রোববার, ০৭ জুন ২০২৬
রোববার, ০৭ জুন ২০২৬
কওমী টাইমস

গাজিয়াবাদে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে জুমার নামাজে বাধা দিল উগ্রপন্থীরা! পুলিশের উপস্থিতিতেই চলল উসকানিমূলক স্লোগান

ভারতের গাজিয়াবাদে জুমার নামাজে বাধা দিল হিন্দু রক্ষা দল



ভারতের গাজিয়াবাদে জুমার নামাজে বাধা দিল হিন্দু রক্ষা দল

ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদের ক্ষোদা এলাকায় হিন্দু কিশোর সূর্য প্রতাপ চৌহানের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে জুমার নামাজে বাধা দিয়েছে উগ্র ডানপন্থী সংগঠন হিন্দু রক্ষা দলের (এইচআরডি) একদল কর্মী। গতকাল শুক্রবার (৫ জুন) এলাকার বিভিন্ন মসজিদের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভকারীরা মুসলিম বিরোধী চরমপন্থী স্লোগান দেয়। পুলিশের ব্যাপক নিরাপত্তা ও ফ্ল্যাগ মার্চের মধ্যেই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় তীব্র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বিরাজ করছে।

গাজিয়াবাদের ক্ষোদা এলাকায় ১৭ বছর বয়সী একাদশ শ্রেণীর ছাত্র সূর্য প্রতাপ চৌহান খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ডানপন্থী সংগঠনগুলো এখন মুসলিম সম্প্রদায় ও ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে শুরু করেছে।

নামাজে বাধা ও উগ্র স্লোগান

শুক্রবার জুমার নামাজকে কেন্দ্র করে ক্ষোদা এলাকার মসজিদগুলোর চারপাশে হিন্দু রক্ষা দলের বিপুল সংখ্যক কর্মী সমবেত হয়। তারা মুসলমানদের নামাজ আদায়ে বাধা সৃষ্টি করে এবং উগ্র ও উসকানিমূলক স্লোগান দিতে থাকে। এ সময় হিন্দু মহাসভার সভাপতি রিয়া কিন্নরও বিক্ষোভে যোগ দিয়ে বলেন, "আমরাও নামাজ হতে দেব না। একদিন নামাজ না পড়লে ওদের কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে না।"

এর আগে বৃহস্পতিবার, কালী সেনা উত্তরাখণ্ডের সভাপতি জোশী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি উসকানিমূলক হুমকি দিয়ে বলেন, মুসলিমরা নামাজ পড়া ভুলে যাবে। তিনি আরও ঘোষণা দেন যে, প্রতি মঙ্গলবার দিল্লির মসজিদগুলোর ভেতরে হনুমান চালিসা পাঠ করা হবে।

শুক্রবার জুমার নামাজ নির্বিঘ্ন করতে ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ (ডিসিপি) ধবল জয়সওয়ালের নেতৃত্বে গাজিয়াবাদ পুলিশ ক্ষোদা এলাকার সংবেদনশীল স্থানগুলোতে বিশেষ ফ্ল্যাগ মার্চ পরিচালনা করে। ডিসিপি নিজে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানান। তবে পুলিশের এই সতর্ক অবস্থানের মাঝেই ডানপন্থী সংগঠনগুলো তাদের উসকানিমূলক কর্মসূচি চালিয়ে যায়।

হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও প্রশাসনের অ্যাকশন

গত বকরি ঈদের দিন এক ঝগড়ার জেরে ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হয়েছিল কিশোর সূর্য প্রতাপ চৌহান। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এক প্রতিবেশীর দাবি, আসাদ নামের এক যুবকের বোনকে উত্যক্ত করার জেরে এই বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল। ঘটনার পর পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নেয় এবং প্রধান অভিযুক্ত আসাদ পুলিশের সাথে এক বন্দুকযুদ্ধে (এনকাউন্টার) নিহত হয়। সূর্যের মা অবশ্য আগেই দাবি করেছিলেন যে, তিনি গাজিয়াবাদ পুলিশকে আসাদকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে মেরে ফেলার অনুরোধ করেছিলেন।

এই হত্যাকাণ্ডকে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে আখ্যা দিয়ে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো বিষয়টিকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেয়। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় প্রশাসন ক্ষোদা এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নামে আসাদের পরিবারের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং অন্তত তিনটি মাদ্রাসাকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে। বর্তমানে পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো অপরাধের বিচার দেশের প্রচলিত আইনি কাঠামোর অধীনে হওয়া বাঞ্ছনীয়। মূল অভিযুক্ত পুলিশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে নিহত হওয়া এবং আদালতের চূড়ান্ত রায় ছাড়াই অভিযুক্তের পারিবারিক বাসস্থান বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করার প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে ভারতের নাগরিক অধিকার ও আইনি মহলে জবাবদিহিতার প্রশ্ন উঠেছে। অপরাধীর সাজার পাশাপাশি নিরপরাধ নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

গাজীাবাদের খোদা এলাকাটি মিশ্র জনগোষ্ঠীর কারণে আগে থেকেই সামাজিকভাবে সংবেদনশীল। একটি ব্যক্তিগত বা ফৌজদারি অপরাধকে কেন্দ্র করে কট্টরপন্থী দলগুলোর সম্পৃক্ততা এবং উস্কানিমূলক বক্তব্য পুরো অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।

আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা ধর্মীয় উপাসনায় বাধা সৃষ্টি করা কোনো সুষ্ঠু সমাধান নয়। গাজীাবাদ জেলা প্রশাসন ও পুলিশের তৎপরতা সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখলেও, দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও আইনি শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সব পক্ষের সংযম ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।

বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু ধর্মীয় স্বাধীনতা হত্যাকাণ্ড

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

রোববার, ০৭ জুন ২০২৬


ভারতের গাজিয়াবাদে জুমার নামাজে বাধা দিল হিন্দু রক্ষা দল

প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬

featured Image

ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদের ক্ষোদা এলাকায় হিন্দু কিশোর সূর্য প্রতাপ চৌহানের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে জুমার নামাজে বাধা দিয়েছে উগ্র ডানপন্থী সংগঠন হিন্দু রক্ষা দলের (এইচআরডি) একদল কর্মী। গতকাল শুক্রবার (৫ জুন) এলাকার বিভিন্ন মসজিদের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভকারীরা মুসলিম বিরোধী চরমপন্থী স্লোগান দেয়। পুলিশের ব্যাপক নিরাপত্তা ও ফ্ল্যাগ মার্চের মধ্যেই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় তীব্র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বিরাজ করছে।

গাজিয়াবাদের ক্ষোদা এলাকায় ১৭ বছর বয়সী একাদশ শ্রেণীর ছাত্র সূর্য প্রতাপ চৌহান খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ডানপন্থী সংগঠনগুলো এখন মুসলিম সম্প্রদায় ও ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে শুরু করেছে।

নামাজে বাধা ও উগ্র স্লোগান

শুক্রবার জুমার নামাজকে কেন্দ্র করে ক্ষোদা এলাকার মসজিদগুলোর চারপাশে হিন্দু রক্ষা দলের বিপুল সংখ্যক কর্মী সমবেত হয়। তারা মুসলমানদের নামাজ আদায়ে বাধা সৃষ্টি করে এবং উগ্র ও উসকানিমূলক স্লোগান দিতে থাকে। এ সময় হিন্দু মহাসভার সভাপতি রিয়া কিন্নরও বিক্ষোভে যোগ দিয়ে বলেন, "আমরাও নামাজ হতে দেব না। একদিন নামাজ না পড়লে ওদের কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে না।"

এর আগে বৃহস্পতিবার, কালী সেনা উত্তরাখণ্ডের সভাপতি জোশী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি উসকানিমূলক হুমকি দিয়ে বলেন, মুসলিমরা নামাজ পড়া ভুলে যাবে। তিনি আরও ঘোষণা দেন যে, প্রতি মঙ্গলবার দিল্লির মসজিদগুলোর ভেতরে হনুমান চালিসা পাঠ করা হবে।

শুক্রবার জুমার নামাজ নির্বিঘ্ন করতে ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ (ডিসিপি) ধবল জয়সওয়ালের নেতৃত্বে গাজিয়াবাদ পুলিশ ক্ষোদা এলাকার সংবেদনশীল স্থানগুলোতে বিশেষ ফ্ল্যাগ মার্চ পরিচালনা করে। ডিসিপি নিজে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানান। তবে পুলিশের এই সতর্ক অবস্থানের মাঝেই ডানপন্থী সংগঠনগুলো তাদের উসকানিমূলক কর্মসূচি চালিয়ে যায়।

হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও প্রশাসনের অ্যাকশন

গত বকরি ঈদের দিন এক ঝগড়ার জেরে ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হয়েছিল কিশোর সূর্য প্রতাপ চৌহান। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এক প্রতিবেশীর দাবি, আসাদ নামের এক যুবকের বোনকে উত্যক্ত করার জেরে এই বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল। ঘটনার পর পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নেয় এবং প্রধান অভিযুক্ত আসাদ পুলিশের সাথে এক বন্দুকযুদ্ধে (এনকাউন্টার) নিহত হয়। সূর্যের মা অবশ্য আগেই দাবি করেছিলেন যে, তিনি গাজিয়াবাদ পুলিশকে আসাদকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে মেরে ফেলার অনুরোধ করেছিলেন।

এই হত্যাকাণ্ডকে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে আখ্যা দিয়ে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো বিষয়টিকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেয়। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় প্রশাসন ক্ষোদা এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নামে আসাদের পরিবারের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং অন্তত তিনটি মাদ্রাসাকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে। বর্তমানে পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো অপরাধের বিচার দেশের প্রচলিত আইনি কাঠামোর অধীনে হওয়া বাঞ্ছনীয়। মূল অভিযুক্ত পুলিশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে নিহত হওয়া এবং আদালতের চূড়ান্ত রায় ছাড়াই অভিযুক্তের পারিবারিক বাসস্থান বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করার প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে ভারতের নাগরিক অধিকার ও আইনি মহলে জবাবদিহিতার প্রশ্ন উঠেছে। অপরাধীর সাজার পাশাপাশি নিরপরাধ নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

গাজীাবাদের খোদা এলাকাটি মিশ্র জনগোষ্ঠীর কারণে আগে থেকেই সামাজিকভাবে সংবেদনশীল। একটি ব্যক্তিগত বা ফৌজদারি অপরাধকে কেন্দ্র করে কট্টরপন্থী দলগুলোর সম্পৃক্ততা এবং উস্কানিমূলক বক্তব্য পুরো অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।

আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা ধর্মীয় উপাসনায় বাধা সৃষ্টি করা কোনো সুষ্ঠু সমাধান নয়। গাজীাবাদ জেলা প্রশাসন ও পুলিশের তৎপরতা সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখলেও, দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও আইনি শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সব পক্ষের সংযম ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ