গাজা উপত্যকায় নির্বিচার বোমাহামলার স্থান নির্ধারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহারের পর এবার দখলকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ভূমি গ্রাস ও বাড়িঘর উচ্ছেদে একই প্রযুক্তির প্রয়োগ শুরু করেছে ইসরায়েল। ‘ImiSight’ নামের একটি বিশেষ AI অ্যালগরিদম ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সাহায্যে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে পরিবর্তন শনাক্ত করে তড়িঘড়ি করে বুলডোজার পাঠিয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে তাদের বসতবাড়ি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও গবেষকরা ইসরায়েলের এই পদক্ষেপকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে 'প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশাসনিক দখলদারিত্ব' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর নৈতিক ব্যবহারের বদলে যুদ্ধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনে এর নজিরবিহীন অপব্যবহার করে চলেছে ইসরায়েল। গাজায় গণহত্যার কাজে ব্যবহৃত বিতর্কিত প্রযুক্তির সফল পরীক্ষার পর, এবার দখলকৃত পশ্চিম তীর এবং নাকাব (নেগেভ) মরুভূমিতে ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভিটেমাটি থেকে বিতাড়িত করতে AI-কে অস্ত্র হিসেবে প্রয়োগ করছে তেল আবিব।
তুর্কিভিত্তিক গণমাধ্যম ‘পলডিজিটাল’ ও মানবাধিকার কর্মীদের তথ্যমতে, ইসরায়েলি অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান 'রাফায়েল' (Rafael)-এর তৈরি ‘ImiSight’ নামক AI টুল ব্যবহার করে বিশাল এলাকার ভূসংস্থান নিরীক্ষণ করা হচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের নির্মিত যেকোনো নতুন কাঠামো বা সংস্কার কাজ এই প্রযুক্তির সাহায্যে মুহূর্তের মধ্যে শনাক্ত করা হয় এবং পরবর্তীতে অবৈধ নির্মাণের অজুহাত তুলে তা ধ্বংস করা হয়।
নাকাব মরুভূমি থেকে পশ্চিম তীরে প্রসার প্রাথমিকভাবে এই AI টুলটি ইসরায়েলের অভ্যন্তরে নাকাব মরুভূমিতে বসবাসকারী বেদুইন মুসলিম নাগরিকদের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছিল। ইসরায়েলি কতৃপক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বেদুইনদের বাড়ি নির্মাণের অনুমোদন দেয় না, আর AI প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের প্রাচীন গ্রামগুলোকে "অবৈধ" চিহ্নিত করে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পলডিজিটাল-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত নাকাবের ১০,৭০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা সার্ভে করে ২,৬০০টিরও বেশি বেদুইন বাড়ি উচ্ছেদ করতে সাহায্য করেছে এই প্রযুক্তি।
নাকাবে প্রয়োগের ‘সাফল্য’ দেখে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ইসরায়েল ল্যান্ড অথরিটি (ILA) পশ্চিম তীরে তাদের বিশেষ বিভাগ গঠন করে। ফিলিস্তিনবিরোধী ‘পিস নাও’ (Peace Now) সহ বিভিন্ন ইসরায়েলি মানবাধিকার দল এই পদক্ষেপকে পশ্চিম তীরকে সরাসরি ইসরায়েলি বেসামরিক প্রশাসনের অধীনে এনে ‘ডিজিটাল দখলের’ চূড়ান্ত ষড়যন্ত্র বলে সতর্ক করেছে।
মহাকাশ থেকে অ্যালগরিদমের নজরদারি ফিলিস্তিনিদের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ খালেদ সাফির মতে, আধুনিক স্যাটেলাইটগুলোর ভেতরেই এখন ক্ষমতাশালী কম্পিউটার চিপ ও AI অ্যালগরিদম বসানো হয়েছে, যাকে ‘এজ কম্পিউটিং’ (Edge Computing) বলা হয়। মানব পর্যবেক্ষকের ওপর নির্ভর না করে এসব স্যাটেলাইট মহাকাশে বসেই ভূখণ্ডের ছবি বিশ্লেষণ করে এবং কোনো পরিবর্তন চোখে পড়লে সরাসরি তা ইসরায়েলি ল্যান্ড অথরিটিকে পাঠায়।
ওয়াল অ্যান্ড কোলনিয়াজেশন রেজিস্ট্যান্স কমিশনের প্রধান আমির দাউদ আল জাজিরাকে জানান, 'অ্যালগরিদম এখানে ইসরায়েলের ‘সহায়ক শক্তি’ হিসেবে কাজ করছে। এটি বিশাল এলাকা স্ক্যান করে ধ্বংসের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে কয়েকগুণ দ্রুত করে দিয়েছে। এতে করে উচ্ছেদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা দখলদারদের জন্য সহজ ও কম ব্যয়বহুল হচ্ছে।'
জ্যামিতিক হারে বেড়েছে বাড়ি ধ্বংসের হার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পশ্চিম তীরের ‘এরিয়া সি’ এবং দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের বাড়ি ধ্বংসের হার ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কেবল ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই ১,২৮৮টি ফিলিস্তিনি ভবন ভেঙে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
একদিকে, ইসরায়েলি উগ্রপন্থি বসতি স্থাপনকারীদের ড্রোন ও ক্যামেরা কিনতে কোটি কোটি শেকেল অনুদান দিচ্ছে সরকার, অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের বৈধ কোনো আবেদনকেই তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। আমির দাউদ একে ‘বর্ণবাদী দ্বিমুখী নীতি’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, "ফিলিস্তিনিদের বাড়ি চিহ্নিত করে দ্রুত ধ্বংস করা হয়, অথচ উগ্র হিন্দুত্ববাদী বা ইহুদি অবৈধ আউটপোস্টগুলোতে দ্রুত বিদ্যুৎ ও পরিষেবা সংযোগ দিয়ে পরে বৈধতা প্রদান করা হয়।"
মানবতাহীন সিদ্ধান্ত ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের ফাঁদ বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, উচ্ছেদের এই প্রক্রিয়ায় মানুষকে পুরোপুরি বাইরে রেখে পুরোপুরি অ্যালগরিদমের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এতে অপরাধীরা তাদের দায় অ্যালগরিদমের ওপর চাপিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। আরও মারাত্মক বিষয় হলো, ইসরায়েল ফিলিস্তিনকে তাদের এই প্রাণঘাতী ও মানবাধিকারবিরোধী প্রযুক্তি পরীক্ষার ‘ল্যাবরেটরি’ হিসেবে ব্যবহার করছে এবং পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোর কাছে এই AI অ্যালগরিদম বিক্রি করে বিপুল অর্থ উপার্জন করছে।
মতামত