জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগরে অবস্থিত ঐতিহাসিক জামিয়া মসজিদ এবং ঈদগাহ ময়দানে টানা অষ্টম বছরের মতো পবিত্র ঈদের নামাজ আদায়ের অনুমতি দেয়নি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। এই পবিত্র উৎসবের দিনে কাশ্মীরের প্রধান ধর্মীয় নেতা মিরওয়াইজ উমর ফারুককে নিজ বাসভবনে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। প্রশাসনের এমন বিতর্কিত পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অঞ্চলের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।
ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের মুসলিম সম্প্রদায়কে আরও একবার তাদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় জমায়েত থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। প্রশাসনের কড়া বিধিনিষেধের কারণে এ বছরও শ্রীনগরের ঐতিহাসিক ঈদগাহ এবং কেন্দ্রীয় জামিয়া মসজিদে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। অন্যদিকে, শ্রীনগরের বিখ্যাত হযরতবাল দরগাহ শরিফে বুধবার মুসলিম ধর্মপ্রাণ মানুষেরা ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'এক্স' (সাবেক টুইটার)-এ ক্ষোভ প্রকাশ করে কাশ্মীরের প্রধান মৌলভি ও হুররিয়াত নেতা মিরওয়াইজ উমর ফারুক জানান, টানা আট বছর ধরে কাশ্মীরের মুসলমানদের জামিয়া মসজিদে ঈদের নামাজ পড়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
প্রশাসনের সমালোচনা করে মিরওয়াইজ বলেন:
"ঈদের মতো একটি পবিত্র ও আনন্দের দিনে কাশ্মীরের মুসলমানদের ব্যারিকেড, বিধিনিষেধ, তালাবদ্ধ গেট এবং ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে স্বাগত জানানো হয়েছে। এটি কোনো সুশাসন নয়; বরং আমাদের ধর্মীয় পরিচিতি, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকারের ওপর একটি সুপরিকল্পিত আঘাত, যা আমাদের গভীরভাবে আঘাত করে।"
তিনি আরও আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন যে, কাশ্মীরের একটি পুরো প্রজন্ম ঈদগাহের আধ্যাত্মিক পরিবেশ এবং ঈদের আনন্দ ছাড়াই বড় হচ্ছে। শতবছরের ঐতিহ্যবাহী উৎসবের স্মৃতি থেকে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। তবে শক্তির জোরে মানুষের বিশ্বাস ও আত্মিক বন্ধনকে অবদমিত করে রাখা যাবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর নিন্দা
পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির (PDP) প্রধান এবং কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতিও সরকারের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন:
"মিরওয়াইজ জামিয়া মসজিদে ঈদের নামাজ পড়াতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাকে বাধা দেওয়া হয়েছে। এটি এখন একটি নিয়মিত রুটিনে পরিণত হয়েছে এবং তাকে এখনো গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। আমাদের অনেক মানুষ কোনো অপরাধ ছাড়াই বিচারাধীন বন্দি হিসেবে বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে দিন কাটাচ্ছেন।"
মেহবুবা মুফতি আরও উল্লেখ করেন যে, এবারের ঈদ এমন এক সময়ে উদযাপিত হচ্ছে যখন বুদগামে এক নাবালিকা কন্যাকে নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় পুরো কাশ্মীর শোকস্তব্ধ।
সমাজ ব্যবস্থার অবক্ষয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ
অপনি পার্টির (Apni Party) প্রধান আলতাফ বুখারী এক বিবৃতিতে বুদগামের সেই মর্মান্তিক ঘটনার কথা স্মরণ করে বলেন, পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপনের পাশাপাশি সমাজ হিসেবে আমাদের ধর্মীয়, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের পতনের বিষয়ে গভীরভাবে আত্মোপলব্ধি করা জরুরি। বুদগামের হৃদয়বিদারক ঘটনাটি সকলের বিবেককে নাড়া দেওয়া উচিত এবং সামাজিক আচরণ পরিবর্তনের জন্য বাধ্য করা উচিত।
২০১৯ সালে ভারতের সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের পর থেকে উপত্যকাটিতে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সমাবেশের ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। এর আগেও আইন-শৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কায় বিভিন্ন সময় জামিয়া মসজিদে নামাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হতো, যা পরবর্তীতে দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞায় রূপ নেয়।
একটি গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী সমাজে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শান্তি বজায় রাখার জন্য নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন অপরিহার্য। কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি এবং ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি দায়িত্বশীল ও স্থায়ী সমাধান খোঁজা জরুরি।
বিষয় : ভারত জম্মু কাশ্মীর

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ মে ২০২৬
জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগরে অবস্থিত ঐতিহাসিক জামিয়া মসজিদ এবং ঈদগাহ ময়দানে টানা অষ্টম বছরের মতো পবিত্র ঈদের নামাজ আদায়ের অনুমতি দেয়নি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। এই পবিত্র উৎসবের দিনে কাশ্মীরের প্রধান ধর্মীয় নেতা মিরওয়াইজ উমর ফারুককে নিজ বাসভবনে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। প্রশাসনের এমন বিতর্কিত পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অঞ্চলের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।
ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের মুসলিম সম্প্রদায়কে আরও একবার তাদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় জমায়েত থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। প্রশাসনের কড়া বিধিনিষেধের কারণে এ বছরও শ্রীনগরের ঐতিহাসিক ঈদগাহ এবং কেন্দ্রীয় জামিয়া মসজিদে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। অন্যদিকে, শ্রীনগরের বিখ্যাত হযরতবাল দরগাহ শরিফে বুধবার মুসলিম ধর্মপ্রাণ মানুষেরা ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'এক্স' (সাবেক টুইটার)-এ ক্ষোভ প্রকাশ করে কাশ্মীরের প্রধান মৌলভি ও হুররিয়াত নেতা মিরওয়াইজ উমর ফারুক জানান, টানা আট বছর ধরে কাশ্মীরের মুসলমানদের জামিয়া মসজিদে ঈদের নামাজ পড়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
প্রশাসনের সমালোচনা করে মিরওয়াইজ বলেন:
"ঈদের মতো একটি পবিত্র ও আনন্দের দিনে কাশ্মীরের মুসলমানদের ব্যারিকেড, বিধিনিষেধ, তালাবদ্ধ গেট এবং ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে স্বাগত জানানো হয়েছে। এটি কোনো সুশাসন নয়; বরং আমাদের ধর্মীয় পরিচিতি, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকারের ওপর একটি সুপরিকল্পিত আঘাত, যা আমাদের গভীরভাবে আঘাত করে।"
তিনি আরও আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন যে, কাশ্মীরের একটি পুরো প্রজন্ম ঈদগাহের আধ্যাত্মিক পরিবেশ এবং ঈদের আনন্দ ছাড়াই বড় হচ্ছে। শতবছরের ঐতিহ্যবাহী উৎসবের স্মৃতি থেকে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। তবে শক্তির জোরে মানুষের বিশ্বাস ও আত্মিক বন্ধনকে অবদমিত করে রাখা যাবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর নিন্দা
পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির (PDP) প্রধান এবং কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতিও সরকারের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন:
"মিরওয়াইজ জামিয়া মসজিদে ঈদের নামাজ পড়াতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাকে বাধা দেওয়া হয়েছে। এটি এখন একটি নিয়মিত রুটিনে পরিণত হয়েছে এবং তাকে এখনো গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। আমাদের অনেক মানুষ কোনো অপরাধ ছাড়াই বিচারাধীন বন্দি হিসেবে বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে দিন কাটাচ্ছেন।"
মেহবুবা মুফতি আরও উল্লেখ করেন যে, এবারের ঈদ এমন এক সময়ে উদযাপিত হচ্ছে যখন বুদগামে এক নাবালিকা কন্যাকে নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় পুরো কাশ্মীর শোকস্তব্ধ।
সমাজ ব্যবস্থার অবক্ষয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ
অপনি পার্টির (Apni Party) প্রধান আলতাফ বুখারী এক বিবৃতিতে বুদগামের সেই মর্মান্তিক ঘটনার কথা স্মরণ করে বলেন, পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপনের পাশাপাশি সমাজ হিসেবে আমাদের ধর্মীয়, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের পতনের বিষয়ে গভীরভাবে আত্মোপলব্ধি করা জরুরি। বুদগামের হৃদয়বিদারক ঘটনাটি সকলের বিবেককে নাড়া দেওয়া উচিত এবং সামাজিক আচরণ পরিবর্তনের জন্য বাধ্য করা উচিত।
২০১৯ সালে ভারতের সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের পর থেকে উপত্যকাটিতে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সমাবেশের ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। এর আগেও আইন-শৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কায় বিভিন্ন সময় জামিয়া মসজিদে নামাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হতো, যা পরবর্তীতে দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞায় রূপ নেয়।
একটি গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী সমাজে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শান্তি বজায় রাখার জন্য নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন অপরিহার্য। কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি এবং ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি দায়িত্বশীল ও স্থায়ী সমাধান খোঁজা জরুরি।

আপনার মতামত লিখুন