শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কওমী টাইমস

আমেরিকায় ২০০১ সালের হামলার ২৫ বছর; "সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ"-এর নামে আফগানিস্তান থেকে শুরু করে ইরাক, ইয়েমেন, সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অব্যাহত হামলায় মানব ইতিহাসের ভয়াবহতম মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে।

১১ সেপ্টেম্বর-পরবর্তী মার্কিন যুদ্ধ: সাড়ে ৪৫ লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ও ৩ কোটি ৮০ লাখ মানবেতর বাস্তুচ্যুত


কওমী টাইমস ডেস্ক
কওমী টাইমস ডেস্ক
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১১ সেপ্টেম্বর-পরবর্তী মার্কিন যুদ্ধ: সাড়ে ৪৫ লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ও ৩ কোটি ৮০ লাখ মানবেতর বাস্তুচ্যুত

আমেরিকায় ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে হামলার পর ওয়াশিংটন যে "সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ" ঘোষণা করেছিল, তার এক চতুর্থাংশ শতাব্দী পেরিয়ে এসে উন্মোচিত হয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে করুণ ও ভয়াবহ চেহারা। মার্কিন আগ্রাসন কেবল দেশটির পররাষ্ট্রনীতিকেই পরিবর্তন করেনি, বরং আফগানিস্তান থেকে ইরাক, ইয়েমেন থেকে সোমালিয়া পর্যন্ত বিশাল ভৌগোলিক সীমানায় কোটি কোটি মুসলিমের জীবন চিরতরে ধ্বংস করে দিয়েছে।

সন্ত্রাসবাদের বাহানায় ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে রক্তক্ষয়ী আক্রমণ ও দখলদারিত্ব শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৩ সালে ভুয়া অজুহাতে ইরাকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, লিবিয়া ও সিরিয়াসহ একাধিক মুসলিমপ্রধান দেশে ড্রোন হামলা, বিমান হামলা এবং সামরিক অভিযান পরিচালনা করে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী।

ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের কস্ট অব ওয়ার প্রজেক্টের ভয়াবহ পরিসংখ্যান

যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স-এর 'কস্ট অব ওয়ার' (Savaşın Maliyetleri) প্রজেক্টের হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে পরিচালিত মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ ও হামলায় ৪৫ লাখ থেকে ৪৭ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

এই বিশাল মৃত্যুর মিছিলকে দুটি ভাগে চিহ্নিত করা হয়েছে

সরাসরি সংঘর্ষে মৃত্যু: বোমাবর্ষণ, সরাসরি গুলি ও সামরিক অভিযানে অন্তত ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষ সরাসরি নিহত হয়েছেন।

পরোক্ষ কারণে মৃত্যু: যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার ফলে চিকিৎসাসেবা ধ্বংস, খাদ্যসংকট, তীব্র অপুষ্টি, পানীয় জলের অভাব ও মহামারী ছড়িয়ে পড়ার কারণে ৩৬ লাখ থেকে ৩৮ লাখ মানবাধিক মানুষ পরোক্ষভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন।

দেশভিত্তিক প্রত্যক্ষ প্রাণহানির চিত্র:

আফগানিস্তান: ২০ বছরের দীর্ঘ মার্কিন দখলদারিত্বে সরাসরি যুদ্ধে নিহত হয়েছেন অন্তত ১ লাখ ৭৬ হাজার মানুষ।

ইরাক: ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ থেকে শুরু হওয়া অবৈধ মার্কিন আগ্রাসনে সরাসরি প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার নাগরিক।

পাকিস্তান: ২০০৪ সাল থেকে সীমান্তবর্তী এলাকায় মার্কিন ডোন হামলায় ২,৪৯৯ থেকে ৪,০০১ জন নিরীহ মানুষ নিহত হন।

ইয়েমেন: যুক্তরাষ্ট্রের গোপন ড্রোন ও বিশেষ অভিযানে অন্তত ৮৫৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

সিরিয়া ও ইরাক (আইএস বিরোধী অভিযান): মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বেসামরিক প্রাণহানির সংখ্যা মাত্র ১,৪১৭ বলে দাবি করলেও নিরপেক্ষ তদারকি সংস্থা 'এয়ারওয়ার্স' (Airwars) জানিয়েছে, আসল নিহতের সংখ্যা ৮,২৬৪ থেকে ১৩,৩৬০ জনেরও বেশি।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ শরণার্থী সংকট ও অর্থনৈতিক অপচয়

কস্ট অব ওয়ার-এর তথ্যমতে, আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, ফিলিপাইন, লিবিয়া ও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ২০০১-পরবর্তী সামরিক অভিযানের কারণে ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য দেশে বা দেশের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছেন। যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী সংকট।

এদিকে এই মানববিধ্বংসী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন (৮ লাখ কোটি) ডলার। এর মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনাতেই ব্যয় হয়েছে ৫.৮ ট্রিলিয়ন ডলার এবং বাকি ২.২ ট্রিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে যুদ্ধে আহত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মার্কিন সৈনিকদের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন খরচের জন্য। মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষের রক্তে রঞ্জিত এই যুদ্ধ মানবজাতির ইতিহাসে সাম্রাজ্যবাদী নির্মমতার এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

বিষয় : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


১১ সেপ্টেম্বর-পরবর্তী মার্কিন যুদ্ধ: সাড়ে ৪৫ লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ও ৩ কোটি ৮০ লাখ মানবেতর বাস্তুচ্যুত

প্রকাশের তারিখ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

আমেরিকায় ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে হামলার পর ওয়াশিংটন যে "সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ" ঘোষণা করেছিল, তার এক চতুর্থাংশ শতাব্দী পেরিয়ে এসে উন্মোচিত হয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে করুণ ও ভয়াবহ চেহারা। মার্কিন আগ্রাসন কেবল দেশটির পররাষ্ট্রনীতিকেই পরিবর্তন করেনি, বরং আফগানিস্তান থেকে ইরাক, ইয়েমেন থেকে সোমালিয়া পর্যন্ত বিশাল ভৌগোলিক সীমানায় কোটি কোটি মুসলিমের জীবন চিরতরে ধ্বংস করে দিয়েছে।

সন্ত্রাসবাদের বাহানায় ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে রক্তক্ষয়ী আক্রমণ ও দখলদারিত্ব শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৩ সালে ভুয়া অজুহাতে ইরাকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, লিবিয়া ও সিরিয়াসহ একাধিক মুসলিমপ্রধান দেশে ড্রোন হামলা, বিমান হামলা এবং সামরিক অভিযান পরিচালনা করে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী।

ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের কস্ট অব ওয়ার প্রজেক্টের ভয়াবহ পরিসংখ্যান

যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স-এর 'কস্ট অব ওয়ার' (Savaşın Maliyetleri) প্রজেক্টের হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে পরিচালিত মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ ও হামলায় ৪৫ লাখ থেকে ৪৭ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

এই বিশাল মৃত্যুর মিছিলকে দুটি ভাগে চিহ্নিত করা হয়েছে

সরাসরি সংঘর্ষে মৃত্যু: বোমাবর্ষণ, সরাসরি গুলি ও সামরিক অভিযানে অন্তত ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষ সরাসরি নিহত হয়েছেন।

পরোক্ষ কারণে মৃত্যু: যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার ফলে চিকিৎসাসেবা ধ্বংস, খাদ্যসংকট, তীব্র অপুষ্টি, পানীয় জলের অভাব ও মহামারী ছড়িয়ে পড়ার কারণে ৩৬ লাখ থেকে ৩৮ লাখ মানবাধিক মানুষ পরোক্ষভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন।

দেশভিত্তিক প্রত্যক্ষ প্রাণহানির চিত্র:

আফগানিস্তান: ২০ বছরের দীর্ঘ মার্কিন দখলদারিত্বে সরাসরি যুদ্ধে নিহত হয়েছেন অন্তত ১ লাখ ৭৬ হাজার মানুষ।

ইরাক: ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ থেকে শুরু হওয়া অবৈধ মার্কিন আগ্রাসনে সরাসরি প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার নাগরিক।

পাকিস্তান: ২০০৪ সাল থেকে সীমান্তবর্তী এলাকায় মার্কিন ডোন হামলায় ২,৪৯৯ থেকে ৪,০০১ জন নিরীহ মানুষ নিহত হন।

ইয়েমেন: যুক্তরাষ্ট্রের গোপন ড্রোন ও বিশেষ অভিযানে অন্তত ৮৫৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

সিরিয়া ও ইরাক (আইএস বিরোধী অভিযান): মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বেসামরিক প্রাণহানির সংখ্যা মাত্র ১,৪১৭ বলে দাবি করলেও নিরপেক্ষ তদারকি সংস্থা 'এয়ারওয়ার্স' (Airwars) জানিয়েছে, আসল নিহতের সংখ্যা ৮,২৬৪ থেকে ১৩,৩৬০ জনেরও বেশি।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ শরণার্থী সংকট ও অর্থনৈতিক অপচয়

কস্ট অব ওয়ার-এর তথ্যমতে, আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, ফিলিপাইন, লিবিয়া ও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ২০০১-পরবর্তী সামরিক অভিযানের কারণে ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য দেশে বা দেশের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছেন। যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী সংকট।

এদিকে এই মানববিধ্বংসী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন (৮ লাখ কোটি) ডলার। এর মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনাতেই ব্যয় হয়েছে ৫.৮ ট্রিলিয়ন ডলার এবং বাকি ২.২ ট্রিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে যুদ্ধে আহত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মার্কিন সৈনিকদের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন খরচের জন্য। মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষের রক্তে রঞ্জিত এই যুদ্ধ মানবজাতির ইতিহাসে সাম্রাজ্যবাদী নির্মমতার এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ