মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬
মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬
কওমী টাইমস

ভূমিকম্পে ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হারিয়ে নিঃস্ব স্থানীয় মুসলিমরা; অলৌকিকভাবে অক্ষত আল্লাহর ঘর এখন একমাত্র ভরসা

ভেনিজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে সব হারানো মুসলিমদের শেষ আশ্রয়স্থল 'লা গুয়াইরা মসজিদ'



ভেনিজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে সব হারানো মুসলিমদের শেষ আশ্রয়স্থল 'লা গুয়াইরা মসজিদ'

ভেনিজুয়েলার উপকূলীয় শহর লা গুয়াইরায় সাম্প্রতিক ভয়াবহ ভূমিকম্পে ঘরবাড়ি ও সবজি-ব্যবসা হারিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন স্থানীয় সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। এই চরম মানবিক সংকটের মুহূর্তে অলৌকিকভাবে কোনো ক্ষতি ছাড়াই অক্ষত থাকা স্থানীয় 'লা গুয়াইরা মসজিদ' এখন গৃহহীন মুসলিমদের একমাত্র আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। মসজিদটির ইমাম লোকমান আসাদ দিয়াব হাসান আনাদোলু এজেন্সিকে জানিয়েছেন, সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেলেও মহান আল্লাহ তাঁর ঘরকে হেফাজত করেছেন এবং এটিই এখন অসহায় মুসলিমদের মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই।

ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানা সাম্প্রতিক শক্তিশালী দ্বৈত ভূমিকম্পের ক্ষত এখনো দগদগে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর অন্যতম লা গুয়াইরা। এই ধ্বংসস্তূপের মাঝে লড়ছেন সেখানকার সংখ্যালঘু মুসলিমরা। অর্থনৈতিকভাবে আগে থেকেই বিপর্যস্ত এই জনগোষ্ঠীর সব শেষ করে দিয়েছে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তবে এই চরম বিপর্যয়ের মধ্যেও আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শহরের 'লা গুয়াইরা মসজিদ'। কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই অক্ষত থাকা এই আল্লাহর ঘরটি এখন সব হারানো মুসলিমদের প্রধান আশ্রয়স্থল।

লা গুয়াইরা মসজিদের ইমাম, ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত লোকমান আসাদ দিয়াব হাসান দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে ভেনিজুয়েলায় বসবাস করছেন। তিনি বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, "ভূমিকম্পের পর পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। লা গুয়াইরায় আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, সবকিছু মাটির সাথে মিশে গেছে। ঘরবাড়ি, বহুতল ভবন এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে। এটি ছিল এক সম্পূর্ণ ধ্বংসলীলা।"

ইমাম হাসান জানান, লা গুয়াইরা শহরে মাত্র ২৫ জনের মতো মুসলিম বসবাস করেন। এই ভয়াবহ দুর্যোগে তাদের প্রত্যেকের ঘরবাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট এবং জীবিকার একমাত্র উৎস দোকানপাট সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ইমাম নিজেও তাঁর বাসস্থান হারিয়েছেন। তাঁর বাড়িটি পুরোপুরি ভেঙে না পড়লেও বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বর্তমানে তিনি সরকারি প্রকৌশলীদের অপেক্ষায় আছেন, যারা এসে ভবনটির স্থায়িত্ব পরীক্ষা করবেন।

এই দুর্যোগে জর্ডানের নাগরিকত্ব থাকা ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ২ জন মুসলিম প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া চরম নিরাপত্তাহীনতা ও সংকটের কারণে ১৫ জন মুসলিমকে উদ্ধারকারী বিমানে করে জর্ডানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বাকি থাকা গৃহহীন মুসলিমদের জন্য লা গুয়াইরা মসজিদটিই এখন নিরাপদ আশ্রয়। ইমাম হাসান আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন, "লা গুয়াইরার সমস্ত মুসলিম ভাই-বোনেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তারা সবাই এখন মসজিদে চলে এসেছেন। আল্লাহর অশেষ রহমতে, আমরা এখানে জামায়াতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করছি। আলহামদুলিল্লাহ, মসজিদের কোনো ক্ষতি হয়নি, আল্লাহ এটিকে রক্ষা করেছেন।"

ক্ষতিগ্রস্ত মুসলিমরা রাতে মসজিদে ঘুমাচ্ছেন এবং দিনের বেলা তারা ধ্বংসস্তূপে যাচ্ছেন যদি কোনো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, যেমন—ফ্রিজ বা ওয়াশিং মেশিন উদ্ধার করা যায়। কিন্তু ইমাম হাসান আক্ষেপ করে জানান, বেশিরভাগ মানুষ খালি হাতে প্রাণ বাঁচিয়ে মসজিদটিতে ছুটে এসেছিলেন। পরবর্তীতে অনেকে ভাঙা বাড়িতে কিছু খুঁজতে গিয়ে দেখেছেন যে, সুযোগসন্ধানীরা তাদের বেঁচে যাওয়া মালামালও চুরি করে নিয়ে গেছে।

বর্তমানে এই সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বাসস্থান ও কর্মসংস্থান। ইমাম হাসান বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ এবং ভেনিজুয়েলা সরকারের কাছে জরুরি সাহায্যের আবেদন জানিয়ে বলেন, "আমাদের হাতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সবকিছু আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে। আমরা আশা করি, কোনো সরকার বা সামর্থ্যবান হৃদয়বান ব্যক্তিরা আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবেন, যাতে আমরা আবার নতুন করে জীবনটা শুরু করতে পারি।"

উল্লেখ্য, গত ২৪ জুন ভেনিজুয়েলায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভেনিজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজের দেওয়া তথ্যমতে, এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৩৪২ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৭৪০ জন আহত হয়েছেন। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পে সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৬.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বিষয় : ভেনিজুয়েলা

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬


ভেনিজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে সব হারানো মুসলিমদের শেষ আশ্রয়স্থল 'লা গুয়াইরা মসজিদ'

প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬

featured Image

ভেনিজুয়েলার উপকূলীয় শহর লা গুয়াইরায় সাম্প্রতিক ভয়াবহ ভূমিকম্পে ঘরবাড়ি ও সবজি-ব্যবসা হারিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন স্থানীয় সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। এই চরম মানবিক সংকটের মুহূর্তে অলৌকিকভাবে কোনো ক্ষতি ছাড়াই অক্ষত থাকা স্থানীয় 'লা গুয়াইরা মসজিদ' এখন গৃহহীন মুসলিমদের একমাত্র আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। মসজিদটির ইমাম লোকমান আসাদ দিয়াব হাসান আনাদোলু এজেন্সিকে জানিয়েছেন, সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেলেও মহান আল্লাহ তাঁর ঘরকে হেফাজত করেছেন এবং এটিই এখন অসহায় মুসলিমদের মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই।

ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানা সাম্প্রতিক শক্তিশালী দ্বৈত ভূমিকম্পের ক্ষত এখনো দগদগে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর অন্যতম লা গুয়াইরা। এই ধ্বংসস্তূপের মাঝে লড়ছেন সেখানকার সংখ্যালঘু মুসলিমরা। অর্থনৈতিকভাবে আগে থেকেই বিপর্যস্ত এই জনগোষ্ঠীর সব শেষ করে দিয়েছে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তবে এই চরম বিপর্যয়ের মধ্যেও আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শহরের 'লা গুয়াইরা মসজিদ'। কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই অক্ষত থাকা এই আল্লাহর ঘরটি এখন সব হারানো মুসলিমদের প্রধান আশ্রয়স্থল।

লা গুয়াইরা মসজিদের ইমাম, ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত লোকমান আসাদ দিয়াব হাসান দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে ভেনিজুয়েলায় বসবাস করছেন। তিনি বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, "ভূমিকম্পের পর পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। লা গুয়াইরায় আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, সবকিছু মাটির সাথে মিশে গেছে। ঘরবাড়ি, বহুতল ভবন এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে। এটি ছিল এক সম্পূর্ণ ধ্বংসলীলা।"

ইমাম হাসান জানান, লা গুয়াইরা শহরে মাত্র ২৫ জনের মতো মুসলিম বসবাস করেন। এই ভয়াবহ দুর্যোগে তাদের প্রত্যেকের ঘরবাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট এবং জীবিকার একমাত্র উৎস দোকানপাট সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ইমাম নিজেও তাঁর বাসস্থান হারিয়েছেন। তাঁর বাড়িটি পুরোপুরি ভেঙে না পড়লেও বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বর্তমানে তিনি সরকারি প্রকৌশলীদের অপেক্ষায় আছেন, যারা এসে ভবনটির স্থায়িত্ব পরীক্ষা করবেন।

এই দুর্যোগে জর্ডানের নাগরিকত্ব থাকা ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ২ জন মুসলিম প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া চরম নিরাপত্তাহীনতা ও সংকটের কারণে ১৫ জন মুসলিমকে উদ্ধারকারী বিমানে করে জর্ডানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বাকি থাকা গৃহহীন মুসলিমদের জন্য লা গুয়াইরা মসজিদটিই এখন নিরাপদ আশ্রয়। ইমাম হাসান আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন, "লা গুয়াইরার সমস্ত মুসলিম ভাই-বোনেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তারা সবাই এখন মসজিদে চলে এসেছেন। আল্লাহর অশেষ রহমতে, আমরা এখানে জামায়াতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করছি। আলহামদুলিল্লাহ, মসজিদের কোনো ক্ষতি হয়নি, আল্লাহ এটিকে রক্ষা করেছেন।"

ক্ষতিগ্রস্ত মুসলিমরা রাতে মসজিদে ঘুমাচ্ছেন এবং দিনের বেলা তারা ধ্বংসস্তূপে যাচ্ছেন যদি কোনো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, যেমন—ফ্রিজ বা ওয়াশিং মেশিন উদ্ধার করা যায়। কিন্তু ইমাম হাসান আক্ষেপ করে জানান, বেশিরভাগ মানুষ খালি হাতে প্রাণ বাঁচিয়ে মসজিদটিতে ছুটে এসেছিলেন। পরবর্তীতে অনেকে ভাঙা বাড়িতে কিছু খুঁজতে গিয়ে দেখেছেন যে, সুযোগসন্ধানীরা তাদের বেঁচে যাওয়া মালামালও চুরি করে নিয়ে গেছে।

বর্তমানে এই সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বাসস্থান ও কর্মসংস্থান। ইমাম হাসান বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ এবং ভেনিজুয়েলা সরকারের কাছে জরুরি সাহায্যের আবেদন জানিয়ে বলেন, "আমাদের হাতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সবকিছু আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে। আমরা আশা করি, কোনো সরকার বা সামর্থ্যবান হৃদয়বান ব্যক্তিরা আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবেন, যাতে আমরা আবার নতুন করে জীবনটা শুরু করতে পারি।"

উল্লেখ্য, গত ২৪ জুন ভেনিজুয়েলায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভেনিজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজের দেওয়া তথ্যমতে, এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৩৪২ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৭৪০ জন আহত হয়েছেন। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পে সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৬.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ