বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কওমী টাইমস

উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুর কালেক্টরেটে শতবর্ষী মসজিদ বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর নিচে পাওয়া গেল পুরনো কূপ; প্রত্নতাত্ত্বিক নিশ্চিতকরণের আগেই হিন্দুত্ববাদী নেতাদের কাল্পনিক দাবি ও মন্দির জল্পনা।

সাহারানপুরে গুঁড়িয়ে দেওয়া মসজিদের ২০০ বছরের প্রাচীন কূপ নিয়ে নতুন ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা


কওমী টাইমস ডেস্ক
কওমী টাইমস ডেস্ক
প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাহারানপুরে গুঁড়িয়ে দেওয়া মসজিদের ২০০ বছরের প্রাচীন কূপ নিয়ে নতুন ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা

ভারতের উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুর কালেক্টরেট প্রাঙ্গণে একটি ঐতিহাসিক মসজিদ ধ্বংসের পর ধ্বংসস্তূপ সরানোর সময় হঠাৎ একটি গভীর প্রাচীন কূপ আবিষ্কৃত হয়েছে। ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ (ASI) ও রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, লাখৌরি ইট ও চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি এই কূপটি প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ বছরের পুরোনো। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই শাসকদল বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক নেতারা স্থানটিকে মন্দিরের সাথে যুক্ত করার অলীক দাবি তুলতে শুরু করেছেন। স্থানীয় মুসলিম সমাজ ও অধিকারকর্মীদের মতে, ঐতিহাসিক মসজিদে অযাচিতভাবে মন্দির বিতর্কের তকমা সেঁটে দেওয়ার জন্য এটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর আরেক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ।

সাহারানপুরে মসজিদ ধ্বংসের পর নতুন চক্রান্ত

ভারতের উত্তরপ্রদেশে মুসলিম ধর্মীয় ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক স্থাপনার ওপর চলমান আগ্রাসনের ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি সাহারানপুর কালেক্টরেট প্রাঙ্গণে অবস্থিত এক শতাব্দীরও বেশি প্রাচীন একটি মসজিদ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। এরপর রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করার সময় মাটি থেকে প্রায় ২০ ফুট গভীর এবং ৩ ফুট প্রশস্ত একটি পুরনো রূপালী কূপের সন্ধান মেলে। ঘটনার পর সোমবার লক্ষ্ণৌ থেকে আসা ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ (ASI) ও রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রতিনিধি দল স্থানটি পর্যবেক্ষণ করে।

প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য ও বিশেষজ্ঞ মতামত

সহকারী প্রত্নতাত্ত্বিক কর্মকর্তা মনোজ কুমার যাদব স্থান পরিদর্শন ও কূপের ভেতরে নেমে পর্যবেক্ষণ শেষে জানান, নির্মাণশৈলী ও ব্যবহৃত উপকরণ—বিশেষ করে লাখৌরি ইট এবং চুন-সুরকির মিশ্রণ—দেখে মনে হচ্ছে এটি উত্তর ও মধ্য গঙ্গা অববাহিকার উত্তর-মধ্যযুগের স্থাপত্য নিদর্শন। প্রাথমিকভাবে এর বয়স ২০০ থেকে ২৫০ বছর হতে পারে বলে অনুমান করা হলেও, কূপের ভেতর ময়লা ও আবর্জনা থাকায় এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। মনোজ যাদব স্পষ্ট করে সতর্ক করেছেন যে, পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও পূর্ণাঙ্গ খনন ছাড়া এ নিয়ে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় অল্পনিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো অনুচিত।

ঐতিহাসিক সত্যতা ও মুসলিম সমাজের অবস্থান

ঐতিহাসিকভাবে উপমহাদেশে পুরনো মসজিদ প্রাঙ্গণে অজুখানা বা পানি ব্যবহারের জন্য কূপ থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক ও সাধারণ একটি বিষয়। অধিকন্তু, স্থানীয় ওয়াকফ রেকর্ড ও রাজস্ব নথি অনুসারে, এই জমিটি শতবর্ষ আগে এক মুসলিম পরিবারই দান করেছিল, যেখানে মসজিদ ও পার্শ্ববর্তী প্রাঙ্গণ নির্মিত হয়। শত বছর ধরে মুসলিমরা সেখানে নিরবচ্ছিন্নভাবে ইবাদত করে আসছিলেন। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘বজরং দল’-এর আবেদনের ভিত্তিতে তড়িঘড়ি করে আদালত থেকে উচ্ছেদ আদেশ বের করে মসজিদটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, যা চরম অন্যায় ও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির নতুন ফাঁদ

কূপ আবিষ্কারের খবর চাউর হতেই বিজেপি ও তার সহযোগী হিন্দুত্ববাদী নেতারা নতুন করে ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা শুরু করেছেন। যোগী সরকারের মন্ত্রী নরেন্দ্র কাশ্যপ ও ওপি রাজভর সরাসরি দাবি করেছেন যে, সেখানে আগে মন্দির বা অন্য কোনো উপাসনালয় ছিল এবং তার ওপর জোরপূর্বক মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। রাজ্যের উপ-মুখ্যমন্ত্রী ব্রিজেশ পাঠক অবশ্য ঘটনাটিকে বিচারাধীন বিষয় উল্লেখ করে কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন। অপরদিকে, সমাজবাদী পার্টি ও স্থানীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দ বলছেন, মসজিদ ভাঙার পর এখন নতুন করে বাবরি মসজিদ কিংবা জ্ঞানবাপীর মতো ধর্মীয় হিংসা ও মেরুকরণ তৈরির অজুহাত খোঁজা হচ্ছে, যা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিচ্ছে।

বিষয় : ভারত মসজিদ সংখ্যালঘু

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সাহারানপুরে গুঁড়িয়ে দেওয়া মসজিদের ২০০ বছরের প্রাচীন কূপ নিয়ে নতুন ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা

প্রকাশের তারিখ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

ভারতের উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুর কালেক্টরেট প্রাঙ্গণে একটি ঐতিহাসিক মসজিদ ধ্বংসের পর ধ্বংসস্তূপ সরানোর সময় হঠাৎ একটি গভীর প্রাচীন কূপ আবিষ্কৃত হয়েছে। ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ (ASI) ও রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, লাখৌরি ইট ও চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি এই কূপটি প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ বছরের পুরোনো। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই শাসকদল বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক নেতারা স্থানটিকে মন্দিরের সাথে যুক্ত করার অলীক দাবি তুলতে শুরু করেছেন। স্থানীয় মুসলিম সমাজ ও অধিকারকর্মীদের মতে, ঐতিহাসিক মসজিদে অযাচিতভাবে মন্দির বিতর্কের তকমা সেঁটে দেওয়ার জন্য এটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর আরেক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ।

সাহারানপুরে মসজিদ ধ্বংসের পর নতুন চক্রান্ত

ভারতের উত্তরপ্রদেশে মুসলিম ধর্মীয় ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক স্থাপনার ওপর চলমান আগ্রাসনের ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি সাহারানপুর কালেক্টরেট প্রাঙ্গণে অবস্থিত এক শতাব্দীরও বেশি প্রাচীন একটি মসজিদ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। এরপর রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করার সময় মাটি থেকে প্রায় ২০ ফুট গভীর এবং ৩ ফুট প্রশস্ত একটি পুরনো রূপালী কূপের সন্ধান মেলে। ঘটনার পর সোমবার লক্ষ্ণৌ থেকে আসা ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ (ASI) ও রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রতিনিধি দল স্থানটি পর্যবেক্ষণ করে।

প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য ও বিশেষজ্ঞ মতামত

সহকারী প্রত্নতাত্ত্বিক কর্মকর্তা মনোজ কুমার যাদব স্থান পরিদর্শন ও কূপের ভেতরে নেমে পর্যবেক্ষণ শেষে জানান, নির্মাণশৈলী ও ব্যবহৃত উপকরণ—বিশেষ করে লাখৌরি ইট এবং চুন-সুরকির মিশ্রণ—দেখে মনে হচ্ছে এটি উত্তর ও মধ্য গঙ্গা অববাহিকার উত্তর-মধ্যযুগের স্থাপত্য নিদর্শন। প্রাথমিকভাবে এর বয়স ২০০ থেকে ২৫০ বছর হতে পারে বলে অনুমান করা হলেও, কূপের ভেতর ময়লা ও আবর্জনা থাকায় এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। মনোজ যাদব স্পষ্ট করে সতর্ক করেছেন যে, পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও পূর্ণাঙ্গ খনন ছাড়া এ নিয়ে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় অল্পনিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো অনুচিত।

ঐতিহাসিক সত্যতা ও মুসলিম সমাজের অবস্থান

ঐতিহাসিকভাবে উপমহাদেশে পুরনো মসজিদ প্রাঙ্গণে অজুখানা বা পানি ব্যবহারের জন্য কূপ থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক ও সাধারণ একটি বিষয়। অধিকন্তু, স্থানীয় ওয়াকফ রেকর্ড ও রাজস্ব নথি অনুসারে, এই জমিটি শতবর্ষ আগে এক মুসলিম পরিবারই দান করেছিল, যেখানে মসজিদ ও পার্শ্ববর্তী প্রাঙ্গণ নির্মিত হয়। শত বছর ধরে মুসলিমরা সেখানে নিরবচ্ছিন্নভাবে ইবাদত করে আসছিলেন। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘বজরং দল’-এর আবেদনের ভিত্তিতে তড়িঘড়ি করে আদালত থেকে উচ্ছেদ আদেশ বের করে মসজিদটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, যা চরম অন্যায় ও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির নতুন ফাঁদ

কূপ আবিষ্কারের খবর চাউর হতেই বিজেপি ও তার সহযোগী হিন্দুত্ববাদী নেতারা নতুন করে ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা শুরু করেছেন। যোগী সরকারের মন্ত্রী নরেন্দ্র কাশ্যপ ও ওপি রাজভর সরাসরি দাবি করেছেন যে, সেখানে আগে মন্দির বা অন্য কোনো উপাসনালয় ছিল এবং তার ওপর জোরপূর্বক মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। রাজ্যের উপ-মুখ্যমন্ত্রী ব্রিজেশ পাঠক অবশ্য ঘটনাটিকে বিচারাধীন বিষয় উল্লেখ করে কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন। অপরদিকে, সমাজবাদী পার্টি ও স্থানীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দ বলছেন, মসজিদ ভাঙার পর এখন নতুন করে বাবরি মসজিদ কিংবা জ্ঞানবাপীর মতো ধর্মীয় হিংসা ও মেরুকরণ তৈরির অজুহাত খোঁজা হচ্ছে, যা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিচ্ছে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ