পশ্চিমবঙ্গে নবগঠিত সুভেন্দু অধিকারী সরকারের বেশ কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের জেরে রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন উত্তপ্ত। আসন্ন ঈদুল আজহার ঠিক আগে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কসাইখানা (বুচড়খানা) সংক্রান্ত একটি নতুন বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ই নয়, বরং বহু হিন্দু ব্যবসায়ী ও কৃষকও চরম সংকটে পড়েছেন। এই বিজ্ঞপ্তির বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার ওপর দ্রুত শুনানির ইঙ্গিত দিয়েছে আদালত।
পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকার গঠনের পর থেকেই বিভিন্ন জেলায় রাজনৈতিক সহিংসতা ও উত্তেজনার খবর সামনে আসছে। এর মধ্যেই বিজেপির নেতৃত্বাধীন মুখ্যমন্ত্রী সুভেন্দু অধিকারীর সরকার এমন কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যা রাজ্যজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ সরকারের এই পদক্ষেপকে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়-বিরোধী বলে অভিযোগ করছে। অন্যদিকে, পবিত্র ঈদুল আজহার আগে গবাদি পশুর ব্যবসায়ী এবং কৃষকরা চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
সম্প্রতি সন্দেশখালির বিজেপি বিধায়ক রেখা পাত্র একটি পশুবাহী গাড়ি আটকে সেটির সমস্ত গবাদি পশু নামিয়ে দেন। এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হয়। ভিডিওতে রেখা পাত্রকে দাবি করতে দেখা যায় যে, গবাদি পশু কেনাবেচা বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য এখন থেকে পশুর 'জন্ম শংসাপত্র' (Birth Certificate) দেখাতে হবে। বিধায়কের এমন অদ্ভুত ও অবাস্তব দাবির পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা তার তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন।
প্রতিবেশী রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা এই রাজ্যে সুভেন্দু সরকারের নেওয়া কসাইখানা সংক্রান্ত নতুন নোটিফিকেশনটি এবার আদালতের চৌকাঠে পৌঁছেছে। তানবীর খায়ের নামক এক ব্যক্তির দায়ের করা এই জনস্বার্থ মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে জরুরি ভিত্তিতে শুনানির আবেদন জানানো হয়। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে, আদালত এই বিষয়টির সংবেদনশীলতা অনুধাবন করে ইতিবাচক সাড়া দেয় এবং ইঙ্গিত দেয় যে, আগামীকালই (বুধবার) এর চূড়ান্ত শুনানি হতে পারে।
মামলার নথিসূত্রে জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার গত ১৩ মে কসাইখানা বন্ধ ও এর নিয়মনীতি নিয়ে একটি কঠোর বিজ্ঞপ্তি জারি করে, যা আগামী ২৮ মে থেকে রাজ্যজুড়ে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। আবেদনকারীর আইনজীবী আদালতে জানান, এর আগে ঠিক একই ইস্যুতে হওয়া একটি মামলায় তৎকালীন রাজ্য সরকার হলফনামা দিয়ে জানিয়েছিল যে— রাজ্যে কসাইখানা সংক্রান্ত কঠোর নিয়মাবলী বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো বা প্রশাসনিক কাঠামো বর্তমানে নেই।
বর্তমান মামলার আবেদনকারী আদালতের কাছে দাবি জানিয়েছেন, বর্তমান সুভেন্দু অধিকারী সরকারও যেন হলফনামা দিয়ে স্পষ্ট করে যে, গত কয়েকদিনে রাজ্যে সেই প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো আদৌ তৈরি হয়েছে কি না? যদি কোনো পরিকাঠামোই তৈরি না হয়ে থাকে, তবে আগামী ২৮ মে থেকে তড়িঘড়ি করে এই নিয়ম কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
ঈদের আগে উত্তরপ্রদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত পশু ব্যবসায়ীদের মধ্যে এখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে, যার ফলে পশুর হাট বা মণ্ডিগুলোর চেনা রমরমা ভাব এবার উধাও। কসাইখানা বন্ধ বা পশু পরিবহনে কড়াকড়ির এই সিদ্ধান্তে মাংস ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বহু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এবং গবাদি পশু পালনকারী কৃষকরাও বড়সড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আইনি ও রাজনৈতিক মহলে এখন এই মামলা নিয়ে জোর চর্চা চলছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা আশা করছেন, পবিত্র উৎসবের দিনগুলোয় ধর্মীয় রীতি ও কোরবানি যাতে নির্বিঘ্নে পালন করা যায়, সেজন্য হাইকোর্ট দ্রুত একটি ইতিবাচক ও মানবিক রায় ঘোষণা করবে।
বিষয় : ভারত পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু

বুধবার, ২০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ মে ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গে নবগঠিত সুভেন্দু অধিকারী সরকারের বেশ কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের জেরে রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন উত্তপ্ত। আসন্ন ঈদুল আজহার ঠিক আগে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কসাইখানা (বুচড়খানা) সংক্রান্ত একটি নতুন বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ই নয়, বরং বহু হিন্দু ব্যবসায়ী ও কৃষকও চরম সংকটে পড়েছেন। এই বিজ্ঞপ্তির বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার ওপর দ্রুত শুনানির ইঙ্গিত দিয়েছে আদালত।
পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকার গঠনের পর থেকেই বিভিন্ন জেলায় রাজনৈতিক সহিংসতা ও উত্তেজনার খবর সামনে আসছে। এর মধ্যেই বিজেপির নেতৃত্বাধীন মুখ্যমন্ত্রী সুভেন্দু অধিকারীর সরকার এমন কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যা রাজ্যজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ সরকারের এই পদক্ষেপকে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়-বিরোধী বলে অভিযোগ করছে। অন্যদিকে, পবিত্র ঈদুল আজহার আগে গবাদি পশুর ব্যবসায়ী এবং কৃষকরা চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
সম্প্রতি সন্দেশখালির বিজেপি বিধায়ক রেখা পাত্র একটি পশুবাহী গাড়ি আটকে সেটির সমস্ত গবাদি পশু নামিয়ে দেন। এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হয়। ভিডিওতে রেখা পাত্রকে দাবি করতে দেখা যায় যে, গবাদি পশু কেনাবেচা বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য এখন থেকে পশুর 'জন্ম শংসাপত্র' (Birth Certificate) দেখাতে হবে। বিধায়কের এমন অদ্ভুত ও অবাস্তব দাবির পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা তার তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন।
প্রতিবেশী রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা এই রাজ্যে সুভেন্দু সরকারের নেওয়া কসাইখানা সংক্রান্ত নতুন নোটিফিকেশনটি এবার আদালতের চৌকাঠে পৌঁছেছে। তানবীর খায়ের নামক এক ব্যক্তির দায়ের করা এই জনস্বার্থ মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে জরুরি ভিত্তিতে শুনানির আবেদন জানানো হয়। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে, আদালত এই বিষয়টির সংবেদনশীলতা অনুধাবন করে ইতিবাচক সাড়া দেয় এবং ইঙ্গিত দেয় যে, আগামীকালই (বুধবার) এর চূড়ান্ত শুনানি হতে পারে।
মামলার নথিসূত্রে জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার গত ১৩ মে কসাইখানা বন্ধ ও এর নিয়মনীতি নিয়ে একটি কঠোর বিজ্ঞপ্তি জারি করে, যা আগামী ২৮ মে থেকে রাজ্যজুড়ে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। আবেদনকারীর আইনজীবী আদালতে জানান, এর আগে ঠিক একই ইস্যুতে হওয়া একটি মামলায় তৎকালীন রাজ্য সরকার হলফনামা দিয়ে জানিয়েছিল যে— রাজ্যে কসাইখানা সংক্রান্ত কঠোর নিয়মাবলী বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো বা প্রশাসনিক কাঠামো বর্তমানে নেই।
বর্তমান মামলার আবেদনকারী আদালতের কাছে দাবি জানিয়েছেন, বর্তমান সুভেন্দু অধিকারী সরকারও যেন হলফনামা দিয়ে স্পষ্ট করে যে, গত কয়েকদিনে রাজ্যে সেই প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো আদৌ তৈরি হয়েছে কি না? যদি কোনো পরিকাঠামোই তৈরি না হয়ে থাকে, তবে আগামী ২৮ মে থেকে তড়িঘড়ি করে এই নিয়ম কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
ঈদের আগে উত্তরপ্রদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত পশু ব্যবসায়ীদের মধ্যে এখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে, যার ফলে পশুর হাট বা মণ্ডিগুলোর চেনা রমরমা ভাব এবার উধাও। কসাইখানা বন্ধ বা পশু পরিবহনে কড়াকড়ির এই সিদ্ধান্তে মাংস ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বহু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এবং গবাদি পশু পালনকারী কৃষকরাও বড়সড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আইনি ও রাজনৈতিক মহলে এখন এই মামলা নিয়ে জোর চর্চা চলছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা আশা করছেন, পবিত্র উৎসবের দিনগুলোয় ধর্মীয় রীতি ও কোরবানি যাতে নির্বিঘ্নে পালন করা যায়, সেজন্য হাইকোর্ট দ্রুত একটি ইতিবাচক ও মানবিক রায় ঘোষণা করবে।

আপনার মতামত লিখুন