ভারতের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালায় মিডিয়া ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা উগ্র হিন্দুত্ববাদী ভাবধারার ছায়া কীভাবে সংবাদকক্ষে প্রবেশ করছে, তা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে ইসলামোফোবিয়া ওয়াচের নতুন এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, মালয়ালম টিভি চ্যানেলগুলোর এই ইসলামবিদ্বেষী অবস্থান বিচ্ছিন্ন কোনো সাংবাদিক বা প্রতিবেদকের ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, বরং এটি নিউজ রুমের সার্বিক নীতি ও কাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মূলধারার চ্যানেলগুলোতেও ছড়িয়েছে বিষাক্ত নেটওয়ার্ক
আরএসএস ও হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত 'জনম টিভি' (Janam TV) এই তালিকায় শীর্ষে থাকলেও, প্রতিবেদনটি দেখায় যে তথাকথিত মূলধারার নিরপেক্ষ চ্যানেলগুলো—যেমন এশিয়ানেট নিউজ, মনোরমা নিউজ, ২৪ নিউজ এবং মাথরুভূমি নিউজেও একইভাবে ইসলামোফোবিক ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষণায় চ্যানেলগুলোর মালিকানা ও রাজনৈতিক যোগাযোগের গভীর সম্পর্কের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
ইসলামোফোবিয়ার সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড
ইসলামোফোবিয়া ওয়াচ জানিয়েছে, ইসলাম বা কোনো মুসলিম ব্যক্তি কিংবা সংগঠনের গঠনমূলক সমালোচনাকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বরং যেসব প্রতিবেদনে—
মুসলিম সম্প্রদায়কে ধারাবাহিক সন্দেহভাজন, উগ্রপন্থী, সামাজিক অনগ্রসর বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়;
কোনো একজন মুসলিমের ব্যক্তিগত অপরাধকে পুরো মুসলিম সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়;
মুসলিম রাজনৈতিক বা সামাজিক অধিকার রক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে দ্বিমুখী নীতি প্রয়োগ করা হয়;
সংবাদ শিরোনাম, ভিজ্যুয়াল ও আলোচনার মাধ্যমে মুসলিমদের সবসময় সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন বা 'অপর' (Other) হিসেবে উপস্থাপন করা হয়—সেগুলোকেই ইসলামোফোবিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখিত উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা:
১. পুচার ভেটেরিনারি কলেজ ঘটনা (ফেব্রুয়ারি ২০২৪): এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনাকে কোনো প্রমাণ ছাড়াই জনম টিভি "ক্যাম্পাস তালিবানিজম" বলে অভিহিত করে, যদিও এতে কোনো মুসলিম সংগঠনের সম্পৃক্ততা ছিল না।
২. পুনজার গির্জা মাঠের ঘটনা (ফেব্রুয়ারি ২০২৪): স্থানীয় কিছু তরুণের বাইক চালানো নিয়ে বিরোধকে News18 ও অন্যান্য চ্যানেলগুলো বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করে ধর্মীয় হামলার রূপ দেওয়ার অপচেষ্টা চালায়।
৩. রামেশ্বরম ক্যাফে বিস্ফোরণ মামলা (মার্চ ২০২৪): বিস্ফোরণের পর শাবির নামের এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে বলে বেশ কিছু মালয়ালম চ্যানেল ব্রেকিং নিউজ দেয় এবং ২৪ নিউজ তাকে "প্রধান অভিযুক্ত" দাবি করে। পরে এনআইএ (NIA) স্পষ্ট করে যে কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। এশিয়ানেট নিউজ পরবর্তীতে এই ভুয়ো খবর তুলে নিতে বাধ্য হয়।
৪. রাজনীতি ও প্রতিনিধিত্বে বৈষম্য (এপ্রিল ২০২৪): রাজনৈতিক জোটের সমর্থনে মুসলিম দলগুলোর অবস্থান নিয়ে মনোরমা নিউজের এক উত্তপ্ত আলোচনায় বিজেপি, আরএসএস, সিপিআইএম ও কংগ্রেস নেতাদের রাখা হলেও সংশ্লিষ্ট মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের কথা বলার কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি।
৫. সংবাদের ভাষার দ্বিমুখী নীতি: মার্চ ২০২৪-এ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মালাপ্পুরমে একটি গণপিটুনির ঘটনাকে এশিয়ানেট নিউজ "মালাপ্পুরম মব অ্যাটাক" বলে পুরো জেলাকে অপরাধী সাব্যস্ত করে, অথচ এরনাকুলামের ঘটনায় জেলার নাম গোপন রেখে স্থানীয় একটি অপরাধ হিসেবে প্রচার করে ২৪ নিউজ।
৬. 'দ্য কেরালা স্টোরি' প্রচার: ভারতের জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যম দূরদর্শন লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে ইসলামোফোবিক ও বিতর্কিত চলচ্চিত্র 'দ্য কেরালা স্টোরি' সম্প্রচার করে, যেখানে মুসলিম যুবকদের বিরুদ্ধে ভুয়ো ধর্মান্তরকরণের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
যদিও এসব চ্যানেলের কেউ কেউ মাঝে মাঝে মুসলিম নিপীড়নের বিরুদ্ধে ইতিবাচক খবর প্রকাশ করে, তবুও একই সংস্থায় পদ্ধতিগতভাবে কীভাবে ইসলামোফোবিয়ার চর্চা চালু থাকে—তা অনুসন্ধান ও প্রতিরোধ করা জরুরি।
মতামত