ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে মুসলিম ধর্মীয় উপাসনালয় ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে এবার সীতাপুর জেলার একটি ঐতিহাসিক মসজিদ ও মাদ্রাসাকে সাত দিনের মধ্যে দখল সরানোর নোটিশ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। সীতাপুরের তামবোর এলাকার জিয়াউল উলুম মসজিদের বিরুদ্ধে অবৈধ দখলের অভিযোগ তুলে রাজস্ব বিভাগ এ নোটিশ জারি করেছে, যা নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। উচ্চ আদালতে জমি সংক্রান্ত মামলাটি এখনো বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও তড়িঘড়ি করে প্রশাসনের এই নোটিশ জারির পেছনে রাজনৈতিক মেরুকরণ ও ধর্মীয় বৈষম্যের স্পষ্ট ছাপ দেখছেন অধিকারকর্মী ও স্থানীয়রা।
ভারতের বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশে বিগত কিছুদিন ধরে ধর্মীয় উপাসনালয়, মসজিদ ও মাদ্রাসা গুঁড়িয়ে দেওয়ার যে ধারা শুরু হয়েছে, সীতাপুরের নোটিশটি তারই ধারাবাহিকতা বলে মনে করা হচ্ছে। সীতাপুর জেলার লাহারপুর তহসিলের পরিদর্শক সুন্দর লাল রাস্তোগী গত বুধবার (৭ অক্টোবর) জিয়াউল উলুমের ব্যবস্থাপক ও মুতাওয়াল্লী মাওলানা শাহিদ আলীকে নোটিশটি হস্তান্তর করেন। এতে অভিযোগ করা হয়েছে যে, আমেদাবাদ গ্রামের ৫৪১ নম্বর প্লটে (যার একটি অংশ কবরস্থান হিসেবে নথিভুক্ত) সরকারি ও গ্রাম সভার জমিতে স্থায়ী দোকান এবং মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে এসব স্থাপনা নিজ দায়িত্বে না সরালে প্রশাসন নিজেই উচ্ছেদ অভিযান চালাবে এবং তার খরচ ভূমির বকেয়া রাজস্ব হিসেবে আদায় করবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
তবে মসজিদ কমিটির স্পষ্ট বক্তব্য, বিষয়টি আদালতের বিচারাধীন। হাইকোর্টের নথিপত্র অনুসারে, মাওলানা শাহিদ আলী এবং ওয়াকফ মাদ্রাসা জিয়াউল উলুম ইতিমধ্যেই ২০২৬ সালের রিট পিটিশন (Writ-C No. 3339 of 2026)-এর মাধ্যমে রাজস্ব কোডের আদেশের বিরুদ্ধে এলাহাবাদ হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। আদালতের চুড়ান্ত রায়ের আগেই প্রশাসনিক এই তৎপরতা ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিচারিক প্রক্রিয়াকে অবমাননার শামিল।
ধারাবাহিক বৈষম্য ও উচ্ছেদের রূপরেখা
সীতাপুরের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত দুই মাসে ভারতের বিভিন্ন স্থানে সড়ক প্রশস্তকরণ, অবৈধ নির্মাণ বা দখলের অজুহাতে মুসলিম উপাসনালয় লক্ষ্য করে একের পর এক পদক্ষেপ দেখা গেছে:
- সাহারানপুর (৫ সেপ্টেম্বর): সাহারানপুরের কালেক্টরেট চত্বরে অবস্থিত ১০০ বছরেরও বেশি পুরনো একটি ঐতিহ্যবাহী মসজিদ ভারী পুলিশ মোতায়েনের মধ্যে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। জমি বিরোধের মামলায় প্রশাসন নিজেই এক পক্ষে অবস্থান নিয়ে একই সঙ্গে বিচারক ও বাস্তবায়নকারী সংস্থায় পরিণত হয়েছে বলে তীব্র নিন্দা জানান জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি মাওলানা মাহমুদ মাদানী।
- মুরাদাবাদ (আগস্ট-সেপ্টেম্বর): সাহারানপুরের পরপরই মুরাদাবাদ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ দিল্লি রোডের মোস্তফা মসজিদের ৩০০ বর্গমিটার অংশকে ‘অনুমোদনহীন’ ঘোষণা করে ১৫ দিনের মধ্যে তা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়।
- উজ্জয়িনী, মধ্যপ্রদেশ (২৮-২৯ সেপ্টেম্বর): ২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভমেলাকে সামনে রেখে রাস্তা প্রশস্ত করার নামে ঐতিহাসিক শাহি মসজিদের সীমানা প্রাচীর ও মিনার ভেঙে ফেলা হয়। স্থানীয় মুসলিম সমাজ চোখের জলে নিজেদের হাতেই মসজিদের অংশবিশেষ ভাঙতে বাধ্য হয়।
- সংভল ও সিদ্ধার্থনগর: সংভলের ওয়ারিস নগরে একটি মসজিদসহ ৩৪টি বাড়ি উচ্ছেদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে সিদ্ধার্থনগরে প্রায় ৬০ বছরের পুরনো একটি মাদ্রাসা ও মসজিদের অংশ বিশেষ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক মেরুকরণ ও আইনি প্রশ্ন
অধিকার রক্ষা সংগঠন ও বিরোধী দলগুলোর মতে, ২০২৭ সালের শুরুতে উত্তরপ্রদেশে হতে যাওয়া বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখেই এই মেরুকরণের রাজনীতি করা হচ্ছে। কংগ্রেস এবং সমাজবাদী পার্টির নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেছেন যে শতবর্ষী এসব ধর্মীয় স্থাপনা যখন নির্মিত হয়েছিল, তখন বর্তমান নগর পরিকল্পনা আইন ছিল না। অন্য ধর্মের বহু স্থাপনা একই মানদণ্ডে অবৈধ হতে পারে, কিন্তু কেবল মুসলিমদের টার্গেট করে উচ্ছেদ চালানো হচ্ছে।
যদিও প্রতিবাদের মুখে কোথাও কোথাও ব্যাকফুটে এসেছে প্রশাসন; যেমন বারানসিতে প্রায় ১,০০০ বছর পুরনো ঐতিহ্যবাহী গঞ্জ শহীদান মসজিদের উচ্ছেদ নোটিশ প্রতিবাদের মুখে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় প্রশাসন। তবুও পুরো ভারতজুড়ে মুসলিম সমাজের বড় প্রশ্ন—সুপ্রিম কোর্টের "বুলডোজার জাস্টিস" সম্পর্কিত কড়া নির্দেশনা এবং ওয়াকফ আইন কি আদৌ বাস্তবায়িত হচ্ছে, নাকি আইন কেবল একতরফাভাবেই প্রয়োগ হচ্ছে?
মতামত