মুসলিম বিশ্বের দুই প্রধান স্তম্ভ তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব জোরদার এবং বাণিজ্য-বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের লক্ষ্যে ইস্তাম্বুলে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে 'তুরস্ক-পাকিস্তান বিজনেস ফোরাম'। শনিবার (০৪ জুলাই) আয়োজিত এই উচ্চপর্যায়ের ফোরামে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও তুরস্কের শীর্ষ মন্ত্রীরা অংশ নেন। দুই দেশের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্পর্ককে একটি টেকসই ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোটে রূপান্তর করাই এই ফোরামের মূল লক্ষ্য।
পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত এবং তুরস্ক ও পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে ইস্তাম্বুলে ঐতিহাসিক 'তুরস্ক-পাকিস্তান ব্যবসায়িক ফোরাম'-এর দ্বিপাক্ষিক অধিবেশন শুরু হয়েছে। আঙ্কারায় নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ জুনায়েদের উদ্বোধনী বক্তব্যের মাধ্যমে ফোরামের মূল কার্যক্রম শুরু হয়। তিনি বলেন, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের দূরদর্শী নেতৃত্বে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক ও কৌশলগত সম্পর্ক দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। ঐতিহ্যগত ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত এই দৃঢ় সম্পর্ক এখন একটি মজবুত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে রূপ নিচ্ছে।
পাকিস্তানের বেসরকারীকরণ কর্মসূচিতে তুর্কি বিনিয়োগের আহ্বান
ফোরামে পাকিস্তানের বেসরকারীকরণ বিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ আলী দেশটির বর্তমান অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি তুর্কি বিনিয়োগকারীদের পাকিস্তানের সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে (SEZ) বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
মোহাম্মদ আলী বলেন, "সাম্প্রতিক কাঠামোগত সংস্কারের ফলে পাকিস্তান আবারও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে এসেছে। আমাদের বেসরকারীকরণ কর্মসূচির আওতায় বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি, বিমানবন্দর এবং বিমান বীমা সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে।" বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বণ্টন খাতে তুরস্কের বিশাল অভিজ্ঞতাকে পাকিস্তান কাজে লাগাতে চায় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সমুদ্রসীমায় যৌথ তেল-গ্যাস অনুসন্ধান
পাকিস্তানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী আলী পারভেজ মালিক ফোরামে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, পাকিস্তানে বর্তমানে ১৭৮টিরও বেশি তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের লাইসেন্স রয়েছে এবং সেখানে ড্রিলিং বা খনির খননকার্যে সফলতার হার প্রায় ৩৫ শতাংশ—যা বৈশ্বিক গড় সফলতার চেয়ে অনেক বেশি।
মন্ত্রী আরও জানান, পাকিস্তানের অফশোর (সমুদ্রসীমা) তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য একটি নতুন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল, যার মধ্যে ২৩টি ব্লকের বেশ কয়েকটিতে তুরস্কের জাতীয় তেল কোম্পানি (TPAO) জয়ী হয়েছে। এই লক্ষে তুর্কি কোম্পানিটি খুব শীঘ্রই পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে তাদের স্থায়ী কার্যালয় উদ্বোধন করতে যাচ্ছে। আলী পারভেজ মালিক আশা প্রকাশ করেন যে, আগামী সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাসের মধ্যেই তুরস্কের আধুনিক সিসমিক সার্ভে (ভূকম্পন জরিপ) জাহাজগুলো পাকিস্তানের সমুদ্রসীমায় তাদের অনুসন্ধান কাজ শুরু করবে।
জ্বালানি খাতে মুক্তবাজার অর্থনীতি
পাকিস্তানের জ্বালানি মন্ত্রী সরদার ওয়াইস লেঘারি বলেন, বর্তমান সরকার জ্বালানি খাতকে সর্বোচ্চ কৌশলগত অগ্রাধিকার দিচ্ছে। পাকিস্তান তাদের দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণভাবে বেসরকারি খাতের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
তুরস্কের ক্রমাগত সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে লেঘারি বলেন, পাকিস্তানের বিদ্যুৎ বাজারের নতুন সংস্কারের ফলে এই খাতটি সরকারি একক ক্রয়ের মডেল থেকে মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক বাজার অর্থনীতিতে প্রবেশ করবে, যা গ্রাহকসেবা ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা বাড়াবে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে পাকিস্তানের জোয়ার
পাকিস্তানের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শাজা ফাতিমা খাজা জানান, গত তিন বছরে পাকিস্তানের আইটি খাত রেকর্ড ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
পাকিস্তানের দক্ষ আইটি পেশাদার ও ডেভেলপাররা বর্তমানে বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে সেবা দিচ্ছেন। আইটি রপ্তানির ৬১ শতাংশ যাচ্ছে উত্তর আমেরিকায়, ১৯ শতাংশ ইউরোপে, ১২.৫ শতাংশ উপসাগরীয় (GCC) দেশগুলোতে এবং ৭ শতাংশ এশিয়ার অন্যান্য বাজারে। তিনি আরও যোগ করেন, পাকিস্তানে ১৫ কোটিরও বেশি তরুণ জনসংখ্যা রয়েছে। এই বিশাল যুবসমাজকে ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি শিল্পের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার বড় ধরনের ট্যাক্স বা কর ছাড়ের সুবিধা দিচ্ছে।

শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুলাই ২০২৬
মুসলিম বিশ্বের দুই প্রধান স্তম্ভ তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব জোরদার এবং বাণিজ্য-বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের লক্ষ্যে ইস্তাম্বুলে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে 'তুরস্ক-পাকিস্তান বিজনেস ফোরাম'। শনিবার (০৪ জুলাই) আয়োজিত এই উচ্চপর্যায়ের ফোরামে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও তুরস্কের শীর্ষ মন্ত্রীরা অংশ নেন। দুই দেশের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্পর্ককে একটি টেকসই ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোটে রূপান্তর করাই এই ফোরামের মূল লক্ষ্য।
পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত এবং তুরস্ক ও পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে ইস্তাম্বুলে ঐতিহাসিক 'তুরস্ক-পাকিস্তান ব্যবসায়িক ফোরাম'-এর দ্বিপাক্ষিক অধিবেশন শুরু হয়েছে। আঙ্কারায় নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ জুনায়েদের উদ্বোধনী বক্তব্যের মাধ্যমে ফোরামের মূল কার্যক্রম শুরু হয়। তিনি বলেন, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের দূরদর্শী নেতৃত্বে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক ও কৌশলগত সম্পর্ক দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। ঐতিহ্যগত ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত এই দৃঢ় সম্পর্ক এখন একটি মজবুত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে রূপ নিচ্ছে।
পাকিস্তানের বেসরকারীকরণ কর্মসূচিতে তুর্কি বিনিয়োগের আহ্বান
ফোরামে পাকিস্তানের বেসরকারীকরণ বিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ আলী দেশটির বর্তমান অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি তুর্কি বিনিয়োগকারীদের পাকিস্তানের সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে (SEZ) বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
মোহাম্মদ আলী বলেন, "সাম্প্রতিক কাঠামোগত সংস্কারের ফলে পাকিস্তান আবারও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে এসেছে। আমাদের বেসরকারীকরণ কর্মসূচির আওতায় বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি, বিমানবন্দর এবং বিমান বীমা সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে।" বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বণ্টন খাতে তুরস্কের বিশাল অভিজ্ঞতাকে পাকিস্তান কাজে লাগাতে চায় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সমুদ্রসীমায় যৌথ তেল-গ্যাস অনুসন্ধান
পাকিস্তানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী আলী পারভেজ মালিক ফোরামে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, পাকিস্তানে বর্তমানে ১৭৮টিরও বেশি তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের লাইসেন্স রয়েছে এবং সেখানে ড্রিলিং বা খনির খননকার্যে সফলতার হার প্রায় ৩৫ শতাংশ—যা বৈশ্বিক গড় সফলতার চেয়ে অনেক বেশি।
মন্ত্রী আরও জানান, পাকিস্তানের অফশোর (সমুদ্রসীমা) তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য একটি নতুন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল, যার মধ্যে ২৩টি ব্লকের বেশ কয়েকটিতে তুরস্কের জাতীয় তেল কোম্পানি (TPAO) জয়ী হয়েছে। এই লক্ষে তুর্কি কোম্পানিটি খুব শীঘ্রই পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে তাদের স্থায়ী কার্যালয় উদ্বোধন করতে যাচ্ছে। আলী পারভেজ মালিক আশা প্রকাশ করেন যে, আগামী সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাসের মধ্যেই তুরস্কের আধুনিক সিসমিক সার্ভে (ভূকম্পন জরিপ) জাহাজগুলো পাকিস্তানের সমুদ্রসীমায় তাদের অনুসন্ধান কাজ শুরু করবে।
জ্বালানি খাতে মুক্তবাজার অর্থনীতি
পাকিস্তানের জ্বালানি মন্ত্রী সরদার ওয়াইস লেঘারি বলেন, বর্তমান সরকার জ্বালানি খাতকে সর্বোচ্চ কৌশলগত অগ্রাধিকার দিচ্ছে। পাকিস্তান তাদের দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণভাবে বেসরকারি খাতের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
তুরস্কের ক্রমাগত সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে লেঘারি বলেন, পাকিস্তানের বিদ্যুৎ বাজারের নতুন সংস্কারের ফলে এই খাতটি সরকারি একক ক্রয়ের মডেল থেকে মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক বাজার অর্থনীতিতে প্রবেশ করবে, যা গ্রাহকসেবা ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা বাড়াবে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে পাকিস্তানের জোয়ার
পাকিস্তানের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শাজা ফাতিমা খাজা জানান, গত তিন বছরে পাকিস্তানের আইটি খাত রেকর্ড ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
পাকিস্তানের দক্ষ আইটি পেশাদার ও ডেভেলপাররা বর্তমানে বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে সেবা দিচ্ছেন। আইটি রপ্তানির ৬১ শতাংশ যাচ্ছে উত্তর আমেরিকায়, ১৯ শতাংশ ইউরোপে, ১২.৫ শতাংশ উপসাগরীয় (GCC) দেশগুলোতে এবং ৭ শতাংশ এশিয়ার অন্যান্য বাজারে। তিনি আরও যোগ করেন, পাকিস্তানে ১৫ কোটিরও বেশি তরুণ জনসংখ্যা রয়েছে। এই বিশাল যুবসমাজকে ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি শিল্পের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার বড় ধরনের ট্যাক্স বা কর ছাড়ের সুবিধা দিচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন