ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইহুদিবাদী ইসরায়েলের বর্বর ও নৃশংস গণহত্যার ১০০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে দখলদারদের অব্যাহত হামলায় সবচেয়ে মারাত্মক ও অমানবিক মূল্যের সম্মুখীন হয়েছেন গাজার নারী ও কন্যারা। নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, পঙ্গুত্ব, স্বজন হারানোর বেদনা, বারবার বাস্তুচ্যুতি এবং ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে গাজার নারীরা এখন বিধবা, মাতৃহীন বা সহায় সম্বলহীন যাযাবর জীবনে বাধ্য হয়েছেন। জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা (UN Women) এবং গাজার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
গাজা উপত্যকায় জায়নবাদী ইসরায়েলি বাহিনীর পৈশাচিক আগ্রাসন ও জাতিগত নিধনযজ্ঞের ১০০০তম দিনে ফিলিস্তিনি নারীদের জীবন এক জীবন্ত জাহান্নামে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ গণহত্যায় গাজার সমাজ ও পরিবার কাঠামোর মেরুদণ্ড নারীদের ওপর নেমে এসেছে অবর্ণনীয় নির্যাতন।
হত্যাকাণ্ড ও চিরতরে পঙ্গুত্ব
জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থার (UN Women) প্রকাশিত 'কস্ট অব ওয়ার ইন গাজা অন ওমেন অ্যান্ড গার্লস' শীর্ষক এক বিশেষ বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত গাজায় অন্তত ৩৮ হাজার নারী ও কন্যা শিশুকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। এর মধ্যে ২২ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক নারী এবং ১৬ হাজার কন্যা শিশু রয়েছে। গড়ে প্রতিদিন অন্তত ৪৭ জন নারী ও শিশু ইসরায়েলি বোমায় প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া প্রায় ১১ হাজার নারী ও কন্যা শিশু গুরুতর জখম হয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, যা তাদের সারা জীবনের জন্য প্রতিবন্ধকতায় রূপ নিয়েছে।
এদিকে, গাজার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, নিহত নারীদের মধ্যে ৯ হাজারেরও বেশি ছিলেন মা। ফলে গাজায় হাজার হাজার শিশু আজ সম্পূর্ণ মাতৃহীন এবং অভিভাবকহীন অবস্থায় মানবেতর দিন কাটাচ্ছে।
বিধবা ও সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী
পুরুষদের ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের ফলে গাজায় বিধবাদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। যুদ্ধের আগে গাজায় বিধবা নারীর সংখ্যা যেখানে ২২ হাজার ৫৯৬ ছিল, তা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ২২৪ জনে। যার মধ্যে ৪১ শতাংশ বিধবা কেবল গাজা সিটিতে এবং ২২.৫ শতাংশ উত্তর গাজায় বসবাস করছেন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই বিধবাদের মধ্যে ৬৪ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে, অর্থাৎ কর্মক্ষম বয়সে। কর্মসংস্থান ধ্বংস হওয়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দামের কারণে এই তরুণী মায়েরা তাদের এতিম সন্তানদের মুখে দুবেলা অন্ন তুলে দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। অন্যদিকে, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও বৃদ্ধা বিধবাদের জন্য জরুরি আইনি ও মানসিক সমর্থন প্রয়োজন হলেও তা মিলছে না।
বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক মর্যাদাহীন জীবন
ইসরায়েলের বিমান হামলা ও ঘরবাড়ি ধ্বংসের কারণে লাখো নারী ঘরছাড়া হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের ওপর তাবু খাটিয়ে, স্কুলের বারান্দায়, হাসপাতালের প্রাঙ্গণে কিংবা রাস্তার ধারে চরম প্রতিকূল আবহাওয়ায় তারা দিন কাটাচ্ছেন। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে নেই কোনো গোপনীয়তা, নেই বিশুদ্ধ পানি বা স্যানিটেশন ব্যবস্থা। তীব্র শীতে হিমায়িত হাওয়া আর গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে নারীদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এমনকি নারীদের অতি প্রয়োজনীয় স্যানিটারি সামগ্রীর তীব্র সংকট ও আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে তারা কাপড়ের টুকরো বা জরাজীর্ণ পোশাক ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন, যা নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
১২ হাজার গর্ভপাত ও ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যখাত
গাজার চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ায় অন্তঃসত্ত্বা নারীদের কষ্ট বহুগুণ বেড়েছে। তীব্র পুষ্টিহীনতা, অনাহার এবং স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ার কারণে এ পর্যন্ত গাজায় ১২ হাজারেরও বেশি গর্ভপাতের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। অনেক নারী ধাত্রী বা পর্যাপ্ত জীবাণুমুক্তকরণ সরঞ্জাম ছাড়াই তাবুর ভেতর সন্তান প্রসব করছেন, যা মা ও নবজাতক উভয়ের জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
এছাড়া স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত নারীরা অবরুদ্ধ গাজায় কোনো প্রাথমিক স্ক্রিনিং বা থেরাপির সুযোগ পাচ্ছেন না। যুদ্ধের আগে বা পরে যাদের ক্যান্সার ধরা পড়েছে, তারা ওষুধ ও কেমোথেরাপির অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছেন।
ফিলিস্তিনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই ১০০০ দিনের গণহত্যায় গাজার অবকাঠামোর ৯০ শতাংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। ফিলিস্তিনি নারীদের এই দীর্ঘস্থায়ী কান্না ও ট্র্যাজেডি অবসানে বিশ্ব সম্প্রদায়ের অনতিবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ এবং ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা এখন সময়ের দাবি।
বিষয় : মানবাধিকার গাজা ফিলিস্তিন

শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুলাই ২০২৬
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইহুদিবাদী ইসরায়েলের বর্বর ও নৃশংস গণহত্যার ১০০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে দখলদারদের অব্যাহত হামলায় সবচেয়ে মারাত্মক ও অমানবিক মূল্যের সম্মুখীন হয়েছেন গাজার নারী ও কন্যারা। নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, পঙ্গুত্ব, স্বজন হারানোর বেদনা, বারবার বাস্তুচ্যুতি এবং ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে গাজার নারীরা এখন বিধবা, মাতৃহীন বা সহায় সম্বলহীন যাযাবর জীবনে বাধ্য হয়েছেন। জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা (UN Women) এবং গাজার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
গাজা উপত্যকায় জায়নবাদী ইসরায়েলি বাহিনীর পৈশাচিক আগ্রাসন ও জাতিগত নিধনযজ্ঞের ১০০০তম দিনে ফিলিস্তিনি নারীদের জীবন এক জীবন্ত জাহান্নামে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ গণহত্যায় গাজার সমাজ ও পরিবার কাঠামোর মেরুদণ্ড নারীদের ওপর নেমে এসেছে অবর্ণনীয় নির্যাতন।
হত্যাকাণ্ড ও চিরতরে পঙ্গুত্ব
জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থার (UN Women) প্রকাশিত 'কস্ট অব ওয়ার ইন গাজা অন ওমেন অ্যান্ড গার্লস' শীর্ষক এক বিশেষ বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত গাজায় অন্তত ৩৮ হাজার নারী ও কন্যা শিশুকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। এর মধ্যে ২২ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক নারী এবং ১৬ হাজার কন্যা শিশু রয়েছে। গড়ে প্রতিদিন অন্তত ৪৭ জন নারী ও শিশু ইসরায়েলি বোমায় প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া প্রায় ১১ হাজার নারী ও কন্যা শিশু গুরুতর জখম হয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, যা তাদের সারা জীবনের জন্য প্রতিবন্ধকতায় রূপ নিয়েছে।
এদিকে, গাজার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, নিহত নারীদের মধ্যে ৯ হাজারেরও বেশি ছিলেন মা। ফলে গাজায় হাজার হাজার শিশু আজ সম্পূর্ণ মাতৃহীন এবং অভিভাবকহীন অবস্থায় মানবেতর দিন কাটাচ্ছে।
বিধবা ও সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী
পুরুষদের ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের ফলে গাজায় বিধবাদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। যুদ্ধের আগে গাজায় বিধবা নারীর সংখ্যা যেখানে ২২ হাজার ৫৯৬ ছিল, তা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ২২৪ জনে। যার মধ্যে ৪১ শতাংশ বিধবা কেবল গাজা সিটিতে এবং ২২.৫ শতাংশ উত্তর গাজায় বসবাস করছেন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই বিধবাদের মধ্যে ৬৪ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে, অর্থাৎ কর্মক্ষম বয়সে। কর্মসংস্থান ধ্বংস হওয়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দামের কারণে এই তরুণী মায়েরা তাদের এতিম সন্তানদের মুখে দুবেলা অন্ন তুলে দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। অন্যদিকে, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও বৃদ্ধা বিধবাদের জন্য জরুরি আইনি ও মানসিক সমর্থন প্রয়োজন হলেও তা মিলছে না।
বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক মর্যাদাহীন জীবন
ইসরায়েলের বিমান হামলা ও ঘরবাড়ি ধ্বংসের কারণে লাখো নারী ঘরছাড়া হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের ওপর তাবু খাটিয়ে, স্কুলের বারান্দায়, হাসপাতালের প্রাঙ্গণে কিংবা রাস্তার ধারে চরম প্রতিকূল আবহাওয়ায় তারা দিন কাটাচ্ছেন। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে নেই কোনো গোপনীয়তা, নেই বিশুদ্ধ পানি বা স্যানিটেশন ব্যবস্থা। তীব্র শীতে হিমায়িত হাওয়া আর গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে নারীদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এমনকি নারীদের অতি প্রয়োজনীয় স্যানিটারি সামগ্রীর তীব্র সংকট ও আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে তারা কাপড়ের টুকরো বা জরাজীর্ণ পোশাক ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন, যা নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
১২ হাজার গর্ভপাত ও ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যখাত
গাজার চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ায় অন্তঃসত্ত্বা নারীদের কষ্ট বহুগুণ বেড়েছে। তীব্র পুষ্টিহীনতা, অনাহার এবং স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ার কারণে এ পর্যন্ত গাজায় ১২ হাজারেরও বেশি গর্ভপাতের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। অনেক নারী ধাত্রী বা পর্যাপ্ত জীবাণুমুক্তকরণ সরঞ্জাম ছাড়াই তাবুর ভেতর সন্তান প্রসব করছেন, যা মা ও নবজাতক উভয়ের জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
এছাড়া স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত নারীরা অবরুদ্ধ গাজায় কোনো প্রাথমিক স্ক্রিনিং বা থেরাপির সুযোগ পাচ্ছেন না। যুদ্ধের আগে বা পরে যাদের ক্যান্সার ধরা পড়েছে, তারা ওষুধ ও কেমোথেরাপির অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছেন।
ফিলিস্তিনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই ১০০০ দিনের গণহত্যায় গাজার অবকাঠামোর ৯০ শতাংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। ফিলিস্তিনি নারীদের এই দীর্ঘস্থায়ী কান্না ও ট্র্যাজেডি অবসানে বিশ্ব সম্প্রদায়ের অনতিবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ এবং ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা এখন সময়ের দাবি।

আপনার মতামত লিখুন