বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
কওমী টাইমস

‘গর্ভ থেকে সন্তান চিরে বের করে হত্যা করব’: ভারতের উত্তরাখণ্ডে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দু রক্ষা দল নেতার উসকানিমূলক হুমকি

ভারতে মুসলিমদের গর্ভ থেকে সন্তান চিরে বের করে হত্যার হুমকি উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতার



ভারতে মুসলিমদের গর্ভ থেকে সন্তান চিরে বের করে হত্যার হুমকি উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতার

ভারতের উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দু রক্ষা দল-এর রাজ্য সভাপতি ললিত শর্মার বিরুদ্ধে মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে উসকানিমূলক ও অমানবিক হুমকি দেওয়ার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। গত সপ্তাহে সেচ সংক্রান্ত এক বিরোধে স্থানীয় এক বিজেপি কর্মী নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেরাদুনের বৈরাগীওয়ালা গ্রামে মুসলিমদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও ব্যাপক সহিংসতা চালায় উগ্রপন্থীরা। এরই মাঝে ললিত শর্মা প্রকাশ্যে এক মুসলিমের বদলে চার মুসলিমকে হত্যা এবং গর্ভস্থ সন্তান চিরে বের করার মতো ভয়াবহ উগ্র মন্তব্য করেন, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

ভারতের উত্তরাখণ্ডে সংখ্যালঘুদের ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের নির্যাতন ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দমন-পীড়ন আকার ধারণ করেছে। দেরাদুনের সহসপুর থানা এলাকার বৈরাগীওয়ালা গ্রামে গত সপ্তাহে সেচ সংক্রান্ত ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে বিনোদ কুমার নামে এক স্থানীয় বিজেপি কর্মী নিহত হন। এই ঘটনাকে পুঁজি করে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো পুরো এলাকায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়েছে। মুসলিমদের লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে পরিকল্পিত দাঙ্গা, পাথর নিক্ষেপ ও অগ্নিসংযোগ।

দাঙ্গাকারীরা প্রধান অভিযুক্ত ইমতিয়াজের বাড়ি ভেঙে ফেলার জন্য বুলডোজার নিয়ে আসার পর সেখানে উপস্থিত হন হিন্দু রক্ষা দলের গাজিয়াবাদ ও উত্তরাখণ্ডের উগ্রপন্থী নেতা ললিত শর্মা। উপস্থিত গণমাধ্যম ও সমর্থকদের সামনে তিনি অত্যন্ত আপত্তিকর এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল বক্তব্য দেন।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে ললিত শর্মাকে বলতে শোনা যায়, "বুলডোজার তৈরি হয়েছে মুসলিমদের জন্য, হিন্দুদের জন্য নয়।" তিনি আরও যোগ করেন, "আমরা ওদের গর্ভ থেকে অনাগত সন্তানদের চিরে বের করে হত্যা করব। উত্তরাখণ্ড পুলিশকে উত্তরপ্রদেশ পুলিশের মতো (এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট) হতে হবে। আমাদের একজন মারা গেলে, আমরা ওদের চারজনকে হত্যা করব। আমরা কাউকে ছাড়ব না।"

একই স্থানে বজরং দলের কর্মী আমান স্ওয়েদিয়া ললিত শর্মার সুরেই উসকানি দিয়ে বলেন, "একটি লাশ আমাদের ঘর থেকে বের হয়েছে, একটি জানাজা ওদের ঘর থেকেও বের হওয়া উচিত। আমরা তো তোমাদের পাকিস্তান দিয়েই দিয়েছিলাম, তখন কেন যাওনি? হিন্দুস্তানে থাকার অনুমতি পেয়েছ বলে কি হিন্দুদেরই হত্যা করা শুরু করবে?" তিনি আরও দাবি করেন, ইসলাম নাকি হিন্দুস্তান দখল করতে চায়।

পুলিশের অ্যাকশন ও মামলা

উসকানিমূলক বক্তব্যের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিলে সহসপুর সার্কেল অফিসার অনুজ কুমার জানান যে, পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ললিত শর্মার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। সাব-ইন্সপেক্টর রাজীব ধারিওয়ালের দায়ের করা এফআইআর-এ বলা হয়েছে, ললিত শর্মা গণমাধ্যম ও জনসাধারণের সামনে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অত্যন্ত উসকানিমূলক, সাম্প্রদায়িক এবং অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। তার বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ১৯৬ (বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা তৈরি), ২৯৯ (ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত), এবং ৩৫৩ (জনগণের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিবৃতি) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

বৈরাগীওয়ালায় তাণ্ডব ও অগ্নিসংযোগ

পুলিশ জানিয়েছে, সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ১০০ থেকে ১৫০ জন অজ্ঞাতপরিচয় দাঙ্গাকারীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং এ পর্যন্ত ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এফআইআর সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ যখন ইমতিয়াজকে গ্রেপ্তার করতে যায়, তখন উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের একটি বিশাল জনতা পুলিশকে ঘিরে ধরে উসকানিমূলক স্লোগান দেয় এবং আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে অভিযুক্তের বাড়িতে হামলা চালায়। দাঙ্গাকারীরা ইমতিয়াজের বাড়ি ভাঙচুর করে, মোটরসাইকেল ও ট্রাক্টরে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুরো এলাকায় এক আতঙ্ক ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

মানবাধিকার কর্মীরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ভারতে অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়া থাকা সত্ত্বেও উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা পুরো মুসলিম সমাজকে টার্গেট করে যে সম্মিলিত শাস্তি এবং উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন।

বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬


ভারতে মুসলিমদের গর্ভ থেকে সন্তান চিরে বের করে হত্যার হুমকি উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতার

প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুন ২০২৬

featured Image

ভারতের উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দু রক্ষা দল-এর রাজ্য সভাপতি ললিত শর্মার বিরুদ্ধে মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে উসকানিমূলক ও অমানবিক হুমকি দেওয়ার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। গত সপ্তাহে সেচ সংক্রান্ত এক বিরোধে স্থানীয় এক বিজেপি কর্মী নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেরাদুনের বৈরাগীওয়ালা গ্রামে মুসলিমদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও ব্যাপক সহিংসতা চালায় উগ্রপন্থীরা। এরই মাঝে ললিত শর্মা প্রকাশ্যে এক মুসলিমের বদলে চার মুসলিমকে হত্যা এবং গর্ভস্থ সন্তান চিরে বের করার মতো ভয়াবহ উগ্র মন্তব্য করেন, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

ভারতের উত্তরাখণ্ডে সংখ্যালঘুদের ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের নির্যাতন ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দমন-পীড়ন আকার ধারণ করেছে। দেরাদুনের সহসপুর থানা এলাকার বৈরাগীওয়ালা গ্রামে গত সপ্তাহে সেচ সংক্রান্ত ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে বিনোদ কুমার নামে এক স্থানীয় বিজেপি কর্মী নিহত হন। এই ঘটনাকে পুঁজি করে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো পুরো এলাকায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়েছে। মুসলিমদের লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে পরিকল্পিত দাঙ্গা, পাথর নিক্ষেপ ও অগ্নিসংযোগ।

দাঙ্গাকারীরা প্রধান অভিযুক্ত ইমতিয়াজের বাড়ি ভেঙে ফেলার জন্য বুলডোজার নিয়ে আসার পর সেখানে উপস্থিত হন হিন্দু রক্ষা দলের গাজিয়াবাদ ও উত্তরাখণ্ডের উগ্রপন্থী নেতা ললিত শর্মা। উপস্থিত গণমাধ্যম ও সমর্থকদের সামনে তিনি অত্যন্ত আপত্তিকর এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল বক্তব্য দেন।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে ললিত শর্মাকে বলতে শোনা যায়, "বুলডোজার তৈরি হয়েছে মুসলিমদের জন্য, হিন্দুদের জন্য নয়।" তিনি আরও যোগ করেন, "আমরা ওদের গর্ভ থেকে অনাগত সন্তানদের চিরে বের করে হত্যা করব। উত্তরাখণ্ড পুলিশকে উত্তরপ্রদেশ পুলিশের মতো (এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট) হতে হবে। আমাদের একজন মারা গেলে, আমরা ওদের চারজনকে হত্যা করব। আমরা কাউকে ছাড়ব না।"

একই স্থানে বজরং দলের কর্মী আমান স্ওয়েদিয়া ললিত শর্মার সুরেই উসকানি দিয়ে বলেন, "একটি লাশ আমাদের ঘর থেকে বের হয়েছে, একটি জানাজা ওদের ঘর থেকেও বের হওয়া উচিত। আমরা তো তোমাদের পাকিস্তান দিয়েই দিয়েছিলাম, তখন কেন যাওনি? হিন্দুস্তানে থাকার অনুমতি পেয়েছ বলে কি হিন্দুদেরই হত্যা করা শুরু করবে?" তিনি আরও দাবি করেন, ইসলাম নাকি হিন্দুস্তান দখল করতে চায়।

পুলিশের অ্যাকশন ও মামলা

উসকানিমূলক বক্তব্যের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিলে সহসপুর সার্কেল অফিসার অনুজ কুমার জানান যে, পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ললিত শর্মার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। সাব-ইন্সপেক্টর রাজীব ধারিওয়ালের দায়ের করা এফআইআর-এ বলা হয়েছে, ললিত শর্মা গণমাধ্যম ও জনসাধারণের সামনে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অত্যন্ত উসকানিমূলক, সাম্প্রদায়িক এবং অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। তার বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ১৯৬ (বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা তৈরি), ২৯৯ (ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত), এবং ৩৫৩ (জনগণের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিবৃতি) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

বৈরাগীওয়ালায় তাণ্ডব ও অগ্নিসংযোগ

পুলিশ জানিয়েছে, সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ১০০ থেকে ১৫০ জন অজ্ঞাতপরিচয় দাঙ্গাকারীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং এ পর্যন্ত ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এফআইআর সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ যখন ইমতিয়াজকে গ্রেপ্তার করতে যায়, তখন উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের একটি বিশাল জনতা পুলিশকে ঘিরে ধরে উসকানিমূলক স্লোগান দেয় এবং আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে অভিযুক্তের বাড়িতে হামলা চালায়। দাঙ্গাকারীরা ইমতিয়াজের বাড়ি ভাঙচুর করে, মোটরসাইকেল ও ট্রাক্টরে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুরো এলাকায় এক আতঙ্ক ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

মানবাধিকার কর্মীরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ভারতে অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়া থাকা সত্ত্বেও উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা পুরো মুসলিম সমাজকে টার্গেট করে যে সম্মিলিত শাস্তি এবং উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ