মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কওমী টাইমস

অনলাইন সাইবার বুলিংয়ের জবাবে সংবাদকক্ষে ভিএইচপি নেতাদের হাতে ত্রিশূল গ্রহণ ও চরমপন্থী অঙ্গভঙ্গি— গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা ও সাংবাদিকতার নৈতিকতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র উদ্বেগ।

গুজরাটি নিউজ চ্যানেলে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের 'ত্রিশূল দীক্ষা': গলা কাটার অঙ্গভঙ্গিতে তোলপাড়


কওমী টাইমস ডেস্ক
কওমী টাইমস ডেস্ক
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গুজরাটি নিউজ চ্যানেলে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের 'ত্রিশূল দীক্ষা': গলা কাটার অঙ্গভঙ্গিতে তোলপাড়

ভারতের গুজরাত রাজ্যে একটি স্থানীয় সংবাদ চ্যানেলের নিউজরুমে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) নেতাদের কাছ থেকে নারী সংবাদ পাঠিকাদের ত্রিশূল গ্রহণ এবং ক্যামেরার সামনে গলা কাটার অঙ্গভঙ্গি করার এক বিতর্কিত ঘটনা সামনে এসেছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত এই ভিডিওটি ঘিরে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা ও হিন্দুত্ববাদী উগ্রতার অনুপ্রবেশ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। ঘটনাটির তীব্র সমালোচনা সত্ত্বেও চ্যানেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও প্রধান সম্পাদক এটিকে আক্রমণাক্রান্ত এক নারী সাংবাদিকের প্রতি ‘সংহতির প্রতীকী প্রকাশ’ বলে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন।

ভারতের অন্যতম বিতর্কিত রাজ্য গুজরাতে সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষতা এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের প্রকাশ্য অনুপ্রবেশ নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। রাজ্যভিত্তিক স্থানীয় স্যাটেলাইট ও ডিজিটাল চ্যানেল 'প্রদেশ ২৪ গুজরাটি' (Pradesh 24 Gujarati)-র নিউজরুমে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) প্রবীণ নেতারা সরাসরি প্রবেশ করে নারী সাংবাদিকদের হাতে 'ত্রিশূল' তুলে দেওয়ার মতো চরমপন্থী কর্মসূচির আয়োজন করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিওতে দেখা যায়, ভিএইচপি নেতা জ্বলিত মেহতা সংবাদ চ্যানেলের ভেতরে ঢুকে নারী অ্যাঙ্করদের হাতে ধর্মীয় প্রতীক সম্বলিত ত্রিশূল তুলে দিচ্ছেন। এটি মূলত হিন্দুত্ববাদী সংগঠনটির বিতর্কিত 'ত্রিশূল দীক্ষা' প্রকল্পেরই অংশ। ত্রিশূল হাতে নেওয়ার পর উক্ত নারী সংবাদ পাঠিকারা সামাজিক মাধ্যমের রিলস ও লাইভ ভিডিওতে উগ্র ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকসহ গলা কাটার ভয়াবহ অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করেন, যা সাধারণ দর্শক ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকদের মধ্যে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

গণমাধ্যমকে বলা হয়ে থাকে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ, যার মূল নীতি হলো নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতা। কিন্তু একটি দায়িত্বশীল সংবাদ মাধ্যম নিজেদের অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্মীয় উসকানি ও সহিংসতার প্রতীকী অঙ্গভঙ্গি প্রচার করায় সাংবাদিকতার নূন্যতম নৈতিকতা ভঙ্গ হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

চ্যানেল সিইও ও সম্পাদকের বক্তব্য

ব্যাপক সমালোচনার মুখে ‘প্রদেশ ২৪ গুজরাটি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং প্রধান সম্পাদক রাহুল সিং ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বিতর্কিত পদক্ষেপটির পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। নিজের সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় রাহুল সিং দাবি করেন, এটি ছিল মূলত সাইবার আক্রমণের শিকার এক নারী সাংবাদিকের প্রতি ‘সংহতির প্রকাশ’।

তিনি জানান, বিতর্কিত ও সাজাপ্রাপ্ত কথিত ধর্মগুরু রামপাল সিং জাটিন (সন্ত রামপাল জি মহারাজ)-কে নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করার পর তাদের চ্যানেলের ২০ বছর বয়সী নারী অ্যাঙ্কর পিয়া গাধভি চরম সাইবার বুলিং ও হুমকির শিকার হন।

রাহুল সিং তার পোস্টে লেখেন, 'রামপালকে নিয়ে সত্য রিপোর্ট করায় পিয়া গাধভির ওপর সুপরিকল্পিতভাবে অনলাইন হামলা চালানো হয়। তাকে হাজার হাজার গালিগালাজযুক্ত ফোন কল করা হয়, এমনকি এক অপরাধী এআই (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে তার আপত্তিকর ছবি তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেয়।'

ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সিইও আরও যোগ করেন, 'গুজরাতে কোনো নারীর সম্মান নিয়ে আপস করা হবে না। গুজরাটের নারীরা নিজেদের রক্ষা করতে জানে। ভয়ভীতি, সাইবার নির্যাতন ও হুমকির বিরুদ্ধে আমাদের নিউজ রুম সর্বদা তাদের পাশে থাকবে।'

সংখ্যালঘু ও মানবাধিকার কোণ থেকে উদ্বেগ

সম্পাদকের এই ব্যাখ্যার পরও চরমপন্থী হিন্দুত্ববাদী একটি সংগঠনের সাহায্য নিয়ে সংবাদকক্ষে অস্ত্রের মহড়া ও সহিংস অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শনকে স্বাভাবিকভাবে দেখছেন না মানবাধিকার কর্মীরা। ভারতে বিশেষ করে গুজরাতে মুসলিম ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা হিন্দুত্ববাদী উগ্রতার প্রেক্ষাপটে, সংবাদমাধ্যমের এই রূপ ভারতের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সুরক্ষাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এক নারী সাংবাদিককে সুরক্ষার নামে সরাসরি হিন্দুত্ববাদী অ্যাজেন্ডা ও সহিংসতার অঙ্গভঙ্গি নিউজরুমে স্থান দেওয়াকে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার চরম অবক্ষয় হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু ত্রিশূল

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬


গুজরাটি নিউজ চ্যানেলে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের 'ত্রিশূল দীক্ষা': গলা কাটার অঙ্গভঙ্গিতে তোলপাড়

প্রকাশের তারিখ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

ভারতের গুজরাত রাজ্যে একটি স্থানীয় সংবাদ চ্যানেলের নিউজরুমে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) নেতাদের কাছ থেকে নারী সংবাদ পাঠিকাদের ত্রিশূল গ্রহণ এবং ক্যামেরার সামনে গলা কাটার অঙ্গভঙ্গি করার এক বিতর্কিত ঘটনা সামনে এসেছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত এই ভিডিওটি ঘিরে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা ও হিন্দুত্ববাদী উগ্রতার অনুপ্রবেশ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। ঘটনাটির তীব্র সমালোচনা সত্ত্বেও চ্যানেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও প্রধান সম্পাদক এটিকে আক্রমণাক্রান্ত এক নারী সাংবাদিকের প্রতি ‘সংহতির প্রতীকী প্রকাশ’ বলে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন।

ভারতের অন্যতম বিতর্কিত রাজ্য গুজরাতে সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষতা এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের প্রকাশ্য অনুপ্রবেশ নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। রাজ্যভিত্তিক স্থানীয় স্যাটেলাইট ও ডিজিটাল চ্যানেল 'প্রদেশ ২৪ গুজরাটি' (Pradesh 24 Gujarati)-র নিউজরুমে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) প্রবীণ নেতারা সরাসরি প্রবেশ করে নারী সাংবাদিকদের হাতে 'ত্রিশূল' তুলে দেওয়ার মতো চরমপন্থী কর্মসূচির আয়োজন করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিওতে দেখা যায়, ভিএইচপি নেতা জ্বলিত মেহতা সংবাদ চ্যানেলের ভেতরে ঢুকে নারী অ্যাঙ্করদের হাতে ধর্মীয় প্রতীক সম্বলিত ত্রিশূল তুলে দিচ্ছেন। এটি মূলত হিন্দুত্ববাদী সংগঠনটির বিতর্কিত 'ত্রিশূল দীক্ষা' প্রকল্পেরই অংশ। ত্রিশূল হাতে নেওয়ার পর উক্ত নারী সংবাদ পাঠিকারা সামাজিক মাধ্যমের রিলস ও লাইভ ভিডিওতে উগ্র ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকসহ গলা কাটার ভয়াবহ অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করেন, যা সাধারণ দর্শক ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকদের মধ্যে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

গণমাধ্যমকে বলা হয়ে থাকে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ, যার মূল নীতি হলো নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতা। কিন্তু একটি দায়িত্বশীল সংবাদ মাধ্যম নিজেদের অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্মীয় উসকানি ও সহিংসতার প্রতীকী অঙ্গভঙ্গি প্রচার করায় সাংবাদিকতার নূন্যতম নৈতিকতা ভঙ্গ হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

চ্যানেল সিইও ও সম্পাদকের বক্তব্য

ব্যাপক সমালোচনার মুখে ‘প্রদেশ ২৪ গুজরাটি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং প্রধান সম্পাদক রাহুল সিং ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বিতর্কিত পদক্ষেপটির পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। নিজের সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় রাহুল সিং দাবি করেন, এটি ছিল মূলত সাইবার আক্রমণের শিকার এক নারী সাংবাদিকের প্রতি ‘সংহতির প্রকাশ’।

তিনি জানান, বিতর্কিত ও সাজাপ্রাপ্ত কথিত ধর্মগুরু রামপাল সিং জাটিন (সন্ত রামপাল জি মহারাজ)-কে নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করার পর তাদের চ্যানেলের ২০ বছর বয়সী নারী অ্যাঙ্কর পিয়া গাধভি চরম সাইবার বুলিং ও হুমকির শিকার হন।

রাহুল সিং তার পোস্টে লেখেন, 'রামপালকে নিয়ে সত্য রিপোর্ট করায় পিয়া গাধভির ওপর সুপরিকল্পিতভাবে অনলাইন হামলা চালানো হয়। তাকে হাজার হাজার গালিগালাজযুক্ত ফোন কল করা হয়, এমনকি এক অপরাধী এআই (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে তার আপত্তিকর ছবি তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেয়।'

ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সিইও আরও যোগ করেন, 'গুজরাতে কোনো নারীর সম্মান নিয়ে আপস করা হবে না। গুজরাটের নারীরা নিজেদের রক্ষা করতে জানে। ভয়ভীতি, সাইবার নির্যাতন ও হুমকির বিরুদ্ধে আমাদের নিউজ রুম সর্বদা তাদের পাশে থাকবে।'

সংখ্যালঘু ও মানবাধিকার কোণ থেকে উদ্বেগ

সম্পাদকের এই ব্যাখ্যার পরও চরমপন্থী হিন্দুত্ববাদী একটি সংগঠনের সাহায্য নিয়ে সংবাদকক্ষে অস্ত্রের মহড়া ও সহিংস অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শনকে স্বাভাবিকভাবে দেখছেন না মানবাধিকার কর্মীরা। ভারতে বিশেষ করে গুজরাতে মুসলিম ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা হিন্দুত্ববাদী উগ্রতার প্রেক্ষাপটে, সংবাদমাধ্যমের এই রূপ ভারতের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সুরক্ষাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এক নারী সাংবাদিককে সুরক্ষার নামে সরাসরি হিন্দুত্ববাদী অ্যাজেন্ডা ও সহিংসতার অঙ্গভঙ্গি নিউজরুমে স্থান দেওয়াকে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার চরম অবক্ষয় হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ