জাপানে সাম্প্রতিক সময়ে দৃশ্যমান হওয়া মুসলিমবিরোধী ও অভিবাসীবিদ্বেষী তৎপরতাগুলো স্থানীয় জাপানি সমাজের স্বাভাবিক কোনো প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এগুলো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা ও বহিরাগত শক্তির ইন্ধনে পরিচালিত হচ্ছে। টোকিও জামে মসজিদ ইনস্টিটিউটের পরিচালনা পর্ষদের বিশিষ্ট সদস্য আহমেদ নাওকি মায়েনো এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই দাবি করেছেন। তিনি জানান, জাপানের সাধারণ মানুষের মনে মুসলমানদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ নেই, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী দেশটির বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।
জাপানে ইসলাম এবং মুসলমানদের ইতিহাস প্রায় ১২০ বছরের পুরোনো। ১৮৯০ সালে অটোমান সাম্রাজ্যের যুদ্ধজাহাজ 'এরতুগরুল' জাপানের উপকূলে ডুবে যাওয়ার পর থেকে তুরস্ক ও জাপানের মধ্যে যে ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের সূচনা হয়েছিল, তা আজও অটুট রয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে জাপানি জনগণ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্ক সবসময়ই অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বিচ্ছিন্ন মুসলিমবিরোধী তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা জাপানের মূল সংস্কৃতির অংশ নয়।
টোকিও জামে মসজিদ ইনস্টিটিউটের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং বিশিষ্ট জাপানি মুসলিম ব্যক্তিত্ব আহমেদ নাওকি মায়েনো দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। একটি ঐতিহ্যবাহী জাপানি পরিবারে বড় হওয়া মায়েনো মাত্র ১৮ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন।
সামাজিক মাধ্যমের অপপ্রচার বনাম বাস্তব চিত্র
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দাবি করা হয় যে, জাপান হচ্ছে "সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ইসলামের দেশ"। এই বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে মায়েনো বলেন, "অনেকে এই ধরনের খবর দেখে ভাবেন যে হাজার হাজার জাপানি নাগরিক ইসলামে দীক্ষিত হচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিদেশ থেকে আসা মুসলিম অভিবাসীদের কারণেই মূলত জাপানে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ছে। স্থানীয় জাপানিদের ইসলাম গ্রহণের হার অত্যন্ত ধীর।"
তিনি জানান, মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে দেশটিতে মসজিদ ও নামাজের স্থানের সংখ্যা বাড়ছে, যার ফলে স্থানীয়দের সাথে যোগাযোগও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে গত বছরের (২০২৫) মাঝামাঝি সময় থেকে আমেরিকার কিছু মহলের ইন্ধনে এবং পশ্চিমা প্রভাবে জাপানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কিছু নেতিবাচক ও মুসলিমবিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধার চেষ্টা করছে।
মায়েনো জোর দিয়ে বলেন, "সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দিকে তাকালে মনে হবে এই বিদ্বেষ হয়তো প্রকট এবং দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু বাস্তব দৈনন্দিন জীবনে আপনি কোনো ধরনের জেনোফোবিয়া (বিদেশিভীতি) বা ইসলামোফোবিয়ার অস্তিত্ব খুঁজে পাবেন না। জাপানিরা স্বভাবগতভাবে ধর্মবিদ্বেষী নয়। তুরস্ক বা মধ্যপ্রাচ্যে ঘুরতে গিয়ে জাপানি পর্যটকরা বিপুল আগ্রহ নিয়ে ঐতিহাসিক মসজিদ ও ধর্মীয় স্থানগুলো পরিদর্শন করেন। তারা ধর্মকে ঘৃণা করলে এমনটি করতেন না।"
কৃত্রিম বিক্ষোভ এবং জায়নবাদী ও পশ্চিমা ইন্ধন
জাপানের বিভিন্ন মসজিদ ও মুসলিম সেন্টারের সামনে যেসব বিক্ষোভ প্রদর্শনের চেষ্টা করা হয়েছে, সেগুলোর পেছনের চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেছেন মায়েনো। তিনি বলেন, "আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিক্ষোভগুলোতে যারা অংশ নেয়, তারা সেই শহরের স্থানীয় বাসিন্দা নন। তারা বাইরে থেকে এসে জড়ো হয়। এখান থেকেই পরিষ্কার বোঝা যায় যে, এই আন্দোলনগুলো কতটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং কৃত্রিমভাবে পরিচালিত।"
মায়েনো আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, "জাপানে মুসলিম ও বিদেশিদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক আবহ তৈরি করতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা খুবই সীমিত। আমাদের ধারণা, এদের মধ্যে কিছু ব্যক্তি ও সংস্থাকে সরাসরি জায়নবাদী সংগঠনগুলো অর্থায়ন করছে।" তিনি আরও জানান, এই উস্কানিদাতারা ছদ্মবেশে আইনজীবীদের মাধ্যমে মুসলিম প্রতিনিধিদের কাছে আলোচনার চিঠি পাঠায়। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য কোনো সংলাপ নয়, বরং তারা বিশ্বকে দেখাতে চায় যে 'আমরা মুসলমানদের সাথে আলোচনা করেছি কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি'—এমন একটি ভুয়া ন্যারেটিভ তৈরি করা।
উস্কানিদাতারা নিজেদের "জাপানের রক্ষক ও দেশপ্রেমিক" হিসেবে দাবি করলেও মায়েনো তাদের "ভুয়া দেশপ্রেমিক" বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, "জাপানে বসবাসরত বা জাপানকে ভালোবাসে দাবি করা কিছু পশ্চিমা অমুসলিমও এই ইসলামোফোবিয়া ছড়ানোর পেছনে দায়ী। তারা যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স বা জার্মানির উদাহরণ টেনে জাপানিদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করে এবং বলে যে—'অভিবাসীদের সুযোগ দিলে মুসলমানরা কীভাবে দেশ দখল করে, তা ইউরোপের দিকে তাকালেই দেখতে পাবেন'।"
জাপানের অর্থনীতির ক্ষতি করার ষড়যন্ত্র
এই মুসলিমবিরোধী প্রচারণা শুধু মুসলমানদেরই ক্ষতি করছে না, বরং জাপানের জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনীতির ওপর আঘাত হানছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপান মুসলিম দেশগুলো থেকে আসা পর্যটকদের মাধ্যমে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সুবিধা লাভ করেছে। দেশটিতে হালাল খাতেরও দ্রুত বিকাশ ঘটছে।
মায়েনো সতর্ক করে বলেন, "এই উগ্রবাদীরা বিশ্ব দরবারে জাপানের এমন একটি ভাবমূর্তি তৈরি করছে, যেন জাপান মুসলমানদের বিরোধী। এর ফলে মুসলিম পর্যটকদের আগমন কমে যেতে পারে, যা সরাসরি জাপানের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।"
তিনি নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, তিনি চিবা অঞ্চলের ইচিকাওয়া শহরে বাস করেন। সেখানে গত ৩০ বছর ধরে স্থানীয় পৌরসভা মুসলমানদের ঈদের নামাজের জন্য পার্ক ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে আসছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক এই উস্কানিমূলক তৎপরতার কারণে সেই দীর্ঘদিনের নিয়মে জটিলতা তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে জাপানের মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার মধ্যে রয়েছে নতুন মসজিদ নির্মাণ এবং স্থায়ী কবরস্থানের জন্য জমি নিশ্চিত করা। তবে মায়েনো আশাবাদী যে, জাপানি সমাজে এখনও বহু বিবেকবান এবং বুঝদার মানুষ রয়েছেন যারা এই ষড়যন্ত্র রুখে দেবেন।
সত্যের সন্ধান ও ইসলাম গ্রহণ
নিজের ইসলাম গ্রহণের গল্প শেয়ার করতে গিয়ে আহমেদ নাওকি মায়েনো বলেন, ১৩ বছর বয়স থেকেই তার মনে সত্যের সন্ধান জাগে। একটি সাধারণ জাপানি পরিবারে বড় হওয়া মায়েনো ছোটবেলা থেকেই ভাবতেন, "আমি কোথা থেকে এসেছি? মৃত্যুর পর কোথায় যাব? কেন বেঁচে আছি?"
একপর্যায়ে তিনি বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন, কিন্তু সন্ন্যাস জীবনের কঠোর নিয়মাবলী মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পরিপন্থী মনে হওয়ায় তিনি তা ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে এক্সচেঞ্জ স্টুডেন্ট হিসেবে পড়ার সময় একটি মিশরীয় মুসলিম পরিবারের সান্নিধ্যে এসে তিনি ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য উপলব্ধি করেন এবং ১৯৯৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন।
মায়েনো মনে করেন, জাপানি সংস্কৃতিতে ধর্ম একটি ব্যক্তিগত বিষয়। তাই জনসমক্ষে ধর্মীয় আচার প্রদর্শন অনেক সময় জাপানিদের জন্য নতুন বা অস্বস্তিকর হতে পারে। এজন্য তিনি জাপানে বসবাসরত মুসলিমদেরও স্থানীয় সংস্কৃতি এবং সামাজিক শিষ্টাচার মেনে চলার আহ্বান জানান। টোকিও জামে মসজিদের এই কর্মকর্তা আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, তুরস্ক এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে জাপানের ঐতিহাসিক সম্পর্ক আগামীতেও অটুট থাকবে।
বিষয় : জাপান

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬
জাপানে সাম্প্রতিক সময়ে দৃশ্যমান হওয়া মুসলিমবিরোধী ও অভিবাসীবিদ্বেষী তৎপরতাগুলো স্থানীয় জাপানি সমাজের স্বাভাবিক কোনো প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এগুলো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা ও বহিরাগত শক্তির ইন্ধনে পরিচালিত হচ্ছে। টোকিও জামে মসজিদ ইনস্টিটিউটের পরিচালনা পর্ষদের বিশিষ্ট সদস্য আহমেদ নাওকি মায়েনো এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই দাবি করেছেন। তিনি জানান, জাপানের সাধারণ মানুষের মনে মুসলমানদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ নেই, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী দেশটির বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।
জাপানে ইসলাম এবং মুসলমানদের ইতিহাস প্রায় ১২০ বছরের পুরোনো। ১৮৯০ সালে অটোমান সাম্রাজ্যের যুদ্ধজাহাজ 'এরতুগরুল' জাপানের উপকূলে ডুবে যাওয়ার পর থেকে তুরস্ক ও জাপানের মধ্যে যে ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের সূচনা হয়েছিল, তা আজও অটুট রয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে জাপানি জনগণ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্ক সবসময়ই অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বিচ্ছিন্ন মুসলিমবিরোধী তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা জাপানের মূল সংস্কৃতির অংশ নয়।
টোকিও জামে মসজিদ ইনস্টিটিউটের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং বিশিষ্ট জাপানি মুসলিম ব্যক্তিত্ব আহমেদ নাওকি মায়েনো দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। একটি ঐতিহ্যবাহী জাপানি পরিবারে বড় হওয়া মায়েনো মাত্র ১৮ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন।
সামাজিক মাধ্যমের অপপ্রচার বনাম বাস্তব চিত্র
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দাবি করা হয় যে, জাপান হচ্ছে "সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ইসলামের দেশ"। এই বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে মায়েনো বলেন, "অনেকে এই ধরনের খবর দেখে ভাবেন যে হাজার হাজার জাপানি নাগরিক ইসলামে দীক্ষিত হচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিদেশ থেকে আসা মুসলিম অভিবাসীদের কারণেই মূলত জাপানে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ছে। স্থানীয় জাপানিদের ইসলাম গ্রহণের হার অত্যন্ত ধীর।"
তিনি জানান, মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে দেশটিতে মসজিদ ও নামাজের স্থানের সংখ্যা বাড়ছে, যার ফলে স্থানীয়দের সাথে যোগাযোগও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে গত বছরের (২০২৫) মাঝামাঝি সময় থেকে আমেরিকার কিছু মহলের ইন্ধনে এবং পশ্চিমা প্রভাবে জাপানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কিছু নেতিবাচক ও মুসলিমবিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধার চেষ্টা করছে।
মায়েনো জোর দিয়ে বলেন, "সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দিকে তাকালে মনে হবে এই বিদ্বেষ হয়তো প্রকট এবং দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু বাস্তব দৈনন্দিন জীবনে আপনি কোনো ধরনের জেনোফোবিয়া (বিদেশিভীতি) বা ইসলামোফোবিয়ার অস্তিত্ব খুঁজে পাবেন না। জাপানিরা স্বভাবগতভাবে ধর্মবিদ্বেষী নয়। তুরস্ক বা মধ্যপ্রাচ্যে ঘুরতে গিয়ে জাপানি পর্যটকরা বিপুল আগ্রহ নিয়ে ঐতিহাসিক মসজিদ ও ধর্মীয় স্থানগুলো পরিদর্শন করেন। তারা ধর্মকে ঘৃণা করলে এমনটি করতেন না।"
কৃত্রিম বিক্ষোভ এবং জায়নবাদী ও পশ্চিমা ইন্ধন
জাপানের বিভিন্ন মসজিদ ও মুসলিম সেন্টারের সামনে যেসব বিক্ষোভ প্রদর্শনের চেষ্টা করা হয়েছে, সেগুলোর পেছনের চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেছেন মায়েনো। তিনি বলেন, "আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিক্ষোভগুলোতে যারা অংশ নেয়, তারা সেই শহরের স্থানীয় বাসিন্দা নন। তারা বাইরে থেকে এসে জড়ো হয়। এখান থেকেই পরিষ্কার বোঝা যায় যে, এই আন্দোলনগুলো কতটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং কৃত্রিমভাবে পরিচালিত।"
মায়েনো আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, "জাপানে মুসলিম ও বিদেশিদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক আবহ তৈরি করতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা খুবই সীমিত। আমাদের ধারণা, এদের মধ্যে কিছু ব্যক্তি ও সংস্থাকে সরাসরি জায়নবাদী সংগঠনগুলো অর্থায়ন করছে।" তিনি আরও জানান, এই উস্কানিদাতারা ছদ্মবেশে আইনজীবীদের মাধ্যমে মুসলিম প্রতিনিধিদের কাছে আলোচনার চিঠি পাঠায়। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য কোনো সংলাপ নয়, বরং তারা বিশ্বকে দেখাতে চায় যে 'আমরা মুসলমানদের সাথে আলোচনা করেছি কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি'—এমন একটি ভুয়া ন্যারেটিভ তৈরি করা।
উস্কানিদাতারা নিজেদের "জাপানের রক্ষক ও দেশপ্রেমিক" হিসেবে দাবি করলেও মায়েনো তাদের "ভুয়া দেশপ্রেমিক" বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, "জাপানে বসবাসরত বা জাপানকে ভালোবাসে দাবি করা কিছু পশ্চিমা অমুসলিমও এই ইসলামোফোবিয়া ছড়ানোর পেছনে দায়ী। তারা যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স বা জার্মানির উদাহরণ টেনে জাপানিদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করে এবং বলে যে—'অভিবাসীদের সুযোগ দিলে মুসলমানরা কীভাবে দেশ দখল করে, তা ইউরোপের দিকে তাকালেই দেখতে পাবেন'।"
জাপানের অর্থনীতির ক্ষতি করার ষড়যন্ত্র
এই মুসলিমবিরোধী প্রচারণা শুধু মুসলমানদেরই ক্ষতি করছে না, বরং জাপানের জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনীতির ওপর আঘাত হানছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপান মুসলিম দেশগুলো থেকে আসা পর্যটকদের মাধ্যমে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সুবিধা লাভ করেছে। দেশটিতে হালাল খাতেরও দ্রুত বিকাশ ঘটছে।
মায়েনো সতর্ক করে বলেন, "এই উগ্রবাদীরা বিশ্ব দরবারে জাপানের এমন একটি ভাবমূর্তি তৈরি করছে, যেন জাপান মুসলমানদের বিরোধী। এর ফলে মুসলিম পর্যটকদের আগমন কমে যেতে পারে, যা সরাসরি জাপানের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।"
তিনি নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, তিনি চিবা অঞ্চলের ইচিকাওয়া শহরে বাস করেন। সেখানে গত ৩০ বছর ধরে স্থানীয় পৌরসভা মুসলমানদের ঈদের নামাজের জন্য পার্ক ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে আসছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক এই উস্কানিমূলক তৎপরতার কারণে সেই দীর্ঘদিনের নিয়মে জটিলতা তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে জাপানের মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার মধ্যে রয়েছে নতুন মসজিদ নির্মাণ এবং স্থায়ী কবরস্থানের জন্য জমি নিশ্চিত করা। তবে মায়েনো আশাবাদী যে, জাপানি সমাজে এখনও বহু বিবেকবান এবং বুঝদার মানুষ রয়েছেন যারা এই ষড়যন্ত্র রুখে দেবেন।
সত্যের সন্ধান ও ইসলাম গ্রহণ
নিজের ইসলাম গ্রহণের গল্প শেয়ার করতে গিয়ে আহমেদ নাওকি মায়েনো বলেন, ১৩ বছর বয়স থেকেই তার মনে সত্যের সন্ধান জাগে। একটি সাধারণ জাপানি পরিবারে বড় হওয়া মায়েনো ছোটবেলা থেকেই ভাবতেন, "আমি কোথা থেকে এসেছি? মৃত্যুর পর কোথায় যাব? কেন বেঁচে আছি?"
একপর্যায়ে তিনি বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন, কিন্তু সন্ন্যাস জীবনের কঠোর নিয়মাবলী মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পরিপন্থী মনে হওয়ায় তিনি তা ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে এক্সচেঞ্জ স্টুডেন্ট হিসেবে পড়ার সময় একটি মিশরীয় মুসলিম পরিবারের সান্নিধ্যে এসে তিনি ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য উপলব্ধি করেন এবং ১৯৯৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন।
মায়েনো মনে করেন, জাপানি সংস্কৃতিতে ধর্ম একটি ব্যক্তিগত বিষয়। তাই জনসমক্ষে ধর্মীয় আচার প্রদর্শন অনেক সময় জাপানিদের জন্য নতুন বা অস্বস্তিকর হতে পারে। এজন্য তিনি জাপানে বসবাসরত মুসলিমদেরও স্থানীয় সংস্কৃতি এবং সামাজিক শিষ্টাচার মেনে চলার আহ্বান জানান। টোকিও জামে মসজিদের এই কর্মকর্তা আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, তুরস্ক এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে জাপানের ঐতিহাসিক সম্পর্ক আগামীতেও অটুট থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন