বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

জম্মু-কাশ্মীরে ‘গোরক্ষক’ তাণ্ডব: প্রাণ বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নিখোঁজ মুসলিম চালক

জম্মু ও কাশ্মীরের রামবন জেলায় কথিত ‘গোরক্ষক’ নামধারী উগ্রবাদীদের তাণ্ডবে এক মুসলিম চালক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত রবিবার (১২ এপ্রিল) শ্রীনগর-জম্মু জাতীয় মহাসড়কে বৈধভাবে গবাদিপশু পরিবহনকালে উগ্রবাদীদের ধাওয়া ও হামলার মুখে প্রাণ বাঁচাতে বিশলারি নদীতে ঝাঁপ দেন তানভীর আহমেদ চোপান নামের ওই যুবক। ঘটনার পর ২৪ ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও উদ্ধারকারী দল এখনও তার সন্ধান পায়নি।সংশ্লিষ্ট ঘটনায় অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া না গেলেও, স্থানীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো প্রায়শই জম্মু-কাশ্মীর মহাসড়কে গবাদিপশু পরিবহনকে ‘পাচার’ হিসেবে দাবি করে থাকে। তাদের দাবি অনুযায়ী, তারা ‘অবৈধ গবাদিপশু পাচার’ রুখতে মহাসড়কে নজরদারি চালায়। যদিও পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এই দাবির পক্ষে কোনো জোরালো প্রমাণ মেলেনি। সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যে কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ধরনের ‘গোরক্ষক’ গোষ্ঠীগুলো আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে নিজস্ব আদালত পরিচালনা করার চেষ্টা করছে, যা আইন-শৃঙ্খলার জন্য হুমকি।রবিবার বিকেলে উখরাল তহসিলের মুন্দখাল গ্রামের বাসিন্দা তানভীর আহমেদ চোপান জম্মু থেকে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে একটি টাটা মোবাইল গাড়িতে করে একটি দুগ্ধবতী গাভী ও দুটি বাছুর নিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, দিগদোল এলাকায় দুটি গাড়িতে আসা একদল দুর্বৃত্ত তার পিছু নেয়। মকরকোটের কাছে টানেল নং ৫-এর সামনে উগ্রবাদীরা তার গাড়িটি গতিরোধ করে এবং তাকে টেনে-হেঁচড়ে নিচে নামিয়ে মারধর শুরু করে।আঘাত থেকে বাঁচতে তানভীর দৌড়ে নিকটবর্তী বিশলারি নালার (পাহাড়ি নদী) দিকে যান এবং খরস্রোতা নদীতে ঝাঁপ দেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হামলাকারীদের হাত থেকে বাঁচতেই তিনি এই চরম পথ বেছে নেন।বানিহালের বিধায়ক সাজ্জাদ শাহীন নিশ্চিত করেছেন যে, তানভীরের কাছে পশু পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল বৈধ সরকারি অনুমতি ছিল। বর্তমানে এসডিআরএফ, পুলিশ এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা নদীতে তল্লাশি চালাচ্ছে। এনডিআরএফ-এর সহায়তাও চাওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক জনরোষ সৃষ্টি হয়েছে এবং বানিহালে আজ সোমবার ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। পুলিশ এই ঘটনায় একটি এফআইআর দায়ের করেছে এবং চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তদন্তের জন্য এসডিপিও বানিহালের নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্ত দল (SIT) গঠন করা হয়েছে।এই ঘটনাটি ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ (জীবনের অধিকার) এবং ১৯ অনুচ্ছেদের (পেশা ও বাণিজ্যের অধিকার) চরম লঙ্ঘন হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর রিপোর্ট অনুযায়ী, কথিত ‘গোরক্ষক’দের দ্বারা বিচারবহির্ভূত এই ধরনের কর্মকাণ্ড সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র যদি বেসরকারি গোষ্ঠীর সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়, তবে সেই দায়ভার রাষ্ট্রের ওপরই বর্তায়। জম্মু-কাশ্মীরের স্থানীয় নেতারা বলছেন, রামবন জেলায় এটি চতুর্থ অনুরূপ ঘটনা, যা প্রশাসনের নির্লিপ্ততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। নাগরিক সুরক্ষায় প্রশাসনের ব্যর্থতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি উগ্রবাদীদের আরও উৎসাহিত করছে।তানভীর আহমেদের নিখোঁজ হওয়া কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং উগ্রবাদী মানসিকতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। একজন বৈধ নাগরিককে প্রকাশ্য দিবালোকে এভাবে আক্রমণের শিকার হতে হওয়া আইনের শাসনের জন্য লজ্জাজনক। নিখোঁজ যুবকের দ্রুত উদ্ধার, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের বর্বরোচিত হামলা বন্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই কেবল ক্ষুব্ধ জনতার ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারে।

জম্মু-কাশ্মীরে ‘গোরক্ষক’ তাণ্ডব: প্রাণ বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নিখোঁজ মুসলিম চালক