মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬
মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬
কওমী টাইমস

মের২০২৬ সালের এপ্রিলে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলিম, দলিত ও খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করে অন্তত ৬১টি ঘৃণামূলক অপরাধ (Hate Crime) সংঘটিত হয়েছে; যার মধ্যে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং সামাজিক বয়কটের মতো ঘটনা অন্তর্ভুক্ত

ভারতে এক মাসে ৬১টি ঘৃণামূলক অপরাধ: বুলডোজার, বয়কট ও ভোটার তালিকা থেকে নাম কর্তনের খতিয়ান



ভারতে এক মাসে ৬১টি ঘৃণামূলক অপরাধ: বুলডোজার, বয়কট ও ভোটার তালিকা থেকে নাম কর্তনের খতিয়ান

ভারতে গত এপ্রিল মাসে অন্তত ৬১টি চরম সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত বিদ্বেষমূলক অপরাধের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯টি ঘটনা মুসলিম, ১০টি দলিত এবং ২টি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছে। বছরের প্রতিটি মাসের মতো এপ্রিলে সংঘটিত হওয়া এই সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি নিশানা করা হয়েছে সংখ্যালঘু নারী, শিশু এবং প্রবীণদের, যা দেশটির গভীর সামাজিক মেরুকরণকে স্পষ্ট করে তুলেছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ নীতি অনুসরণে ভারতের রাজ্যগুলোর সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও উগ্রবাদী মনোভাবের কারণে গত এপ্রিল মাসটি ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ।

এপ্রিল মাসটি ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। দলটি আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ—উভয় রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। আসামে ক্ষমতা ধরে রাখার পাশাপাশি, স্বাধীনতার পর এই প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গ থেকে তৃণমূল কংগ্রেসকে (TMC) উৎখাত করে জাফরান শিবির সরকার গঠন করে। তবে এই জয়ের পেছনে একটি বিতর্কিত পদক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় ৯০ লক্ষ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, যাদের একটি বড় অংশই মুসলিম। এই গণ-কর্তন নির্বাচনের ফলাফলকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

পাশাপাশি, মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের অধীনে উত্তরপ্রদেশে বিতর্কিত "বুলডোজার নীতি" সচল ছিল এবং প্রতিবেশী রাজ্য উত্তরাখণ্ড আগামী জুলাই থেকে রাজ্য মাদ্রাসা বোর্ড ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

অর্থনৈতিক বয়কট ও গো-রক্ষা

মাসজুড়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কট অব্যাহত ছিল। অবৈধভাবে গরু পরিবহন, বিক্রি বা গোমাংস খাওয়ার অভিযোগে গবাদি পশু ব্যবসায়ীদের ওপর চরম শারীরিক সহিংসতা চালানো হয়। অন্যদিকে, আইওয়্যার রিটেইলার 'লেন্সকার্ট' (Lenskart)-এর একটি পুরোনো অভ্যন্তরীণ নির্দেশিকা প্রকাশ হওয়ার পর উগ্রপন্থীদের রোষানলে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। ওই নির্দেশিকায় কর্মীদের কপালে তিলক বা বিন্দি পরা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, যা নিয়ে বিজেপি নেত্রী নাজিয়া খানসহ উগ্রপন্থীরা লেন্সকার্ট ম্যানেজারের ওপর চড়াও হন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে সাম্প্রদায়িক প্রচারণা চালান।

রওশন খাতুন হত্যাকাণ্ড ও দিল্লির ত্রি নগরের ঘটনা

পবিত্র রমজান মাসে রওশন খাতুন নামের এক নারীকে গাছের সাথে বেঁধে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর আগে তিনি পানি চাইলে তাকে অ্যালকোহল মিশ্রিত মূত্র পান করানো হয়। এপ্রিলে এই মামলার অন্যতম প্রধান আসামি জামিনে মুক্তি পেলে তাকে জনসমক্ষে বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হয়, যা তীব্র নিন্দার ঝড় তোলে।

এদিকে, দিল্লির ত্রি নগরে মুসলিমদের এলাকা ছাড়া করতে স্থানীয় কিছু হিন্দু অধিবাসী এক অদ্ভুত ও উস্কানিমূলক কৌশল অবলম্বন করেন। তারা দলগতভাবে শূকর লালন-পালন শুরু করেন এবং জনসমক্ষে সেগুলোর পূজা করেন। তাদের দাবি, মুসলিমরা ওই এলাকার জনসংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট করছে। নোইডায় এক মুসলিম দম্পতিকে পরিচয়পত্র দেখানোর জন্য হেনস্তা করা হলে, যে হিন্দু নারী এর প্রতিবাদ করেছিলেন, তাকে অনলাইনে গণধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।

টিসিএস মামলা ও মিডিয়া ট্রায়াল

নাশিকের টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (TCS)-এ কর্মরত তফসিলি জাতি/উপজাতির এক হিন্দু নারী তার মুসলিম সহকর্মীদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগ তোলেন। এই মামলায় মানবসম্পদ (HR) কর্মকর্তা নিদা খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আদালত তার আগাম জামিন নাকচ করে এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে মূলধারার গণমাধ্যমগুলো একে কর্মক্ষেত্রের যৌন হয়রানির মামলা হিসেবে না দেখে, সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে নিদা খানের বিরুদ্ধে অনলাইন ট্রায়াল ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করতে শুরু করে।

দলিত ও খ্রিস্টানদের ওপর নিপীড়ন

এপ্রিলে দলিতদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ১০টি অপরাধের ধরণ ছিল বর্ণপ্রথার চরম বহিঃপ্রকাশ। কেরালায় শিক্ষকদের জাতপ্রথার শিকার হয়ে ২২ বছর বয়সী এক দলিত শিক্ষার্থী কলেজ ভবন থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন। গুজরাটে একটি মন্দির উৎসবে দলিতদের নিজস্ব পাত্র ও পানির বাটি সঙ্গে নিয়ে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। মধ্যপ্রদেশে এক শারীরিক প্রতিবন্ধী দলিত বরকে উচ্চবর্ণের পুরুষরা ঘোড়া থেকে টেনে নামিয়ে মারধর করে।

গোয়ায় 'সনাতন মহাসংঘ'-এর প্রতিষ্ঠাতা গৌতম খাট্টার ১৬ শতকের সম্মানিত ক্যাথলিক ধর্মপ্রচারক সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ারকে "সন্ত্রাসী ও নিষ্ঠুর শাসক" বলে কটূক্তি করেন। তার এই বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের কারণে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলে পুলিশ তার বিরুদ্ধে লুকআউট নোটিশ জারি করে।

সামাজিক অবমাননা, উস্কানিমূলক বক্তব্য, অর্থনৈতিক বয়কট এবং শারীরিক সহিংসতা—সব মিলিয়ে এপ্রিল মাসটি ছিল ভারতের সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এক আতঙ্কের নাম।

মানবাধিকার কর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে আইনের শাসন এবং ধর্মনিরপেক্ষ সাংবিধানিক কাঠামোর বিপরীতে গিয়ে যেভাবে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে, তা গভীর উদ্বেগের। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক আশ্রয় প্রদানের সংস্কৃতি বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা হ্রাস করছে। ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ (ধর্ম, জাতি, বর্ণ বা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য বিলোপ) এবং অনুচ্ছেদ ২১ (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষা) অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত কাঠামোগত বৈষম্য ও সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রিপোর্টগুলোতে বারবার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

ভারতে ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধের এই ধারা হঠাৎ শুরু হওয়া কোনো বিষয় নয়। গত কয়েক বছর ধরে গো-রক্ষা, তথাকথিত ধর্মান্তরকরণ বিরোধী আইন এবং উচ্ছেদ অভিযানের নামে ঘরবাড়ি ধ্বংসের (বুলডোজার জাস্টিস) ঘটনা উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও আসামে বিজেপির আধিপত্য ধরে রাখার সমসাময়িক সময়েই ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়ার ঘটনাটি এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী জনমিতিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণেরই অংশ।

একটি গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রে নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রশাসনের প্রাথমিক দায়িত্ব। ঘৃণামূলক অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনার মাধ্যমেই কেবল সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬


ভারতে এক মাসে ৬১টি ঘৃণামূলক অপরাধ: বুলডোজার, বয়কট ও ভোটার তালিকা থেকে নাম কর্তনের খতিয়ান

প্রকাশের তারিখ : ০১ জুন ২০২৬

featured Image

ভারতে গত এপ্রিল মাসে অন্তত ৬১টি চরম সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত বিদ্বেষমূলক অপরাধের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯টি ঘটনা মুসলিম, ১০টি দলিত এবং ২টি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছে। বছরের প্রতিটি মাসের মতো এপ্রিলে সংঘটিত হওয়া এই সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি নিশানা করা হয়েছে সংখ্যালঘু নারী, শিশু এবং প্রবীণদের, যা দেশটির গভীর সামাজিক মেরুকরণকে স্পষ্ট করে তুলেছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ নীতি অনুসরণে ভারতের রাজ্যগুলোর সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও উগ্রবাদী মনোভাবের কারণে গত এপ্রিল মাসটি ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ।

এপ্রিল মাসটি ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। দলটি আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ—উভয় রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। আসামে ক্ষমতা ধরে রাখার পাশাপাশি, স্বাধীনতার পর এই প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গ থেকে তৃণমূল কংগ্রেসকে (TMC) উৎখাত করে জাফরান শিবির সরকার গঠন করে। তবে এই জয়ের পেছনে একটি বিতর্কিত পদক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় ৯০ লক্ষ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, যাদের একটি বড় অংশই মুসলিম। এই গণ-কর্তন নির্বাচনের ফলাফলকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

পাশাপাশি, মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের অধীনে উত্তরপ্রদেশে বিতর্কিত "বুলডোজার নীতি" সচল ছিল এবং প্রতিবেশী রাজ্য উত্তরাখণ্ড আগামী জুলাই থেকে রাজ্য মাদ্রাসা বোর্ড ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

অর্থনৈতিক বয়কট ও গো-রক্ষা

মাসজুড়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কট অব্যাহত ছিল। অবৈধভাবে গরু পরিবহন, বিক্রি বা গোমাংস খাওয়ার অভিযোগে গবাদি পশু ব্যবসায়ীদের ওপর চরম শারীরিক সহিংসতা চালানো হয়। অন্যদিকে, আইওয়্যার রিটেইলার 'লেন্সকার্ট' (Lenskart)-এর একটি পুরোনো অভ্যন্তরীণ নির্দেশিকা প্রকাশ হওয়ার পর উগ্রপন্থীদের রোষানলে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। ওই নির্দেশিকায় কর্মীদের কপালে তিলক বা বিন্দি পরা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, যা নিয়ে বিজেপি নেত্রী নাজিয়া খানসহ উগ্রপন্থীরা লেন্সকার্ট ম্যানেজারের ওপর চড়াও হন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে সাম্প্রদায়িক প্রচারণা চালান।

রওশন খাতুন হত্যাকাণ্ড ও দিল্লির ত্রি নগরের ঘটনা

পবিত্র রমজান মাসে রওশন খাতুন নামের এক নারীকে গাছের সাথে বেঁধে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর আগে তিনি পানি চাইলে তাকে অ্যালকোহল মিশ্রিত মূত্র পান করানো হয়। এপ্রিলে এই মামলার অন্যতম প্রধান আসামি জামিনে মুক্তি পেলে তাকে জনসমক্ষে বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হয়, যা তীব্র নিন্দার ঝড় তোলে।

এদিকে, দিল্লির ত্রি নগরে মুসলিমদের এলাকা ছাড়া করতে স্থানীয় কিছু হিন্দু অধিবাসী এক অদ্ভুত ও উস্কানিমূলক কৌশল অবলম্বন করেন। তারা দলগতভাবে শূকর লালন-পালন শুরু করেন এবং জনসমক্ষে সেগুলোর পূজা করেন। তাদের দাবি, মুসলিমরা ওই এলাকার জনসংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট করছে। নোইডায় এক মুসলিম দম্পতিকে পরিচয়পত্র দেখানোর জন্য হেনস্তা করা হলে, যে হিন্দু নারী এর প্রতিবাদ করেছিলেন, তাকে অনলাইনে গণধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।

টিসিএস মামলা ও মিডিয়া ট্রায়াল

নাশিকের টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (TCS)-এ কর্মরত তফসিলি জাতি/উপজাতির এক হিন্দু নারী তার মুসলিম সহকর্মীদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগ তোলেন। এই মামলায় মানবসম্পদ (HR) কর্মকর্তা নিদা খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আদালত তার আগাম জামিন নাকচ করে এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে মূলধারার গণমাধ্যমগুলো একে কর্মক্ষেত্রের যৌন হয়রানির মামলা হিসেবে না দেখে, সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে নিদা খানের বিরুদ্ধে অনলাইন ট্রায়াল ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করতে শুরু করে।

দলিত ও খ্রিস্টানদের ওপর নিপীড়ন

এপ্রিলে দলিতদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ১০টি অপরাধের ধরণ ছিল বর্ণপ্রথার চরম বহিঃপ্রকাশ। কেরালায় শিক্ষকদের জাতপ্রথার শিকার হয়ে ২২ বছর বয়সী এক দলিত শিক্ষার্থী কলেজ ভবন থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন। গুজরাটে একটি মন্দির উৎসবে দলিতদের নিজস্ব পাত্র ও পানির বাটি সঙ্গে নিয়ে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। মধ্যপ্রদেশে এক শারীরিক প্রতিবন্ধী দলিত বরকে উচ্চবর্ণের পুরুষরা ঘোড়া থেকে টেনে নামিয়ে মারধর করে।

গোয়ায় 'সনাতন মহাসংঘ'-এর প্রতিষ্ঠাতা গৌতম খাট্টার ১৬ শতকের সম্মানিত ক্যাথলিক ধর্মপ্রচারক সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ারকে "সন্ত্রাসী ও নিষ্ঠুর শাসক" বলে কটূক্তি করেন। তার এই বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের কারণে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলে পুলিশ তার বিরুদ্ধে লুকআউট নোটিশ জারি করে।

সামাজিক অবমাননা, উস্কানিমূলক বক্তব্য, অর্থনৈতিক বয়কট এবং শারীরিক সহিংসতা—সব মিলিয়ে এপ্রিল মাসটি ছিল ভারতের সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এক আতঙ্কের নাম।

মানবাধিকার কর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে আইনের শাসন এবং ধর্মনিরপেক্ষ সাংবিধানিক কাঠামোর বিপরীতে গিয়ে যেভাবে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে, তা গভীর উদ্বেগের। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক আশ্রয় প্রদানের সংস্কৃতি বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা হ্রাস করছে। ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ (ধর্ম, জাতি, বর্ণ বা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য বিলোপ) এবং অনুচ্ছেদ ২১ (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষা) অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত কাঠামোগত বৈষম্য ও সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রিপোর্টগুলোতে বারবার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

ভারতে ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধের এই ধারা হঠাৎ শুরু হওয়া কোনো বিষয় নয়। গত কয়েক বছর ধরে গো-রক্ষা, তথাকথিত ধর্মান্তরকরণ বিরোধী আইন এবং উচ্ছেদ অভিযানের নামে ঘরবাড়ি ধ্বংসের (বুলডোজার জাস্টিস) ঘটনা উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও আসামে বিজেপির আধিপত্য ধরে রাখার সমসাময়িক সময়েই ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়ার ঘটনাটি এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী জনমিতিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণেরই অংশ।

একটি গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রে নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রশাসনের প্রাথমিক দায়িত্ব। ঘৃণামূলক অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনার মাধ্যমেই কেবল সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ