ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি গণহত্যা, সামরিক আগ্রাসন ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধের দাবিতে বিশ্বব্যাপী এক অভূতপূর্ব আন্দোলনের ডাক দিয়েছে ২০০টি আন্তর্জাতিক সংগঠন। 'গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ফিলিস্তিন' (GAFP)-এর নেতৃত্বে এবং 'অ্যান্টি-অপার্থাইড মুভমেন্ট' (AAM) ও 'গ্লোবাল কোয়ালিশন অ্যাগেইনস্ট অকুপেশন অব ফিলিস্তিন' (SAND)-এর সমর্থনে বিশ্বের ৬০টি দেশের সামাজিক, মানবাধিকার ও শ্রমিক সংগঠনগুলো এই আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ এবং ইসরায়েলের সাথে অস্ত্র বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধের দাবিতে ৬ মহাদেশজুড়ে এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত গণহত্যা এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান সহিংসতার প্রতিবাদে বিশ্বজুড়ে নতুন করে সোচ্চার হয়েছে আন্তর্জাতিক নাগরিক সমাজ। 'গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ফিলিস্তিন' (GAFP)-এর সমন্বয়ে বিশ্বের ৬০টি দেশের ২০০টিরও বেশি সংগঠন একযোগে গণআন্দোলন ও নাগরিক প্রতিরোধের ডাক দিয়েছে।
এ যৌথ উদ্যোগে অংশ নিয়েছে বিভিন্ন দেশের সুশীল সমাজ, শ্রমিক ইউনিয়ন, ছাত্র সংগঠন এবং মানবাধিকার নেটওয়ার্ক। আয়োজকরা জানিয়েছেন, বিশ্বের ৬টি মহাদেশেই এই আন্দোলন বিস্তৃত হবে। মূল লক্ষ্য—ইসরায়েল কর্তৃক সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং ইসরায়েলের সাথে সব ধরনের সামরিক ও অস্ত্র বাণিজ্য অবিলম্বে বন্ধ করা।
লন্ডন, সিডনি, কেপটাউন, সাও পাওলো, রবাত, কিটো, মেক্সিকো সিটি, ইস্তাম্বুল, সান্তিয়াগো, রেইকিয়াভিক, ব্যাংকক, এথেন্স এবং কুয়ালালামপুরসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রধান প্রধান শহরগুলোতে গণবিক্ষোভ, অবস্থান কর্মসূচি, সাংস্কৃতিক সমাবেশ ও সচেতনতামূলক শিক্ষামূলক কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া অংশগ্রহণকারী সংগঠনগুলো ইসরায়েলের সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক সংস্থা অবরুদ্ধ করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও বিশ্বব্যাপী জাগরণ
গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ফিলিস্তিনের মহাসচিব ড. আনাস আল-তিকরিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, 'দীর্ঘ তিন বছর ধরে চলমান গণহত্যা এবং ইসরায়েলি পৃষ্ঠপোষকতায় বসতি স্থাপনকারীদের মাত্রাতিরিক্ত সহিংসতার পর বিশ্ব কূটনীতির 'সংযম' ও 'ফাঁপা প্রতিশ্রুতি'-র আসল চেহারা পুরোপুরি উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতি এখন সম্পূর্ণ ব্যর্থ।'
তিনি আরো যোগ করেন, 'আমরা বিশ্বের প্রতিটি মহাদেশ থেকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড রক্ষা, গণহত্যা বন্ধ, ইসরায়েলি সামরিক রসদ সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন করা এবং সবার জন্য সমানভাবে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের দাবিতে একজোট হয়েছি। আমাদের স্পষ্ট দাবি—ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধীদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।'
আইনগত ও সংসদীয় চাপ সৃষ্টি
রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি এই জোট বিভিন্ন দেশের সংসদে আইনগত ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির ওপর জোর দিচ্ছে। আন্দোলনকারী দলগুলো নিজ নিজ দেশের এমপি ও রাজনৈতিক নেতাদের ওপর জরুরি সংসদীয় বিতর্ক আহ্বান এবং ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি নিয়ে সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য লবিং ও গণদাবি উত্থাপন করছে।
এই বিশ্বব্যাপী গণআন্দোলনে একাধিক আন্তর্জাতিক শীর্ষ জোট ও সংস্থা যুক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: যুক্তরাজ্যভিত্তিক 'স্টপ দ্য ওয়ার কোয়ালিশন' ও 'ক্যাম্পেইন ফর নিউক্লিয়ার ডিসআর্মামেন্ট' (CND), লাতিন আমেরিকার 'ফেডারেশন অব ফিলিস্তিনিয়ান এনটিটিজ', 'অস্ট্রেলিয়ান ফিলিস্তিন অ্যাডভোকেসি নেটওয়ার্ক', মালয়েশিয়ার 'ভিভা ফিলিস্তিন মালয়েশিয়া' ও 'মাইকেয়ার', আন্তর্জাতিক নারী সংগঠন 'কোডপিংক', 'ওয়ার্কার্স ফর ফিলিস্তিন' এবং দক্ষিণ আফ্রিকার 'প্যালেস্টাইন সলিডারিটি অ্যালায়েন্স'।
মতামত