ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাস আলোচনায় প্রায়শই হাতেগোণা কয়েকজন পুরুষ নেতার নামই উঠে আসে।
ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভাঙতে ভারতের মুসলিম নারীদের লড়াই ছিল বহুমুখী। রাজপরিবারের বেগম থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহিণী, লেখক, সামাজিক কর্মী এবং বীর বীরাঙ্গনারা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা তোয়াক্কা না করে ময়দানে নেমেছিলেন।
১৮৫৭ সালের প্রতিরোধ ও সশস্ত্র সংগ্রাম
১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অযোধ্যা দখল করে নবাব ওয়াজিদ আলী শাহকে নির্বাসনে পাঠালে বেগম হযরত মহল লখনউতে থেকে যান। তিনি তাঁর নাবালক পুত্র বিরজিস কদরকে শাসক ঘোষণা করে নিজে অভিভাবক হিসেবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের থানাভাবনের আসগরী বেগম ১৮৫৭ সালের যুদ্ধে গ্রামীণ নারীদের অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দেন এবং সক্রিয় লড়াইয়ে অংশ নেন।
বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগঠন
বিংশ শতাব্দীতে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে মুসলিম নারীদের যোগদান নতুন মাত্রা পায়। আবাদী বানো বেগম (বি আম্মা) সামাজিক পর্দা প্রথা ও সামাজিক সীমাবদ্ধতা ভেঙে রাজনৈতিক জনসভায় ভাষণ দেন এবং অর্থ সংগ্রহ করেন। তাঁর দুই সন্তান মাওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর ও মাওলানা শওকত আলী (আলী ভ্রাতৃদ্বয়) আন্দোলনের রূপকার হলেও, বি আম্মা ছিলেন তাঁদের অনুপ্রেরণা ও মুসলিম পরিবারগুলোকে জাতীয় রাজনীতিতে টেনে আনার মূল কারিগর।
তাঁর পূত্রবধূ আমজাদী বেগম আন্দোলন পরিচালনায় এবং জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার প্রাথমিক ফান্ড গঠনে নেপথ্যে থেকে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। বিপ্লবী কবি মাওলানা হাসরাত মোহানির স্ত্রী বেগম নিশাতুন্নিসা মোহানি নিজে রাজনৈতিক প্রতিনিধি দলে অংশ নিয়ে ও লেখনীর মাধ্যমে সক্রিয় অবদান রাখেন। এছাড়া, ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পটভূমিতে ভূমিকা রাখা ড. সাইফুদ্দীন কিচলুর স্ত্রী সায়াদাত বানো রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে ও নারীদের সংগঠিত করতে কলম ধরেছিলেন।
সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিরোধ ও দেশভাগ-উত্তর পুনর্গঠন
মহাত্মা গান্ধীর অনুগামী বিবি আমতুস সালাম দেশভাগের সময়ের ভয়ানক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে নিজের জীবন বাজি রেখে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজ করেন। অন্যদিকে, দাঙ্গায় স্বামীকে হারিয়েও বেগম আনিস কিদওয়াই দাঙ্গাগ্রস্ত নারীদের উদ্ধারে আত্মনিয়োগ করেন এবং পরবর্তীতে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে ইতিহাসকে 'আজাদী কি ছাঁও মেঁ' গ্রন্থে নথিভুক্ত করেন।
ইতিহাসের পাতায় মুজাফফরনগরের গুজ্জর নারী হাবিবা কিংবা দিল্লিতে যুদ্ধে প্রাণ দেওয়া নাজনীন, রাহিমী ও আলিয়া বেগমদের নাম আজ প্রায় বিলুপ্ত। কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ বা পদ্ধতির চশমায় নয়, বরং ভারতের স্বাধীনতা গঠনে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও অঞ্চলের অবদানের যে চিত্র, সেখানে এই মুসলিম নারীদের বলিষ্ঠ আত্মত্যাগ পুনরুদ্ধার করা ইতিহাসকে সম্পূর্ণ করার স্বার্থেই অত্যন্ত জরুরি।
বিষয় : ভারত

শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬
ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাস আলোচনায় প্রায়শই হাতেগোণা কয়েকজন পুরুষ নেতার নামই উঠে আসে।
ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভাঙতে ভারতের মুসলিম নারীদের লড়াই ছিল বহুমুখী। রাজপরিবারের বেগম থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহিণী, লেখক, সামাজিক কর্মী এবং বীর বীরাঙ্গনারা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা তোয়াক্কা না করে ময়দানে নেমেছিলেন।
১৮৫৭ সালের প্রতিরোধ ও সশস্ত্র সংগ্রাম
১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অযোধ্যা দখল করে নবাব ওয়াজিদ আলী শাহকে নির্বাসনে পাঠালে বেগম হযরত মহল লখনউতে থেকে যান। তিনি তাঁর নাবালক পুত্র বিরজিস কদরকে শাসক ঘোষণা করে নিজে অভিভাবক হিসেবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের থানাভাবনের আসগরী বেগম ১৮৫৭ সালের যুদ্ধে গ্রামীণ নারীদের অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দেন এবং সক্রিয় লড়াইয়ে অংশ নেন।
বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগঠন
বিংশ শতাব্দীতে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে মুসলিম নারীদের যোগদান নতুন মাত্রা পায়। আবাদী বানো বেগম (বি আম্মা) সামাজিক পর্দা প্রথা ও সামাজিক সীমাবদ্ধতা ভেঙে রাজনৈতিক জনসভায় ভাষণ দেন এবং অর্থ সংগ্রহ করেন। তাঁর দুই সন্তান মাওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর ও মাওলানা শওকত আলী (আলী ভ্রাতৃদ্বয়) আন্দোলনের রূপকার হলেও, বি আম্মা ছিলেন তাঁদের অনুপ্রেরণা ও মুসলিম পরিবারগুলোকে জাতীয় রাজনীতিতে টেনে আনার মূল কারিগর।
তাঁর পূত্রবধূ আমজাদী বেগম আন্দোলন পরিচালনায় এবং জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার প্রাথমিক ফান্ড গঠনে নেপথ্যে থেকে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। বিপ্লবী কবি মাওলানা হাসরাত মোহানির স্ত্রী বেগম নিশাতুন্নিসা মোহানি নিজে রাজনৈতিক প্রতিনিধি দলে অংশ নিয়ে ও লেখনীর মাধ্যমে সক্রিয় অবদান রাখেন। এছাড়া, ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পটভূমিতে ভূমিকা রাখা ড. সাইফুদ্দীন কিচলুর স্ত্রী সায়াদাত বানো রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে ও নারীদের সংগঠিত করতে কলম ধরেছিলেন।
সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিরোধ ও দেশভাগ-উত্তর পুনর্গঠন
মহাত্মা গান্ধীর অনুগামী বিবি আমতুস সালাম দেশভাগের সময়ের ভয়ানক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে নিজের জীবন বাজি রেখে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজ করেন। অন্যদিকে, দাঙ্গায় স্বামীকে হারিয়েও বেগম আনিস কিদওয়াই দাঙ্গাগ্রস্ত নারীদের উদ্ধারে আত্মনিয়োগ করেন এবং পরবর্তীতে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে ইতিহাসকে 'আজাদী কি ছাঁও মেঁ' গ্রন্থে নথিভুক্ত করেন।
ইতিহাসের পাতায় মুজাফফরনগরের গুজ্জর নারী হাবিবা কিংবা দিল্লিতে যুদ্ধে প্রাণ দেওয়া নাজনীন, রাহিমী ও আলিয়া বেগমদের নাম আজ প্রায় বিলুপ্ত। কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ বা পদ্ধতির চশমায় নয়, বরং ভারতের স্বাধীনতা গঠনে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও অঞ্চলের অবদানের যে চিত্র, সেখানে এই মুসলিম নারীদের বলিষ্ঠ আত্মত্যাগ পুনরুদ্ধার করা ইতিহাসকে সম্পূর্ণ করার স্বার্থেই অত্যন্ত জরুরি।

আপনার মতামত লিখুন