সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
কওমী টাইমস

ইসরায়েলি গণহত্যা ও বর্বরতায় স্বজনহারা গাজার শিশুরা তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলল ধ্বংসস্তূপ, ক্ষুধা ও ভিটেমাটিতে ফেরার স্বপ্ন।

ক্যানভাসে গাজার শিশুদের কান্না ও স্বপ্নের ছবি: খান ইউনিসে বিশেষ চিত্রপ্রদর্শনী



ক্যানভাসে গাজার শিশুদের কান্না ও স্বপ্নের ছবি: খান ইউনিসে বিশেষ চিত্রপ্রদর্শনী

ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর অব্যাহত সামরিক হামলা ও গণহত্যার শিকার গাজা উপত্যকার শিশুরা তাদের জীবনজুড়ে নেমে আসা ভয়াবহ ট্রমা ও ক্ষতের বিবরণ ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছে। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের মাওয়াসি এলাকায় অবস্থিত ‘আল-আরদ এত-তাইয়্যিবাহ’ শরণার্থী শিবিরে “যন্ত্রণা ও আশা... বাস্তব ও স্বপ্ন” শীর্ষক একটি চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসনে স্বজন হারানো ও বাস্তুচ্যুত শিশুরা রঙের তুলিতে তাদের চোখ দিয়ে দেখা গাজার করুণ চিত্র তুলে ধরেছে।

গাজার দক্ষিণ এলাকার মাওয়াসি শরণার্থী শিবিরে আয়োজিত চিত্রপ্রদর্শনীটিতে বাস্তবতাবাদী ও বিমূর্ত শিল্পের এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে। আলো, ছায়া এবং মানব আকৃতির সুনিপুণ ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুদের আঁকা চিত্রকর্মগুলোকে চারটি মূল ভাবধারায় বিন্যস্ত করা হয়েছে—যন্ত্রণা, আশা, বাস্তবতা এবং স্বপ্ন। ক্যানভাসের প্রতিটি আঁচড়ে ফুটে উঠেছে বোমার আঘাতে ধসে পড়া বাড়িঘর, তীব্র পানীয় জলের সংকট, অনাহার, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির যন্ত্রণা এবং প্রিয়জনদের হারানোর হাহাকার।

ক্যানভাসেই শিশুদের জীবনের "ভাষা"

প্রদর্শনীর সমন্বয়ক ও ইংরেজি শিক্ষক উইসাম খালেফ জানান, ইসরায়েলি বাহিনীর নারকীয় তাণ্ডবে শিশুরা যে অবর্ণনীয় ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা যেন নিরাপদে ও মুক্তভাবে প্রকাশ করতে পারে—সেই উদ্দেশ্য নিয়েই এই প্রকল্পের সূচনা। প্রদর্শনীর মূল বার্তাটি অত্যন্ত স্পষ্ট: "জলপাই ও তুলসী গাছ যতক্ষণ টিকে থাকবে, ফিলিস্তিনও তত দিন অস্তিত্বশীল থাকবে।" এর মাধ্যমে শিশুদের মননে ফিলিস্তিনি আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার ও প্রতিরোধের চেতনা জাগিয়ে রাখার লক্ষ্য ব্যক্ত করেন তিনি।

খালেফ জানান, শিশুদের ছবি আঁকার আগে রঙ, আলো ছায়ার মেলবন্ধন এবং ক্যানভাসে তা ফুটিয়ে তোলার মৌলিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর পর শিশুরা নিজেদের চোখে দেখা কিংবা প্রত্যক্ষ করা নির্মম অভিজ্ঞতাগুলো একে একে এঁকে ফেলে। শিশুদের আাঁকা ছবিতে ত্রাণের দীর্ঘ লাইন, এক বস্তা আটার জন্য হাহাকার, উদ্বাস্তু জীবনের দীর্ঘ পথচলা, ধ্বংসস্তূপ ও প্রাণহানির নির্মম সত্য ফুটে উঠেছে। তবে সেই সাথে ফুটে উঠেছে তাদের অপূর্ণ স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার তীব্র আকুতি।

ক্যানভাস যেন মানসিক প্রশান্তির শেষ আশ্রয়

প্রদর্শনীতে ১৫টি চিত্রকর্ম নিয়ে অংশ নিয়েছে ফিলিস্তিনি ছাত্রী আসমা আল-হুমস। ক্যানভাসে সে ফুটিয়ে তুলেছে বাধ্য হয়ে বারবার ঘরবাড়ি ছাড়ার যন্ত্রণা, তাবুজীবনের চরম সংগ্রাম এবং চোখের সামনে ঘটা ধ্বংসলীলা। আসমার কথায়, এই ক্যানভাস ও রঙ তার জন্য একটি 'নিরাপদ আশ্রয়', যার মাধ্যমে সে যুদ্ধের বীভৎসতায় জমে থাকা নিজের ভেতরের ক্ষোভ, ভয় ও মানসিক যন্ত্রাণা বাইরে বের করে আনতে পারছে।

ধ্বংসস্তূপ আর ভিটেমাটিতে ফেরার আকুল আকুতি

সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী সেদিল আবু জালাল তার ১০ বছর বয়সী ছোট ভাইয়ের প্রত্যক্ষ করা একটি নির্মম ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে একটি ছবি এঁকেছে, যেখানে ফুটে উঠেছে ক্ষুধা আর ত্রাণের লাইনে থাকা মানুষের অসহায়ত্ব। সেদিল জানায়, এই প্রদর্শনী গাজার শিশুদের ওপর চেপে বসা নেতিবাচক মানসিক চাপকে শিল্পের মাধ্যমে ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করছে। সেদিল তার আঁকা ছবিগুলোতে যেসব স্থানান্তরের দৃশ্য একেছে, তা অন্যের কাছে শোনা গল্প নয়, বরং নিজের জীবনের করুণ অভিজ্ঞতা।

রাফাহর নিজের বাড়ি ছেড়ে আসার স্মৃতি মনে করে সেদিল জানায়, পরিবার নিয়ে বাধ্য হয়ে পালিয়ে আসার সময়ও তার হৃদয়ে আবার নিজ ভিটেমাটিতে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু মাসের পর মাস পেরিয়ে যখন সে নিজের পাড়ায় ফেরে, তখন তার ঘরবাড়ি বলতে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না—পুরো এলাকাটি পরিণত হয়েছিল কেবলই একখণ্ড ধ্বংসস্তূপে।

২১,৫০০ শিশু হত্যা ও ৫৮ হাজার পিতা-মাতাহীন এতিম শিশু

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক তহবিল (ইউনিসেফ)-এর তথ্যানুযায়ী, গাজার ২১ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ১৯ লাখ মানুষই ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত হামলা, ধ্বংসযজ্ঞ এবং জোরপূর্বক এলাকা খালি করার নির্দেশের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এই গণহত্যার সবচেয়ে করুণ শিকার গাজার নিষ্পাপ শিশুরা।

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ২১,৫০০ ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। ইউনিসেফের হিসাবে, গাজায় ৫৮,০০০-এরও বেশি শিশু তাদের পিতামাতার যেকোনো একজনকে বা উভয়কে হারিয়ে এতিম হয়েছে।

এ ছাড়া গাজার প্রায় ৮২ শতাংশ পরিবার নিরাপদ পানীয় জলের সুযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবার দৈনিক মাথাপিছু ৬ লিটার পানিও পাচ্ছে না। ইসরায়েলি হামলায় গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিষয় : গাজা

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬


ক্যানভাসে গাজার শিশুদের কান্না ও স্বপ্নের ছবি: খান ইউনিসে বিশেষ চিত্রপ্রদর্শনী

প্রকাশের তারিখ : ১৭ আগস্ট ২০২৬

featured Image

ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর অব্যাহত সামরিক হামলা ও গণহত্যার শিকার গাজা উপত্যকার শিশুরা তাদের জীবনজুড়ে নেমে আসা ভয়াবহ ট্রমা ও ক্ষতের বিবরণ ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছে। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের মাওয়াসি এলাকায় অবস্থিত ‘আল-আরদ এত-তাইয়্যিবাহ’ শরণার্থী শিবিরে “যন্ত্রণা ও আশা... বাস্তব ও স্বপ্ন” শীর্ষক একটি চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসনে স্বজন হারানো ও বাস্তুচ্যুত শিশুরা রঙের তুলিতে তাদের চোখ দিয়ে দেখা গাজার করুণ চিত্র তুলে ধরেছে।

গাজার দক্ষিণ এলাকার মাওয়াসি শরণার্থী শিবিরে আয়োজিত চিত্রপ্রদর্শনীটিতে বাস্তবতাবাদী ও বিমূর্ত শিল্পের এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে। আলো, ছায়া এবং মানব আকৃতির সুনিপুণ ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুদের আঁকা চিত্রকর্মগুলোকে চারটি মূল ভাবধারায় বিন্যস্ত করা হয়েছে—যন্ত্রণা, আশা, বাস্তবতা এবং স্বপ্ন। ক্যানভাসের প্রতিটি আঁচড়ে ফুটে উঠেছে বোমার আঘাতে ধসে পড়া বাড়িঘর, তীব্র পানীয় জলের সংকট, অনাহার, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির যন্ত্রণা এবং প্রিয়জনদের হারানোর হাহাকার।

ক্যানভাসেই শিশুদের জীবনের "ভাষা"

প্রদর্শনীর সমন্বয়ক ও ইংরেজি শিক্ষক উইসাম খালেফ জানান, ইসরায়েলি বাহিনীর নারকীয় তাণ্ডবে শিশুরা যে অবর্ণনীয় ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা যেন নিরাপদে ও মুক্তভাবে প্রকাশ করতে পারে—সেই উদ্দেশ্য নিয়েই এই প্রকল্পের সূচনা। প্রদর্শনীর মূল বার্তাটি অত্যন্ত স্পষ্ট: "জলপাই ও তুলসী গাছ যতক্ষণ টিকে থাকবে, ফিলিস্তিনও তত দিন অস্তিত্বশীল থাকবে।" এর মাধ্যমে শিশুদের মননে ফিলিস্তিনি আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার ও প্রতিরোধের চেতনা জাগিয়ে রাখার লক্ষ্য ব্যক্ত করেন তিনি।

খালেফ জানান, শিশুদের ছবি আঁকার আগে রঙ, আলো ছায়ার মেলবন্ধন এবং ক্যানভাসে তা ফুটিয়ে তোলার মৌলিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর পর শিশুরা নিজেদের চোখে দেখা কিংবা প্রত্যক্ষ করা নির্মম অভিজ্ঞতাগুলো একে একে এঁকে ফেলে। শিশুদের আাঁকা ছবিতে ত্রাণের দীর্ঘ লাইন, এক বস্তা আটার জন্য হাহাকার, উদ্বাস্তু জীবনের দীর্ঘ পথচলা, ধ্বংসস্তূপ ও প্রাণহানির নির্মম সত্য ফুটে উঠেছে। তবে সেই সাথে ফুটে উঠেছে তাদের অপূর্ণ স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার তীব্র আকুতি।

ক্যানভাস যেন মানসিক প্রশান্তির শেষ আশ্রয়

প্রদর্শনীতে ১৫টি চিত্রকর্ম নিয়ে অংশ নিয়েছে ফিলিস্তিনি ছাত্রী আসমা আল-হুমস। ক্যানভাসে সে ফুটিয়ে তুলেছে বাধ্য হয়ে বারবার ঘরবাড়ি ছাড়ার যন্ত্রণা, তাবুজীবনের চরম সংগ্রাম এবং চোখের সামনে ঘটা ধ্বংসলীলা। আসমার কথায়, এই ক্যানভাস ও রঙ তার জন্য একটি 'নিরাপদ আশ্রয়', যার মাধ্যমে সে যুদ্ধের বীভৎসতায় জমে থাকা নিজের ভেতরের ক্ষোভ, ভয় ও মানসিক যন্ত্রাণা বাইরে বের করে আনতে পারছে।

ধ্বংসস্তূপ আর ভিটেমাটিতে ফেরার আকুল আকুতি

সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী সেদিল আবু জালাল তার ১০ বছর বয়সী ছোট ভাইয়ের প্রত্যক্ষ করা একটি নির্মম ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে একটি ছবি এঁকেছে, যেখানে ফুটে উঠেছে ক্ষুধা আর ত্রাণের লাইনে থাকা মানুষের অসহায়ত্ব। সেদিল জানায়, এই প্রদর্শনী গাজার শিশুদের ওপর চেপে বসা নেতিবাচক মানসিক চাপকে শিল্পের মাধ্যমে ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করছে। সেদিল তার আঁকা ছবিগুলোতে যেসব স্থানান্তরের দৃশ্য একেছে, তা অন্যের কাছে শোনা গল্প নয়, বরং নিজের জীবনের করুণ অভিজ্ঞতা।

রাফাহর নিজের বাড়ি ছেড়ে আসার স্মৃতি মনে করে সেদিল জানায়, পরিবার নিয়ে বাধ্য হয়ে পালিয়ে আসার সময়ও তার হৃদয়ে আবার নিজ ভিটেমাটিতে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু মাসের পর মাস পেরিয়ে যখন সে নিজের পাড়ায় ফেরে, তখন তার ঘরবাড়ি বলতে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না—পুরো এলাকাটি পরিণত হয়েছিল কেবলই একখণ্ড ধ্বংসস্তূপে।

২১,৫০০ শিশু হত্যা ও ৫৮ হাজার পিতা-মাতাহীন এতিম শিশু

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক তহবিল (ইউনিসেফ)-এর তথ্যানুযায়ী, গাজার ২১ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ১৯ লাখ মানুষই ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত হামলা, ধ্বংসযজ্ঞ এবং জোরপূর্বক এলাকা খালি করার নির্দেশের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এই গণহত্যার সবচেয়ে করুণ শিকার গাজার নিষ্পাপ শিশুরা।

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ২১,৫০০ ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। ইউনিসেফের হিসাবে, গাজায় ৫৮,০০০-এরও বেশি শিশু তাদের পিতামাতার যেকোনো একজনকে বা উভয়কে হারিয়ে এতিম হয়েছে।

এ ছাড়া গাজার প্রায় ৮২ শতাংশ পরিবার নিরাপদ পানীয় জলের সুযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবার দৈনিক মাথাপিছু ৬ লিটার পানিও পাচ্ছে না। ইসরায়েলি হামলায় গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ