ভারতের আসাম রাজ্যের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ গোয়ালপাড়া জেলায় এক বিতর্কিত উচ্ছেদ অভিযানে ৭৩টি আবাসিক ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় জেলা প্রশাসন। নিজস্ব বৈধ মালিকানাধীন জমি হওয়া সত্ত্বেও কেবল 'কৃষিজমিকে আবাসিক জমিতে রূপান্তর না করার' অজুহাতে গত সোমবার (৬ সেপ্টেম্বর) এ ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। মাত্র ২৪ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত নোটিশে উচ্ছেদ করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষা সংস্থাগুলো।
ভারতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের টার্গেট করে উচ্ছেদ অভিযানের ধারাবাহিকতায় আসামের গোয়ালপাড়া জেলায় নতুন করে ৭৩টি মুসলিম পরিবারকে গৃহহীন করার ঘটনা ঘটেছে। জেলা প্রশাসনের নির্দেশে সোমবার (৬ সেপ্টেম্বর) কৃষ্ণা এলাকাভুক্ত পাঁচটি রাজস্ব গ্রামে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। গ্রামগুলো হলো—খারিজা পাইকান, খামার মানিকপুর, ভোজমালা পার্ট-২, জাঠশারবাড়ি এবং টেঙ্গাবাড়ি।
উচ্ছেদ কার্যক্রমে বুলডোজার, জেসিবি (JCB) এবং এক্সকাভেটর ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যেই বহু বছরের পুরনো বসতবাড়ি ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
প্রশাসনের দোহাই ও কৃষিজমি অজুহাত
জেলা প্রশাসনের দাবি, ঘরবাড়িগুলো যেসব জমিতে নির্মিত হয়েছিল, সেগুলো সরকারি নথিতে কৃষিজমি হিসেবে চিহ্নিত। আইন অনুযায়ী কৃষিজমিকে আবাসিক জমিতে রূপান্তরের জন্য পূর্বানুমতি নেওয়ার নিয়ম থাকলেও অধিবাসীরা তা মানেননি।
গোয়ালপাড়ার জেলা কমিশনার প্রদীপ তিমুং বলেন, “কৃষিজমি, জলাশয় এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সুরক্ষার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এগুলো পুরোটাই কৃষিজমি ছিল, কিন্তু রাতারাতি মানুষ এখানে বসতি স্থাপন শুরু করে।” তিনি আরও যোগ করেন, অনুমতি ছাড়া বাড়ি বানানোর ফলে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছিল এবং জলাশয় সংকুচিত হয়ে পড়ছিল।
মটিয়া রাজস্ব সার্কেল অফিসারের মাধ্যমে অধিবাসীদের এলাকা ত্যাগ ও ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার জন্য মাত্র ২৪ ঘণ্টার সময় দিয়ে নোটিশ দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কেউ জায়গা খালি না করায় প্রশাসন সরাসরি ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে উচ্ছেদে নামে।
নথি থাকার পরও উচ্ছেদ: প্রজা ও ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রতিবাদ
প্রশাসনের এই কঠোর পদক্ষেপে চরম বিপাকে পড়েছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। স্থানীয় অধিবাসী ও মুসলিম ছাত্রসংগঠনগুলো এই অভিযানের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে প্রশ্ন তুলেছে—নিজের জমিতে বাড়ি করা কিভাবে অপরাধ হতে পারে?
নর্থ ইস্ট মাইনরিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (NEMSU) নির্বাহী সভাপতি নুরুল ইসলাম বলেন, “যাদের বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে, তারা সরকারের খাস জমিতে নয়, বরং নিজেদের কেনা জমিতে বসবাস করছিলেন। তাদের কাছে জমির সমস্ত বৈধ কাগজপত্র ছিল। তাদের একমাত্র 'অপরাধ' ছিল জমিটি শ্রেণীকরণে 'কৃষিজমি' লেখা ছিল।” ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে অবিলম্বে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং উচ্ছেদ অভিযান পুনর্বিবেচনার দাবি জানান তিনি।
একই সুর ছড়িয়ে পড়ে আসামের মুসলিম স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (MSUA) বক্তব্যেও। সংগঠনের সভাপতি আশিক রব্বানী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “নিজের বৈধ কৃষিজমিতে মাথার ওপর একটি ছাদ বা ঘর তৈরি করা কখনোই কোনো অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে না। আইনগত প্রক্রিয়ার নামে এভাবে মানুষকে গৃহহীন করা অমানবিক।”
সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ অস্বীকার প্রশাসনের
এই উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে সংখ্যালঘু মুসলমানদের টার্গেট করার অভিযোগ উঠলেও জেলা কমিশনার প্রদীপ তিমুং তা অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, দরং, বরপেটা, ধুবড়ি এবং মানকাচরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মানুষ এখানে বসতি গড়েছিল। তিনি বলেন, “এটি হিন্দু বা মুসলিম সংক্রান্ত কোনো বিষয় নয়। বহু মুসলিম অধিবাসী নিজেও এখানে কৃষিজমিতে অবৈধ বাড়ি নির্মাণের বিষয়ে অভিযোগ করেছিলেন।”
তবে আসামের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ মানবাধিকার কর্মীরা। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরেও গোয়ালপাড়ার দহিকাটা এলাকায় বনভূমির নামে এক বিশাল উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে বহু মানুষকে ভিটেমাটি ছাড়া করা হয়েছিল। ভারতের আসাম রাজ্যে মুসলিমদের বারবার উচ্ছেদের মুখে ঠেলে দেওয়ার এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়াকে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সংখ্যালঘুদের ওপর এক ধরণের রাজনৈতিক নিপীড়ন হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
মতামত