ভারতে বাবরী মসজিদ, কাশী, মথুরা, সম্ভল এবং আজমীরের পর এবার বিশ্বখ্যাত মুসলিম ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র দারুল উলুম দেওবন্দ এবং লখনৌয়ের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ ও কবরস্থানের ওপর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার দাবি করা হয়েছে। উত্তর প্রদেশের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন এবং উপজাতি সমাজ কর্তৃক উথাপিত এই নতুন দাবিগুলোকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতে মুসলিম ধর্মীয় উপাসনালয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার প্রবণতা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। সাম্প্রতিকতম ঘটনায় উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরে অবস্থিত বিখ্যাত ইসলামিক বিদ্যাপীঠ 'দারুল উলুম দেওবন্দ' এবং লখনৌয়ের মালিহাবাদ এলাকার একটি মসজিদ ও কবরস্থানকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক উস্কে দেওয়া হয়েছে।
দেওবন্দের নিচে ১৪ ফুটের শিব মন্দির থাকার দাবি
'হিন্দু রক্ষক দল'-এর স্থানীয় নেতা ললিত শর্মা সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর ও বিতর্কিত দাবি করেছেন। তার মতে, দেওবন্দ দারুল উলুম মাদ্রাসার ভূগর্ভে ১৪ ফুট গভীরে একটি প্রাচীন শিব মন্দির রয়েছে। বিতর্ক উস্কে দিয়ে শর্মা ঘোষণা করেছেন:
"যদি প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে খননকাজ চালানো হয়, তবেই এর আসল সত্য উন্মোচিত হবে। আমার এই দাবি যদি ভুল প্রমাণিত হয়, তবে আমাকে যেন ফাঁসি দেওয়া হয়।"
ললিত শর্মা এই বিষয়ে জেলা প্রশাসনকে আগামী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত শুরু করার জন্য একটি আল্টিমেটাম দিয়েছেন। তবে নিজের দাবির সপক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ দেখাতে তিনি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, সমস্ত প্রমাণ তিনি সরাসরি আদালতে পেশ করবেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিজের সংগঠনকে আলোচনায় রাখা এবং সস্তা জনপ্রিয়তার উদ্দেশ্যেই তিনি এমন উস্কানিমূলক ও ভিত্তিহীন দাবি করছেন। এই বিষয়ে স্থানীয় পুলিশ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মালিহাবাদ মসজিদ ও কবরস্থানকে 'মহারাজা কংস পাসী'-র কেল্লা দাবি
অন্যদিকে, উত্তর প্রদেশের রাজধানী লখনৌয়ের মালিহাবাদ এলাকাতেও একই ধরনের আরেকটি বিরোধের সূত্রপাত হয়েছে। সেখানকার একটি প্রাচীন মসজিদ এবং সংলগ্ন কবরস্থানকে 'পাসী সমাজ'-এর আরাধ্য রাজা 'মহারাজা কংস পাসী'-র পুরনো কেল্লা বলে দাবি করেছে 'সূরজ পাসী আর্মি' নামক একটি সংগঠন।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, এই স্থানটি প্রাচীনকালে তাদের মহারাজার দুর্গ ছিল এবং সেখানে শিবের উপাসনালয় ছিল। 'লাখান আর্মি পাসী সমাজ' এবং 'সূরজ পাসী আর্মি' যৌথভাবে ঘোষণা করেছে যে, তারা অযোধ্যা, কাশী, মথুরা ও সম্ভলের মতো এই বিষয়টি নিয়েও আদালতে দ্বারস্থ হবে। এই দাবিকে কেন্দ্র করে সমগ্র হিন্দু সমাজকে জাগ্রত করতে উত্তর প্রদেশ জুড়ে একটি বড় ধরনের আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর আশঙ্কায় উত্তর প্রদেশ পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কবরস্থান ও মসজিদকে নিজেদের কেল্লা দাবি করা পাসী সমাজের বেশ কয়েকজন নেতা ও কর্মীকে পুলিশ ইতিমধ্যে নজরবন্দি (হাউস অ্যারেস্ট) করেছে। মুসলিম কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ এই ধরণের ধারাবাহিক দাবিকে ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের সুপরিকল্পিত চেষ্টা বলে অভিহিত করেছেন।
ভারতে ১৯৯১ সালের 'উপাসনালয় রক্ষা আইনে কি আছে?
ভারতে ১৯৯১ সালের 'উপাসনালয় রক্ষা আইন' (Places of Worship Act, 1991) অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার সময়ে যেকোনো ধর্মীয় উপাসনালয় যে অবস্থায় ছিল, তার ধর্মীয় চরিত্র পরিবর্তন করা নিষিদ্ধ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন নিম্ন আদালত ও সুপ্রিম কোর্টের কিছু পর্যবেক্ষণকে কেন্দ্র করে এই আইনের কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যার ফলে একের পর এক মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনার প্রাচীন ইতিহাস খতিয়ে দেখার আইনি আবেদন জমা পড়ছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো এই প্রবণতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, কোনো সুনির্দিষ্ট ও অকাট্য ঐতিহাসিক প্রমাণ ছাড়াই একের পর এক ঐতিহাসিক স্থাপনার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা সামাজিক মেরুকরণকে তীব্র করছে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অধিকার ও সুরক্ষাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।
ভারতের উত্তরপ্রদেশে গত কয়েক বছরে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর ধর্মীয় চরিত্র পরিবর্তনের দাবি এক নতুন রূপ নিয়েছে। অযোধ্যার বাবরি মসজিদ মামলার রায়ের পর, বারানসির জ্ঞানবাপী মসজিদ এবং মথুরার শাহি ইদগাহ মসজিদ নিয়ে আইনি সমীক্ষা (ASI Survey) চলছে। সম্প্রতি সাম্ভালের জামে মসজিদ এবং আজমির শরিফ দরগাহ নিয়েও একই ধরনের দাবি ওঠার পর দেওবন্দের এই ঘটনাটি সামনে এলো।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেকোনো ঐতিহাসিক দাবি উত্থাপনের ক্ষেত্রে আইনি কাঠামো ও অকাট্য প্রমাণের উপস্থিতি আবশ্যক। গুজব বা সস্তা প্রচারণামূলক এজেন্ডা রুখতে প্রশাসন ও বিচারবিভাগের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং নাগরিক সমাজের দায়িত্বশীল আচরণই কেবল সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করতে পারে।
বিষয় : ভারত

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ মে ২০২৬
ভারতে বাবরী মসজিদ, কাশী, মথুরা, সম্ভল এবং আজমীরের পর এবার বিশ্বখ্যাত মুসলিম ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র দারুল উলুম দেওবন্দ এবং লখনৌয়ের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ ও কবরস্থানের ওপর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার দাবি করা হয়েছে। উত্তর প্রদেশের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন এবং উপজাতি সমাজ কর্তৃক উথাপিত এই নতুন দাবিগুলোকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতে মুসলিম ধর্মীয় উপাসনালয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার প্রবণতা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। সাম্প্রতিকতম ঘটনায় উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরে অবস্থিত বিখ্যাত ইসলামিক বিদ্যাপীঠ 'দারুল উলুম দেওবন্দ' এবং লখনৌয়ের মালিহাবাদ এলাকার একটি মসজিদ ও কবরস্থানকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক উস্কে দেওয়া হয়েছে।
দেওবন্দের নিচে ১৪ ফুটের শিব মন্দির থাকার দাবি
'হিন্দু রক্ষক দল'-এর স্থানীয় নেতা ললিত শর্মা সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর ও বিতর্কিত দাবি করেছেন। তার মতে, দেওবন্দ দারুল উলুম মাদ্রাসার ভূগর্ভে ১৪ ফুট গভীরে একটি প্রাচীন শিব মন্দির রয়েছে। বিতর্ক উস্কে দিয়ে শর্মা ঘোষণা করেছেন:
"যদি প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে খননকাজ চালানো হয়, তবেই এর আসল সত্য উন্মোচিত হবে। আমার এই দাবি যদি ভুল প্রমাণিত হয়, তবে আমাকে যেন ফাঁসি দেওয়া হয়।"
ললিত শর্মা এই বিষয়ে জেলা প্রশাসনকে আগামী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত শুরু করার জন্য একটি আল্টিমেটাম দিয়েছেন। তবে নিজের দাবির সপক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ দেখাতে তিনি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, সমস্ত প্রমাণ তিনি সরাসরি আদালতে পেশ করবেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিজের সংগঠনকে আলোচনায় রাখা এবং সস্তা জনপ্রিয়তার উদ্দেশ্যেই তিনি এমন উস্কানিমূলক ও ভিত্তিহীন দাবি করছেন। এই বিষয়ে স্থানীয় পুলিশ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মালিহাবাদ মসজিদ ও কবরস্থানকে 'মহারাজা কংস পাসী'-র কেল্লা দাবি
অন্যদিকে, উত্তর প্রদেশের রাজধানী লখনৌয়ের মালিহাবাদ এলাকাতেও একই ধরনের আরেকটি বিরোধের সূত্রপাত হয়েছে। সেখানকার একটি প্রাচীন মসজিদ এবং সংলগ্ন কবরস্থানকে 'পাসী সমাজ'-এর আরাধ্য রাজা 'মহারাজা কংস পাসী'-র পুরনো কেল্লা বলে দাবি করেছে 'সূরজ পাসী আর্মি' নামক একটি সংগঠন।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, এই স্থানটি প্রাচীনকালে তাদের মহারাজার দুর্গ ছিল এবং সেখানে শিবের উপাসনালয় ছিল। 'লাখান আর্মি পাসী সমাজ' এবং 'সূরজ পাসী আর্মি' যৌথভাবে ঘোষণা করেছে যে, তারা অযোধ্যা, কাশী, মথুরা ও সম্ভলের মতো এই বিষয়টি নিয়েও আদালতে দ্বারস্থ হবে। এই দাবিকে কেন্দ্র করে সমগ্র হিন্দু সমাজকে জাগ্রত করতে উত্তর প্রদেশ জুড়ে একটি বড় ধরনের আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর আশঙ্কায় উত্তর প্রদেশ পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কবরস্থান ও মসজিদকে নিজেদের কেল্লা দাবি করা পাসী সমাজের বেশ কয়েকজন নেতা ও কর্মীকে পুলিশ ইতিমধ্যে নজরবন্দি (হাউস অ্যারেস্ট) করেছে। মুসলিম কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ এই ধরণের ধারাবাহিক দাবিকে ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের সুপরিকল্পিত চেষ্টা বলে অভিহিত করেছেন।
ভারতে ১৯৯১ সালের 'উপাসনালয় রক্ষা আইনে কি আছে?
ভারতে ১৯৯১ সালের 'উপাসনালয় রক্ষা আইন' (Places of Worship Act, 1991) অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার সময়ে যেকোনো ধর্মীয় উপাসনালয় যে অবস্থায় ছিল, তার ধর্মীয় চরিত্র পরিবর্তন করা নিষিদ্ধ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন নিম্ন আদালত ও সুপ্রিম কোর্টের কিছু পর্যবেক্ষণকে কেন্দ্র করে এই আইনের কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যার ফলে একের পর এক মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনার প্রাচীন ইতিহাস খতিয়ে দেখার আইনি আবেদন জমা পড়ছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো এই প্রবণতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, কোনো সুনির্দিষ্ট ও অকাট্য ঐতিহাসিক প্রমাণ ছাড়াই একের পর এক ঐতিহাসিক স্থাপনার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা সামাজিক মেরুকরণকে তীব্র করছে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অধিকার ও সুরক্ষাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।
ভারতের উত্তরপ্রদেশে গত কয়েক বছরে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর ধর্মীয় চরিত্র পরিবর্তনের দাবি এক নতুন রূপ নিয়েছে। অযোধ্যার বাবরি মসজিদ মামলার রায়ের পর, বারানসির জ্ঞানবাপী মসজিদ এবং মথুরার শাহি ইদগাহ মসজিদ নিয়ে আইনি সমীক্ষা (ASI Survey) চলছে। সম্প্রতি সাম্ভালের জামে মসজিদ এবং আজমির শরিফ দরগাহ নিয়েও একই ধরনের দাবি ওঠার পর দেওবন্দের এই ঘটনাটি সামনে এলো।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেকোনো ঐতিহাসিক দাবি উত্থাপনের ক্ষেত্রে আইনি কাঠামো ও অকাট্য প্রমাণের উপস্থিতি আবশ্যক। গুজব বা সস্তা প্রচারণামূলক এজেন্ডা রুখতে প্রশাসন ও বিচারবিভাগের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং নাগরিক সমাজের দায়িত্বশীল আচরণই কেবল সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন