ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের পর নতুন করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সোমবার (১ জুন) হুব্বলির বিভিন্ন স্কুলের সামনে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো পাল্টা 'গেরুয়া স্কার্ফ' বা শাল বিতরণ কর্মসূচি শুরু করেছে। কংগ্রেস সরকারের এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে শিক্ষাঙ্গনে ধর্মীয় পোশাক বিতর্ক আবারও রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে।
কর্ণাটকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের পোশাকের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিনের চলমান বিতর্কটি আবার নতুন করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়ার নেতৃত্বাধীন বর্তমান কংগ্রেস সরকার পূর্ববর্তী বিজেপি (BJP) সরকারের জারি করা ২০২২ সালের হিজাব নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত বিতর্কিত আদেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বাদানুবাদ।
সরকারি নতুন নির্দেশনা
গত ১৩ মে কর্ণাটক রাজ্য সরকার একটি নতুন ড্রেস কোড বা পোশাক বিধি সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করে। এই আদেশে বলা হয়েছে, নির্ধারিত স্কুল ইউনিফর্ম বা পোশাকের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা তাদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত প্রতীক ধারণ করতে পারবে। এর মধ্যে হিজাব, পবিত্র সুতা বা পৈতা (জানেউ), শিবধারা, রুদ্রাক্ষের মালা এবং পাগড়ি (টারবান) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
রাজ্য সরকার তাদের এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে জানিয়েছে, এই আদেশের উদ্দেশ্য শিক্ষাঙ্গনে নতুন কোনো ধর্মীয় রীতি চালু করা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধর্মীয় চর্চাকে সম্মান জানিয়ে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।
গেরুয়া স্কার্ফ
সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রী রাম সেনা এবং অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো রাজ্যব্যাপী একযোগে হিজাব বিরোধী আন্দোলন শুরু করেছে। এরই অংশ হিসেবে সোমবার হুব্বলির বেশ কয়েকটি স্কুল প্রাঙ্গণের বাইরে শ্রী রাম সেনার সদস্যরা ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে গেরুয়া রঙের স্কার্ফ ও শাল বিতরণ করে। তাদের দাবি, হিজাব অনুমতি পেলে পাল্টা প্রতীক হিসেবে গেরুয়া স্কার্ফও পরতে দিতে হবে।
এই ঘটনার পর ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) এবং বিভিন্ন ডানপন্থী সংগঠন কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তারা অভিযোগ করেছে যে, কংগ্রেস ভোটব্যাংক নিশ্চিত করতে "তোষণ নীতি"র রাজনীতি করছে। তাদের মতে, স্কুলগুলোতে পুনরায় ধর্মীয় পোশাকের অনুমতি দেওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে বিভাজন ও বৈষম্য তৈরি হবে, যা শিক্ষার পরিবেশকে নষ্ট করবে।
আগামী দিনগুলোতে এই গেরুয়া স্কার্ফ বিতরণ আন্দোলন আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে আন্দোলনকারীরা। এর ফলে কর্ণাটকের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মীয় পোশাকের বিষয়টি আবারও জনসমক্ষে এবং রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
কর্ণাটকে হিজাব বিতর্কটি ভারতের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদের (ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার) সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইতিপূর্বেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব বা নির্দিষ্ট ধর্মীয় পোশাক নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপকে সংখ্যালঘু মেয়েদের শিক্ষার অধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
আইনি বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পোশাকের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য বজায় রাখার যে নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করেছে, তা নাগরিক অধিকারের সুরক্ষায় একটি পদক্ষেপ হলেও এর প্রয়োগ নিয়ে প্রশাসনের কঠোর জবাবদিহিতা থাকা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে বহিরাগত সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক বা ধর্মীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন ঠেকাতে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
২০২২ সালে কর্ণাটকের উদুপি জেলার একটি প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে কয়েকজন মুসলিম ছাত্রীকে হিজাব পরে ক্লাসে বসতে বাধা দেওয়ার পর এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। তৎকালীন বিজেপি সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরা নিষিদ্ধ করে আদেশ জারি করেছিল। বিষয়টি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়, যেখানে বিচারপতিদের বিভক্ত রায়ের পর বিষয়টি একটি বৃহত্তর বেঞ্চে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে এসে সিদ্দারামাইয়া প্রশাসন পূর্ববর্তী আদেশটি পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নিল।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মূলত জ্ঞানার্জন ও সম্প্রীতির জায়গা। কর্ণাটকের এই পোশাক বিতর্ককে কেন্দ্র করে যাতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন ব্যাহত না হয় এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি না ঘটে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে রাজনৈতিক উসকানির ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্বশীল ও সংযত আচরণ করতে হবে।
বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু কর্ণাটক

বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুন ২০২৬
ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের পর নতুন করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সোমবার (১ জুন) হুব্বলির বিভিন্ন স্কুলের সামনে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো পাল্টা 'গেরুয়া স্কার্ফ' বা শাল বিতরণ কর্মসূচি শুরু করেছে। কংগ্রেস সরকারের এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে শিক্ষাঙ্গনে ধর্মীয় পোশাক বিতর্ক আবারও রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে।
কর্ণাটকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের পোশাকের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিনের চলমান বিতর্কটি আবার নতুন করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়ার নেতৃত্বাধীন বর্তমান কংগ্রেস সরকার পূর্ববর্তী বিজেপি (BJP) সরকারের জারি করা ২০২২ সালের হিজাব নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত বিতর্কিত আদেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বাদানুবাদ।
সরকারি নতুন নির্দেশনা
গত ১৩ মে কর্ণাটক রাজ্য সরকার একটি নতুন ড্রেস কোড বা পোশাক বিধি সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করে। এই আদেশে বলা হয়েছে, নির্ধারিত স্কুল ইউনিফর্ম বা পোশাকের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা তাদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত প্রতীক ধারণ করতে পারবে। এর মধ্যে হিজাব, পবিত্র সুতা বা পৈতা (জানেউ), শিবধারা, রুদ্রাক্ষের মালা এবং পাগড়ি (টারবান) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
রাজ্য সরকার তাদের এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে জানিয়েছে, এই আদেশের উদ্দেশ্য শিক্ষাঙ্গনে নতুন কোনো ধর্মীয় রীতি চালু করা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধর্মীয় চর্চাকে সম্মান জানিয়ে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।
গেরুয়া স্কার্ফ
সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রী রাম সেনা এবং অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো রাজ্যব্যাপী একযোগে হিজাব বিরোধী আন্দোলন শুরু করেছে। এরই অংশ হিসেবে সোমবার হুব্বলির বেশ কয়েকটি স্কুল প্রাঙ্গণের বাইরে শ্রী রাম সেনার সদস্যরা ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে গেরুয়া রঙের স্কার্ফ ও শাল বিতরণ করে। তাদের দাবি, হিজাব অনুমতি পেলে পাল্টা প্রতীক হিসেবে গেরুয়া স্কার্ফও পরতে দিতে হবে।
এই ঘটনার পর ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) এবং বিভিন্ন ডানপন্থী সংগঠন কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তারা অভিযোগ করেছে যে, কংগ্রেস ভোটব্যাংক নিশ্চিত করতে "তোষণ নীতি"র রাজনীতি করছে। তাদের মতে, স্কুলগুলোতে পুনরায় ধর্মীয় পোশাকের অনুমতি দেওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে বিভাজন ও বৈষম্য তৈরি হবে, যা শিক্ষার পরিবেশকে নষ্ট করবে।
আগামী দিনগুলোতে এই গেরুয়া স্কার্ফ বিতরণ আন্দোলন আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে আন্দোলনকারীরা। এর ফলে কর্ণাটকের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মীয় পোশাকের বিষয়টি আবারও জনসমক্ষে এবং রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
কর্ণাটকে হিজাব বিতর্কটি ভারতের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদের (ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার) সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইতিপূর্বেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব বা নির্দিষ্ট ধর্মীয় পোশাক নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপকে সংখ্যালঘু মেয়েদের শিক্ষার অধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
আইনি বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পোশাকের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য বজায় রাখার যে নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করেছে, তা নাগরিক অধিকারের সুরক্ষায় একটি পদক্ষেপ হলেও এর প্রয়োগ নিয়ে প্রশাসনের কঠোর জবাবদিহিতা থাকা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে বহিরাগত সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক বা ধর্মীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন ঠেকাতে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
২০২২ সালে কর্ণাটকের উদুপি জেলার একটি প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে কয়েকজন মুসলিম ছাত্রীকে হিজাব পরে ক্লাসে বসতে বাধা দেওয়ার পর এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। তৎকালীন বিজেপি সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরা নিষিদ্ধ করে আদেশ জারি করেছিল। বিষয়টি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়, যেখানে বিচারপতিদের বিভক্ত রায়ের পর বিষয়টি একটি বৃহত্তর বেঞ্চে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে এসে সিদ্দারামাইয়া প্রশাসন পূর্ববর্তী আদেশটি পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নিল।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মূলত জ্ঞানার্জন ও সম্প্রীতির জায়গা। কর্ণাটকের এই পোশাক বিতর্ককে কেন্দ্র করে যাতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন ব্যাহত না হয় এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি না ঘটে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে রাজনৈতিক উসকানির ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্বশীল ও সংযত আচরণ করতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন