তুলে দিয়েছে ওয়াশিংটন নিজেই।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভবিষ্যৎ সংকট
প্রতিবেদনে মার্কিন জনগণের তীব্র ক্ষোভের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়, ট্রাম্প ও তার দলের নীতি আমেরিকান ভোটারদের চরমভাবে হতাশ করেছে। নভেম্বর নির্বাচনে এই ক্ষোভের প্রতিফল ঘটতে পারে। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আবারও অভিশংশন (Impeachment) প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে তৈরি হওয়া এই রাজনৈতিক অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে এই ব্যর্থ ও বিপর্যয়কর যুদ্ধ থেকে সরে আসতে বাধ্য করতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন