সৌদি নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীর মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, ইয়েমেনের হুথি মিলিশিয়ারা গত মঙ্গলবার ভোরে একটি আত্মঘাতী ড্রোনের সাহায্যে মহানবী (সা.)-এর শহর মদিনা মুনাওয়ারায় অবস্থিত 'তাইবা বিদ্যুৎ বণ্টন কেন্দ্র'-এ হামলা চালিয়েছে। এই সন্ত্রাসী হামলায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ট্রান্সফরমার সাময়িকভাবে অকেজো হয়ে পড়লেও বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হয়নি। মসজিদে নববী শরীফ এবং মদিনার বাসিন্দাদের বিদ্যুৎ সেবায় নিয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করায় ওআইসি (OIC), জিসিসি (GCC) এবং একাধিক মুসলিম দেশ তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে এবং এটিকে পবিত্র স্থান ও মুসলিম উম্মাহর অনুভূতির ওপর এক চরম আঘাত হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
মদিনা মুনাওয়ারায় পবিত্রতার ওপর হামলা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন (জোট বাহিনী)-এর মুখপাত্র বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানান, মঙ্গলবার ভোরে মদিনা মুনাওয়ারার তাইবা বিদ্যুৎ বণ্টন কেন্দ্রে ইয়েমেন কেন্দ্রিক হুথি গোষ্ঠী একটি ড্রোন হামলা চালায়। যৌথ বাহিনীর প্রধান মুখপাত্র এই ঘটনাকে একটি "সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড" হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, হামলার ফলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ডিস্ট্রিবিউশন ট্রান্সফরমার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সেবার বাইরে চলে যায়, তবে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থার কারণে মূল বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, যৌথ বাহিনী হারামাইন শরীফাইনের (মক্কা ও মদিনা) সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে হুথি মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রাখবে।
মুসলিম বিশ্বের তীব্র নিন্দা ও প্রতিক্রিয়া
মসজিদে নববী শরীফে আলো ও বিদ্যুৎ সেবায় নিয়োজিত এই স্থাপনায় হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো মুসলিম বিশ্বে ক্ষোভের ঝড় উঠেছে।
জিসিসি (GCC): গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের মহাসচিব জসিম আল-বুদাইভি এক কঠোর বিবৃতিতে এ হামলার তীব্র নিন্দা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, "মসজিদে নববী শরীফের খেদমতে নিয়োজিত কোনো স্থাপনায় আঘাত হানা বিশ্বজুড়ে তামাম মুসলিম উম্মাহর আবেগকে চরমভাবে উস্কে দেওয়ার নামান্তর এবং এটি ইসলামী পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদা লঙ্ঘনের একটি বিপজ্জনক সীমা।"
কাতার: কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ঘটনাটিকে ইসলামী স্থানগুলোর পবিত্রতার ওপর চরম আঘাত ও বেসামরিক মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হিসেবে বর্ণনা করেছে। এটি আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কাতার তার ভ্রাতৃপ্রতীম দেশ সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় যেকোনো পদক্ষেপে সম্পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছে।
জর্ডান: জর্ডানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে মদিনা মুনাওয়ারার বিদ্যুৎ স্থাপনায় হুথি ড্রোন হামলার তীব্র ধিক্কার জানিয়ে একে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্বের ওপর হামলা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি বলে অভিহিত করেছে।
কুয়েত: কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, মসজিদে নববীকে সেবাদানকারী স্থাপনায় আক্রমণ ইসলামী অনুভূতির ওপর আঘাত হানার শামিল।
অন্যান্য দেশ: সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE), বাহরাইন ও মিশর পৃথক পৃথক বিবৃতিতে এই হামলাকে আঞ্চলিক শান্তি বিনষ্টের একটি অপচেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে এবং সৌদি আরবের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ইয়েমেন সরকার: ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, "ইরান সমর্থিত সন্ত্রাসী মিলিশিয়ারা মসজিদে নববী শরীফে আলো জ্বালানো বিদ্যুৎ স্থাপনায় আক্রমণ করে তাদের উগ্রবাদী চেহারা আবারও উন্মোচিত করেছে।"
ওআইসি (OIC): ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (OIC) জেনারেল সেক্রেটারিয়েট থেকে জারি করা বিবৃতিতে মদিনায় এই হামলাকে 'উদ্বেগজনক উসকানি' বলে উল্লেখ করে হারামাইন শরীফাইনের সুরক্ষায় সব মুসলিম দেশকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মক্কা ও হারামাইন শরীফাইনকে ঘিরে ধারাবাহিক হুমকি ও অতীত প্রসঙ্গ
উল্লেখ্য, এর আগেও মক্কা মুকাররমার আকাশসীমায় একটি শত্রুপক্ষীয় ড্রোন অনুপ্রবেশের চেষ্টা করলে সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী তা মাঝপথে ধ্বংস করে দেয়। সৌদি জোট বাহিনীর তথ্যমতে, এটি ছিল মক্কা মুকাররমাকে লক্ষ্য করে চালানো দ্বিতীয় ব্যর্থ চেষ্টা (এর আগে ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই একটি ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছিল)।
যদিও হুথি গোষ্ঠী সরাসরি মক্কায় হামলার কথা অস্বীকার করে থাকে, তবুও সম্প্রতি হুথি নিয়ন্ত্রিত 'আল-মাসিরা' টিভিতে প্রকাশিত একটি ভিডিও মুসলিম সমাজকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, تعز (তাজ) প্রদেশের হুথি মনোনীত মুফতি আলভি বিন সহল বিন আকিল এক উন্মুক্ত জনসভায় প্রকাশ্যে দাবি করেন যে, তারা "হারামাইন শরীফাইনকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাবেন।" ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের অনেকেই মন্তব্য করেছেন, এ ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য মূলত বিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র দুই স্থানে হামলার অযৌক্তিক অজুহাত তৈরির শামিল।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষণ ও মুসলিম উম্মাহর নিরাপত্তার স্বার্থে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক বা সামরিক দ্বন্দ্ব যাই থাকুক না কেন, মক্কা ও মদিনা মুনাওয়ারার মতো বিশ্ব মুসলিমের সার্বজনীন পবিত্র কেন্দ্রগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যহাসিল ও আক্রমণের বাইরে রাখা প্রতিটি মুসলিম ও দায়িত্বশীল গোষ্ঠীর ঈমানী ও নৈতিক দায়িত্ব।
মতামত