মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
কওমী টাইমস

মধ্যপ্রদেশের ভোপালে ভিন্ন সম্প্রদায়ের নারীর সাথে হোটেলে থাকায় এক যুবককে গণপিটুনি ও মুখে গোবর-কালি লেপে দেওয়ার ঘটনা; যুবতীর দাবি, তারা লিভ-ইন সম্পর্কে ছিলেন এবং স্বেচ্ছায় এসেছিলেন

মুসলিম যুবককে মারধর ও মুখে গোবর লেপে হেনস্তা, স্বেচ্ছায় লিভ-ইন রিলেশনশিপের কথা জানালেন তরুণী



মুসলিম যুবককে মারধর ও মুখে গোবর লেপে হেনস্তা, স্বেচ্ছায় লিভ-ইন রিলেশনশিপের কথা জানালেন তরুণী

ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ভোপালে ভিন্ন সম্প্রদায়ের এক নারীর সাথে হোটেলে অবস্থানের কারণে আরিফ খান নামক এক মুসলিম যুবককে নির্মমভাবে মারধর, বিবস্ত্র এবং জনসমক্ষে হেনস্থা করার অভিযোগ উঠেছে। কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর ছড়ানো "লাভ জিহাদ" ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জের ধরে এই হামলা চালানো হয়। তবে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে ওই নারী জানিয়েছেন, তারা দীর্ঘদিনের লিভ-ইন সম্পর্কে ছিলেন এবং সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় সেখানে এসেছিলেন।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় একদল লোক আরিফ খানকে হোটেল থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে মারধর করছে এবং তার মুখে কালি ও গোবর লেপে দিচ্ছে। স্থানীয় সমাজকর্মী মোহাম্মদ ওয়াইস রহমানির দায়ের করা এজাহার অনুযায়ী, হামলাকারীরা নিজেদের কট্টরপন্থী সংগঠন ‘বজ্রং দল’-এর কর্মী বলে পরিচয় দেয় এবং ইসলাম ধর্মকে লক্ষ্য করে আপত্তিকর ও অবমাননাকর স্লোগান দেয়।

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে ওই নারী এই দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি জানান, গত ৫ থেকে ৭ বছর ধরে তারা লিভ-ইন সম্পর্কে (একত্রে বসবাস) আছেন। কোনো জোরজুলুম বা জিম্মি করার ঘটনা ঘটেনি এবং তিনি যুবকের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

ঘটনাটি ঘটেছে ভোপালের গোবিন্দপুরা এলাকার একটি হোটেলে। আরিফ খান একজন হিন্দু নারীর সাথে হোটেলে অবস্থান করছেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে একদল উগ্রপন্থী জনতা হোটেলে চড়াও হয়। তারা জোরপূর্বক ওই দম্পতিকে রুম থেকে বের করে আনে এবং আরিফকে রাস্তায় এনে গণপিটুনি দেয়। গুরুতর শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি ভিডিও ধারণ করে তা অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ায় ভুক্তভোগী চরম মানসিক ট্রমার শিকার হয়েছেন।

ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১ জন কিশোরসহ মোট ৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—ব্রিজেন্দ্র প্রজাপতি, প্রতীক চৌকসে, লালরাম মিনা, রমেশ, অজয় এবং আমান।

গোবিন্দপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (SHO) অবধেশ সিং তোমার জানিয়েছেন, অভিযুক্তদের সাথে বজ্রং দল বা অন্য কোনো দক্ষিণপন্থী সংগঠনের আনুষ্ঠানিক যোগসূত্রের প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। সংগঠনের প্রতিনিধিরাও দাবি করেছেন, ধৃতরা তাদের সদস্য নয়।

এদিকে, ঘটনার পর পুলিশ ভুক্তভোগী আরিফ খানকে পুরোনো দুটি মোবাইল চুরির মামলায় গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ জানায়, তিনি সম্প্রতি অন্য একটি মামলায় জেল থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন।

ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের নিজস্ব পছন্দে যেকোনো ব্যক্তির সাথে বসবাস বা জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার আইনি অধিকার রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ে 'লিভ-ইন রিলেশনশিপ' বা সম্মতিমূলক সম্পর্ককে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।

এই ঘটনায় জনসমক্ষে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনুপস্থিতিতে 'মব জাস্টিস' বা গণআদালত বসানো এবং নাগরিকের গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘনের তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করলেও, হামলার শিকার ব্যক্তিকেই তাৎক্ষণিকভাবে পুরোনো মামলায় পুনরায় গ্রেপ্তার করার বিষয়টি স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীদের মনে পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ভারতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক, বিশেষ করে মুসলিম পুরুষ ও হিন্দু নারীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে কট্টরপন্থী দলগুলো দ্বারা "লাভ জিহাদ"-এর অভিযোগ তুলে সহিংসতা সৃষ্টির প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। মধ্যপ্রদেশসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে এই বিষয়ে কঠোর আইন আনা হলেও, আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে উগ্র জনতা কর্তৃক আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা নাগরিক সমাজকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

একটি গণতান্ত্রিক ও আইনশাসিত রাষ্ট্রে যেকোনো নাগরিকের অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার কেবল আদালতের। জনসমক্ষে কাউকে হেনস্থা ও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর এই ঘটনাটি সমাজে আইনহীনতার এক বিপজ্জনক বার্তা দেয়। এই ধরণের সহিংসতা রোধে পুলিশ ও প্রশাসনকে আরও নিরপেক্ষ ও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে।

বিষয় : ভারত

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬


মুসলিম যুবককে মারধর ও মুখে গোবর লেপে হেনস্তা, স্বেচ্ছায় লিভ-ইন রিলেশনশিপের কথা জানালেন তরুণী

প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬

featured Image

ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ভোপালে ভিন্ন সম্প্রদায়ের এক নারীর সাথে হোটেলে অবস্থানের কারণে আরিফ খান নামক এক মুসলিম যুবককে নির্মমভাবে মারধর, বিবস্ত্র এবং জনসমক্ষে হেনস্থা করার অভিযোগ উঠেছে। কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর ছড়ানো "লাভ জিহাদ" ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জের ধরে এই হামলা চালানো হয়। তবে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে ওই নারী জানিয়েছেন, তারা দীর্ঘদিনের লিভ-ইন সম্পর্কে ছিলেন এবং সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় সেখানে এসেছিলেন।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় একদল লোক আরিফ খানকে হোটেল থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে মারধর করছে এবং তার মুখে কালি ও গোবর লেপে দিচ্ছে। স্থানীয় সমাজকর্মী মোহাম্মদ ওয়াইস রহমানির দায়ের করা এজাহার অনুযায়ী, হামলাকারীরা নিজেদের কট্টরপন্থী সংগঠন ‘বজ্রং দল’-এর কর্মী বলে পরিচয় দেয় এবং ইসলাম ধর্মকে লক্ষ্য করে আপত্তিকর ও অবমাননাকর স্লোগান দেয়।

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে ওই নারী এই দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি জানান, গত ৫ থেকে ৭ বছর ধরে তারা লিভ-ইন সম্পর্কে (একত্রে বসবাস) আছেন। কোনো জোরজুলুম বা জিম্মি করার ঘটনা ঘটেনি এবং তিনি যুবকের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

ঘটনাটি ঘটেছে ভোপালের গোবিন্দপুরা এলাকার একটি হোটেলে। আরিফ খান একজন হিন্দু নারীর সাথে হোটেলে অবস্থান করছেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে একদল উগ্রপন্থী জনতা হোটেলে চড়াও হয়। তারা জোরপূর্বক ওই দম্পতিকে রুম থেকে বের করে আনে এবং আরিফকে রাস্তায় এনে গণপিটুনি দেয়। গুরুতর শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি ভিডিও ধারণ করে তা অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ায় ভুক্তভোগী চরম মানসিক ট্রমার শিকার হয়েছেন।

ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১ জন কিশোরসহ মোট ৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—ব্রিজেন্দ্র প্রজাপতি, প্রতীক চৌকসে, লালরাম মিনা, রমেশ, অজয় এবং আমান।

গোবিন্দপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (SHO) অবধেশ সিং তোমার জানিয়েছেন, অভিযুক্তদের সাথে বজ্রং দল বা অন্য কোনো দক্ষিণপন্থী সংগঠনের আনুষ্ঠানিক যোগসূত্রের প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। সংগঠনের প্রতিনিধিরাও দাবি করেছেন, ধৃতরা তাদের সদস্য নয়।

এদিকে, ঘটনার পর পুলিশ ভুক্তভোগী আরিফ খানকে পুরোনো দুটি মোবাইল চুরির মামলায় গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ জানায়, তিনি সম্প্রতি অন্য একটি মামলায় জেল থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন।

ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের নিজস্ব পছন্দে যেকোনো ব্যক্তির সাথে বসবাস বা জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার আইনি অধিকার রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ে 'লিভ-ইন রিলেশনশিপ' বা সম্মতিমূলক সম্পর্ককে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।

এই ঘটনায় জনসমক্ষে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনুপস্থিতিতে 'মব জাস্টিস' বা গণআদালত বসানো এবং নাগরিকের গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘনের তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করলেও, হামলার শিকার ব্যক্তিকেই তাৎক্ষণিকভাবে পুরোনো মামলায় পুনরায় গ্রেপ্তার করার বিষয়টি স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীদের মনে পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ভারতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক, বিশেষ করে মুসলিম পুরুষ ও হিন্দু নারীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে কট্টরপন্থী দলগুলো দ্বারা "লাভ জিহাদ"-এর অভিযোগ তুলে সহিংসতা সৃষ্টির প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। মধ্যপ্রদেশসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে এই বিষয়ে কঠোর আইন আনা হলেও, আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে উগ্র জনতা কর্তৃক আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা নাগরিক সমাজকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

একটি গণতান্ত্রিক ও আইনশাসিত রাষ্ট্রে যেকোনো নাগরিকের অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার কেবল আদালতের। জনসমক্ষে কাউকে হেনস্থা ও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর এই ঘটনাটি সমাজে আইনহীনতার এক বিপজ্জনক বার্তা দেয়। এই ধরণের সহিংসতা রোধে পুলিশ ও প্রশাসনকে আরও নিরপেক্ষ ও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ