ভারতের উত্তর প্রদেশের বারাণসীতে অবস্থিত কাশী (বারাণসী) রেলওয়ে স্টেশন চত্বর থেকে কয়েকশ বছরের পুরোনো একটি মসজিদ এবং ঐতিহাসিক ‘আজগাইব শহীদ মাজার’ উচ্ছেদ করা হয়েছে। জমির মালিকানা সংক্রান্ত দীর্ঘ আইনি বিরোধের পর আদালতের রায়ের ভিত্তিতে গত মঙ্গলবার রাতে এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে স্টেশন এলাকায় থমথমে পরিস্থিতির মাঝে বিপুল পরিমাণ সশস্ত্র পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল।
ভারতের অন্যতম ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক শহর বারাণসীর কাশী রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ ও আজগাইব শহীদ মাজার গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। বুধবার (৩ জুন) প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এই উচ্ছেদের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
মুসলিম পক্ষের দাবি, এই ধর্মীয় স্থাপনাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে বিদ্যমান ছিল এবং ভেঙে ফেলা মসজিদটি ছিল প্রায় কয়েকশ বছরের পুরোনো। তবে জেলা প্রশাসন এবং উত্তর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি— এই জমিটি মূলত ভারতীয় রেলওয়ের পুরোনো সম্পত্তি, যা বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে দখল (এনক্রোচমেন্ট) করে রাখা হয়েছিল।
উচ্ছেদ অভিযানের নেপথ্যে
রেলওয়ে কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শুরু হওয়া ‘কাশী মডেল রেলওয়ে স্টেশন’ উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে একটি বড় ভূমি জরিপ ও পরিমাপের কাজ শুরু হয়। সেই জরিপের সময় ভূমির রেকর্ড এবং নথিপত্র যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, এই মাজার ও মসজিদটি সম্পূর্ণভাবে রেলওয়ের নিজস্ব জায়গার ওপর গড়ে উঠেছে। এরপরই সংশ্লিষ্ট দখলদার ও কমিটিকে জায়গাটি খালি করার জন্য আইনি নোটিশ দেওয়া হয়।
আদালতের রায় ও অভিযান
কর্তৃপক্ষের নোটিশের পর জায়গাটি খালি না করে বিষয়টি আদালতের দ্বারস্থ হয়। দীর্ঘদিন মামলা চলার পর সম্প্রতি ভারতীয় আদালত মাজার ও সমজাতীয় স্থাপনার অধিকার দাবিদারদের বিপক্ষে এবং রেলওয়ের পক্ষে রায় দেন। আদালতের এই চূড়ান্ত রায়ের পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পুনরায় স্থাপনাগুলো সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু সেই নির্দেশ অমান্য করায় গত মঙ্গলবার (২ জুন) গভীর রাতে প্রশাসন বুলডোজার নিয়ে চূড়ান্ত উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে।
প্রশাসন আরও দাবি করেছে যে, অতীতে এই একই এলাকায় একটি হনুমান মন্দিরও ছিল, যা পরবর্তীতে রেলওয়ের জমি অবৈধ দখলের আওতায় পড়ার পর সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
কড়া নিরাপত্তা বলয়
উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি না ঘটে, সেজন্য পুরো বারাণসী স্টেশন ও তার আশপাশের এলাকা সিল করে দেওয়া হয়। সেখানে উত্তর প্রদেশ পুলিশ, প্রাদেশিক সশস্ত্র কনস্ট্যাবুলারি (PAC) এবং রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স (RPF) এর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়। কর্মকর্তাদের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গভীর রাতে এই অপারেশন চালানো হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় কোথাও কোনো অপ্রীতিকর বা সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি।
ভারতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নয়ন প্রকল্প এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নামে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক কাঠামো অপসারণের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রায়শই নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতার প্রশ্নে বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। এই ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনি প্রক্রিয়া ও নোটিশ প্রদানের দাবি করা হলেও, শত বছরের পুরোনো স্থাপনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ধর্মীয় স্বাধীনতার আইনি সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় নাগরিক ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে জবাবদিহিতার প্রশ্ন উঠছে। তবে চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে আদালতের মূল রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি বা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কিনা—তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
২০২৪ সালে কাশী মডেল রেলওয়ে স্টেশন আধুনিকীকরণ প্রকল্প হাতে নেওয়ার পর থেকেই এই অঞ্চলের জমি পুনর্দখল ও জরিপ প্রক্রিয়া শুরু হয়। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে রেলওয়ের মালিকানাধীন জমিতে গড়ে ওঠা ধর্মীয় স্থাপনা অপসারণের ধারাবাহিকতায় এই নতুন ঘটনাটি যুক্ত হলো।
উন্নয়ন ও আইনি বাধ্যবাধকতার প্রয়োজনে স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও, শত বছরের পুরোনো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সুরক্ষায় প্রশাসনকে আরও সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যেন তা সামাজিক সম্প্রীতিকে বিঘ্নিত না করে।
বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬
ভারতের উত্তর প্রদেশের বারাণসীতে অবস্থিত কাশী (বারাণসী) রেলওয়ে স্টেশন চত্বর থেকে কয়েকশ বছরের পুরোনো একটি মসজিদ এবং ঐতিহাসিক ‘আজগাইব শহীদ মাজার’ উচ্ছেদ করা হয়েছে। জমির মালিকানা সংক্রান্ত দীর্ঘ আইনি বিরোধের পর আদালতের রায়ের ভিত্তিতে গত মঙ্গলবার রাতে এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে স্টেশন এলাকায় থমথমে পরিস্থিতির মাঝে বিপুল পরিমাণ সশস্ত্র পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল।
ভারতের অন্যতম ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক শহর বারাণসীর কাশী রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ ও আজগাইব শহীদ মাজার গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। বুধবার (৩ জুন) প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এই উচ্ছেদের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
মুসলিম পক্ষের দাবি, এই ধর্মীয় স্থাপনাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে বিদ্যমান ছিল এবং ভেঙে ফেলা মসজিদটি ছিল প্রায় কয়েকশ বছরের পুরোনো। তবে জেলা প্রশাসন এবং উত্তর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি— এই জমিটি মূলত ভারতীয় রেলওয়ের পুরোনো সম্পত্তি, যা বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে দখল (এনক্রোচমেন্ট) করে রাখা হয়েছিল।
উচ্ছেদ অভিযানের নেপথ্যে
রেলওয়ে কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শুরু হওয়া ‘কাশী মডেল রেলওয়ে স্টেশন’ উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে একটি বড় ভূমি জরিপ ও পরিমাপের কাজ শুরু হয়। সেই জরিপের সময় ভূমির রেকর্ড এবং নথিপত্র যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, এই মাজার ও মসজিদটি সম্পূর্ণভাবে রেলওয়ের নিজস্ব জায়গার ওপর গড়ে উঠেছে। এরপরই সংশ্লিষ্ট দখলদার ও কমিটিকে জায়গাটি খালি করার জন্য আইনি নোটিশ দেওয়া হয়।
আদালতের রায় ও অভিযান
কর্তৃপক্ষের নোটিশের পর জায়গাটি খালি না করে বিষয়টি আদালতের দ্বারস্থ হয়। দীর্ঘদিন মামলা চলার পর সম্প্রতি ভারতীয় আদালত মাজার ও সমজাতীয় স্থাপনার অধিকার দাবিদারদের বিপক্ষে এবং রেলওয়ের পক্ষে রায় দেন। আদালতের এই চূড়ান্ত রায়ের পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পুনরায় স্থাপনাগুলো সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু সেই নির্দেশ অমান্য করায় গত মঙ্গলবার (২ জুন) গভীর রাতে প্রশাসন বুলডোজার নিয়ে চূড়ান্ত উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে।
প্রশাসন আরও দাবি করেছে যে, অতীতে এই একই এলাকায় একটি হনুমান মন্দিরও ছিল, যা পরবর্তীতে রেলওয়ের জমি অবৈধ দখলের আওতায় পড়ার পর সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
কড়া নিরাপত্তা বলয়
উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি না ঘটে, সেজন্য পুরো বারাণসী স্টেশন ও তার আশপাশের এলাকা সিল করে দেওয়া হয়। সেখানে উত্তর প্রদেশ পুলিশ, প্রাদেশিক সশস্ত্র কনস্ট্যাবুলারি (PAC) এবং রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স (RPF) এর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়। কর্মকর্তাদের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গভীর রাতে এই অপারেশন চালানো হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় কোথাও কোনো অপ্রীতিকর বা সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি।
ভারতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নয়ন প্রকল্প এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নামে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক কাঠামো অপসারণের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রায়শই নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতার প্রশ্নে বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। এই ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনি প্রক্রিয়া ও নোটিশ প্রদানের দাবি করা হলেও, শত বছরের পুরোনো স্থাপনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ধর্মীয় স্বাধীনতার আইনি সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় নাগরিক ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে জবাবদিহিতার প্রশ্ন উঠছে। তবে চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে আদালতের মূল রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি বা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কিনা—তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
২০২৪ সালে কাশী মডেল রেলওয়ে স্টেশন আধুনিকীকরণ প্রকল্প হাতে নেওয়ার পর থেকেই এই অঞ্চলের জমি পুনর্দখল ও জরিপ প্রক্রিয়া শুরু হয়। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে রেলওয়ের মালিকানাধীন জমিতে গড়ে ওঠা ধর্মীয় স্থাপনা অপসারণের ধারাবাহিকতায় এই নতুন ঘটনাটি যুক্ত হলো।
উন্নয়ন ও আইনি বাধ্যবাধকতার প্রয়োজনে স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও, শত বছরের পুরোনো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সুরক্ষায় প্রশাসনকে আরও সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যেন তা সামাজিক সম্প্রীতিকে বিঘ্নিত না করে।

আপনার মতামত লিখুন