বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
কওমী টাইমস

ইসরায়েলি হামলায় ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ও সহস্রাধিক মসজিদ ধ্বংসের ফলে ফিলিস্তিনিদের আধ্যাত্মিক জীবনে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার

গাজায় শোকাতুর রমজান: ৩১২ জন ইমামের শূন্যতা ও ধ্বংসস্তূপে প্রার্থনার আর্তনাদ


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

গাজায় শোকাতুর রমজান: ৩১২ জন ইমামের শূন্যতা ও ধ্বংসস্তূপে প্রার্থনার আর্তনাদ

অবরুদ্ধ গাজা উপখণ্ডে টানা দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি আগ্রাসনে ফিলিস্তিনিদের ধর্মীয় ও সামাজিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। রমজানের পবিত্র আবহে যেখানে মসজিদগুলো মুসল্লিদের কলতানে মুখরিত থাকার কথা, সেখানে আজ বিরাজ করছে শ্মশানের নীরবতা। ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত ৩১২ জন প্রথিতযশা ইমাম ও ধর্মতত্ত্ববিদ নিহত হয়েছেন, যা গাজার মুসলিম সমাজের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক কাঠামোতে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করেছে।

পরিকল্পিত নিধনযজ্ঞ: লক্ষ্য যখন ধর্মীয় নেতৃত্ব

গাজা সরকারের মিডিয়া অফিসের পরিচালক ইসমাইল আল-সাওয়াবিতা এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ইসরায়েল বেছে বেছে গাজার ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতীকগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। তিনি বলেন, "ইসরায়েল সেই সব ব্যক্তিত্বদের হত্যা করেছে যারা সমাজে শান্তি রক্ষা, নৈতিক দিকনির্দেশনা এবং জনগণের মনোবল চাঙ্গা রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।"

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে ৩১২ জন ইমাম, খতিব ও ওয়ায়েজ নিহত হয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ডগুলো কেবল সামরিক অভিযান নয়, বরং একটি জাতির ধর্মীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মুছে ফেলার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মসজিদের ধ্বংসস্তূপে তারাবি

গাজার ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, উপত্যকার মোট ১,২৭৫টি মসজিদের মধ্যে ১,০৫০টি সম্পূর্ণ এবং ১৯১টি আংশিকভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। অর্থাৎ, গাজার প্রায় ৯৭% মসজিদ এখন ব্যবহারের অনুপযোগী। রমজানের এই সময়ে ফিলিস্তিনিরা এখন খোলা আকাশের নিচে, তাবু গেড়ে অথবা ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদের ফাটল ধরা দেওয়ালের মাঝেই নামাজ আদায় করছেন।

ইসমাইল আল-সাওয়াবিতা আরও জানান, শুধু মসজিদ নয়, ইসরায়েলি হামলায় তিনটি গির্জাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ২০ জন খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী নিহত হয়েছেন। ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংসের ফলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০০ কোটি ডলারে। এমনকি গাজার কবরস্থানগুলোও ইসরায়েলি বুলডোজারের হাত থেকে রেহাই পায়নি।

হারানো নক্ষত্র: যাদের শূন্যতা কাটছে না

নিহত ৩১২ জন ইমামের মধ্যে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব ছিলেন যারা আন্তর্জাতিকভাবেও সমাদৃত:

  • শেখ ইউসুফ সালামা: ফিলিস্তিনের সাবেক ওয়াকফ ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী এবং আল-আকসা মসজিদের খতিব। ২০ ডিসেম্বর ২০২৩-এ মাগাজি শরণার্থী শিবিরে নিজ বাড়িতে হামলায় তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
  • ড. ওয়ায়েল আল-জারদ: একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও গাজার আল-ওমারি মসজিদের ইমাম। ১৩ অক্টোবর ২০২৩-এ হামলার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
  • ড. ওয়ালিদ আবিদা: গাজার হাফেজ তৈরির কারিগর এবং হাদিস শাস্ত্রের পণ্ডিত। ১২ নভেম্বর ২০২৪-এ নিজ বাসভবনে সপরিবারে নিহত হন।
  • ড. নায়েল মাসরান: ফিকহ শাস্ত্রের পণ্ডিত ও প্রকৌশলী মাসরান ৩০ মে ২০২৫-এ খান ইউনিসে তার তাবু লক্ষ্য করে চালানো হামলায় নিহত হন।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী উপাসনালয় ও ধর্মীয় নেতাদের ওপর হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল। তবে এত সব প্রতিকূলতার মাঝেও গাজাবাসীর মনোবল ভাঙেনি। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই তারা তাদের ধর্মীয় আচার পালন করে যাচ্ছেন। সাওবিতার মতে, "ফিলিস্তিনিদের ধর্মীয় পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা কখনোই সফল হবে না; ধ্বংসাবশেষ থেকেই নতুন ইমানের আলো বিচ্ছুরিত হবে।"

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত গাজায় ৭২ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

বিষয় : গাজা ফিলিস্তিন

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


গাজায় শোকাতুর রমজান: ৩১২ জন ইমামের শূন্যতা ও ধ্বংসস্তূপে প্রার্থনার আর্তনাদ

প্রকাশের তারিখ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

অবরুদ্ধ গাজা উপখণ্ডে টানা দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি আগ্রাসনে ফিলিস্তিনিদের ধর্মীয় ও সামাজিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। রমজানের পবিত্র আবহে যেখানে মসজিদগুলো মুসল্লিদের কলতানে মুখরিত থাকার কথা, সেখানে আজ বিরাজ করছে শ্মশানের নীরবতা। ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত ৩১২ জন প্রথিতযশা ইমাম ও ধর্মতত্ত্ববিদ নিহত হয়েছেন, যা গাজার মুসলিম সমাজের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক কাঠামোতে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করেছে।

পরিকল্পিত নিধনযজ্ঞ: লক্ষ্য যখন ধর্মীয় নেতৃত্ব

গাজা সরকারের মিডিয়া অফিসের পরিচালক ইসমাইল আল-সাওয়াবিতা এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ইসরায়েল বেছে বেছে গাজার ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতীকগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। তিনি বলেন, "ইসরায়েল সেই সব ব্যক্তিত্বদের হত্যা করেছে যারা সমাজে শান্তি রক্ষা, নৈতিক দিকনির্দেশনা এবং জনগণের মনোবল চাঙ্গা রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।"

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে ৩১২ জন ইমাম, খতিব ও ওয়ায়েজ নিহত হয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ডগুলো কেবল সামরিক অভিযান নয়, বরং একটি জাতির ধর্মীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মুছে ফেলার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মসজিদের ধ্বংসস্তূপে তারাবি

গাজার ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, উপত্যকার মোট ১,২৭৫টি মসজিদের মধ্যে ১,০৫০টি সম্পূর্ণ এবং ১৯১টি আংশিকভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। অর্থাৎ, গাজার প্রায় ৯৭% মসজিদ এখন ব্যবহারের অনুপযোগী। রমজানের এই সময়ে ফিলিস্তিনিরা এখন খোলা আকাশের নিচে, তাবু গেড়ে অথবা ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদের ফাটল ধরা দেওয়ালের মাঝেই নামাজ আদায় করছেন।

ইসমাইল আল-সাওয়াবিতা আরও জানান, শুধু মসজিদ নয়, ইসরায়েলি হামলায় তিনটি গির্জাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ২০ জন খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী নিহত হয়েছেন। ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংসের ফলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০০ কোটি ডলারে। এমনকি গাজার কবরস্থানগুলোও ইসরায়েলি বুলডোজারের হাত থেকে রেহাই পায়নি।

হারানো নক্ষত্র: যাদের শূন্যতা কাটছে না

নিহত ৩১২ জন ইমামের মধ্যে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব ছিলেন যারা আন্তর্জাতিকভাবেও সমাদৃত:

  • শেখ ইউসুফ সালামা: ফিলিস্তিনের সাবেক ওয়াকফ ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী এবং আল-আকসা মসজিদের খতিব। ২০ ডিসেম্বর ২০২৩-এ মাগাজি শরণার্থী শিবিরে নিজ বাড়িতে হামলায় তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
  • ড. ওয়ায়েল আল-জারদ: একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও গাজার আল-ওমারি মসজিদের ইমাম। ১৩ অক্টোবর ২০২৩-এ হামলার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
  • ড. ওয়ালিদ আবিদা: গাজার হাফেজ তৈরির কারিগর এবং হাদিস শাস্ত্রের পণ্ডিত। ১২ নভেম্বর ২০২৪-এ নিজ বাসভবনে সপরিবারে নিহত হন।
  • ড. নায়েল মাসরান: ফিকহ শাস্ত্রের পণ্ডিত ও প্রকৌশলী মাসরান ৩০ মে ২০২৫-এ খান ইউনিসে তার তাবু লক্ষ্য করে চালানো হামলায় নিহত হন।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী উপাসনালয় ও ধর্মীয় নেতাদের ওপর হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল। তবে এত সব প্রতিকূলতার মাঝেও গাজাবাসীর মনোবল ভাঙেনি। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই তারা তাদের ধর্মীয় আচার পালন করে যাচ্ছেন। সাওবিতার মতে, "ফিলিস্তিনিদের ধর্মীয় পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা কখনোই সফল হবে না; ধ্বংসাবশেষ থেকেই নতুন ইমানের আলো বিচ্ছুরিত হবে।"

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত গাজায় ৭২ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মুস্তাইন বিল্লাহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত