ভারতের কর্নাটক রাজ্যের রাজধানী বেঙ্গালুরুতে ‘বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসী’ চিহ্নিত করার নামে শত শত দরিদ্র অভিবাসী শ্রমিকের ওপর ব্যাপক অভিযান চালিয়েছে স্থানীয় পুলিশ। শনিবার (৮ আগস্ট) কাকডাকা ভোরে বস্তিগুলোতে চালানো এই বিশেষ অভিযানে নারী ও শিশুসহ শত শত মানুষকে বেআইনিভাবে আটক, লাঠিচার্জ এবং চরম শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভারতের শীর্ষস্থানীয় চারটি নাগরিক অধিকার ও শ্রমিক সংগঠন কর্নাটকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ প্রধানের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘটনার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে।
বেঙ্গালুরুজুড়ে বস্তিতে বস্তিতে তাণ্ডব
ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের প্রসারের প্রেক্ষাপটে আবারো লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে বাংলাভাষী ও দরিদ্র মুসলিম শ্রমিকদের। শনিবার সকাল ৬:৩০ থেকে ৭:৩০ টার মধ্যে বেঙ্গালুরুর বিভিন্ন বস্তি এলাকায় আকস্মিক অভিযান চালায় কর্নাটক পুলিশের একাধিক টিম। কোনো অগ্রিম নোটিশ বা বৈধ আইনি পরোয়ানা ছাড়াই বস্তিবাসীদের ঘরে ঢুকে কাগজপত্র তল্লাশির নামে তাণ্ডব চালানো হয়।
পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ (PUCL), অল ইন্ডিয়া লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ফর জাস্টিস (AILAJ), ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স রাইটস ইউনিয়ন (DWRU) এবং অল ইন্ডিয়া সেন্ট্রাল কাউন্সিল অফ ট্রেড ইউনিয়নস (AICCTU)-এর যৌথ প্রতিনিধিদল পরিদর্শন শেষে নিশ্চিত করেছে যে, ভারতীয় নাগরিকত্বের বৈধ কাগজপত্র প্রদর্শনের পরেও অনেককে জোরপূর্বক পুলিশের গাড়ি, বাস, কনভেনশন সেন্টার ও বিয়ের হলে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।
অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত প্রধান এলাকা ও আটকের আনুমানিক হিসাব:
• পারাপ্পানা অগ্রহারা পুলিশ স্টেশন: ৪’শ এর বেশি (কুদলু, রায়সান্দ্রা, শান্তিপুরা ও চূড়াসান্দ্রা থেকে)
• বান্দেপাল্যা পুলিশ স্টেশন: ২০০+ জন (৪টি ভিন্ন বস্তি থেকে)
• হেব্বাগোডি পুলিশ স্টেশন: প্রায় ১৫০ জন
• সোমাসুন্দরাপাল্যা পুলিশ স্টেশন: ৭৫ জন
• ভার্থুর পুলিশ স্টেশন: ৪১ জন (নারীসহ)
• এইচএএল, মারাতাহাল্লি, হোয়াইটফিল্ড ও মহাদেবপুরা: আরও ৮০+ জন
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও পুলিশি নির্যাতন
অধিকার রক্ষা কর্মীদের দায়ের করা অভিযোগে জানা গেছে, আটকদের অধিকাংশকেই চরম অমানবিক আচরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ভার্থুর থানায় আটকদের মধ্যে অন্তত ছয়জন নিশ্চিত করেছেন যে, পুলিশ তাদের লাঠি দিয়ে পেটানো শুরু করে। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে গুরুতর আহত হয়েছেন ৩০ বছর বয়সী এক যুবক। এছাড়া ৬০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকেও ছাড় দেয়নি পুলিশ।
হেব্বাগোডি এলাকায় পুলিশ তল্লাশির সময় সাধারণ মানুষের ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে এবং সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করে। অন্তত ৫০টিরও বেশি মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করা হয়। মোবাইল ফোনে কেবল কোনো আন্তর্জাতিক নম্বর (বিশেষ করে বাংলাদেশের) কল লিস্টে পাওয়ার অজুহাতে একাধিক ব্যক্তিকে সরাসরি ফরেনার্স আঞ্চলিক রেজিস্ট্রেশন অফিসে (FRRO) পাঠানো হয়েছে। নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়েছে—ফোনে কোনো বিদেশি নম্বর থাকা কোনোভাবেই অপরাধ বা বিদেশি নাগরিকত্বের প্রমাণ হতে পারে না।
ভারতের সংবিধান ও আইনি বিধির চরম লঙ্ঘন
অভিযোগে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ভারতের নতুন ফৌজদারি আইন ‘ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা, ২০২৩’ (BNSS)-এর ৩৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কাউকে গ্রেপ্তার করতে হলে তার সুনির্দিষ্ট কারণ থাকতে হবে এবং তা নথিবদ্ধ করতে হবে। বেঙ্গালুরু পুলিশ কোনো নিয়ম না মেনে এই গণগ্রেপ্তার চালিয়েছে, যা ভারতের নিজস্ব সংবিধান ও সার্বজনীন মানবাধিকার সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
আইনজীবীরা থানার সামনে পৌঁছালে তাদের সঙ্গে অত্যন্ত শত্রুভাবাপন্ন আচরণ করা হয়। পুলিশ তাদের আটকদের সঙ্গে কথা বলতে দেয়নি, উপরন্তু সাংবাদিকদের ও আইনজীবীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা এবং “অবৈধ অভিবাসীদের সহযোগিতার” হুমকি দেওয়া হয়।
অধিকার রক্ষা সংগঠনগুলোর মূল দাবি
১. আটক সকল শ্রমিককে অবিলম্বে এবং নিংশর্তে মুক্তি দেওয়া।
২. আহতদের সুচিকিৎসা প্রদান ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান।
৩. ঘটনাটির একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে বিচার এবং দোষী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর (FIR) দায়ের।
৪. অভিযানের সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ ও থানা নথিপত্র সংরক্ষণের নির্দেশ।
বিষয় : মানবাধিকার ভারত

রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ আগস্ট ২০২৬
ভারতের কর্নাটক রাজ্যের রাজধানী বেঙ্গালুরুতে ‘বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসী’ চিহ্নিত করার নামে শত শত দরিদ্র অভিবাসী শ্রমিকের ওপর ব্যাপক অভিযান চালিয়েছে স্থানীয় পুলিশ। শনিবার (৮ আগস্ট) কাকডাকা ভোরে বস্তিগুলোতে চালানো এই বিশেষ অভিযানে নারী ও শিশুসহ শত শত মানুষকে বেআইনিভাবে আটক, লাঠিচার্জ এবং চরম শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভারতের শীর্ষস্থানীয় চারটি নাগরিক অধিকার ও শ্রমিক সংগঠন কর্নাটকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ প্রধানের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘটনার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে।
বেঙ্গালুরুজুড়ে বস্তিতে বস্তিতে তাণ্ডব
ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের প্রসারের প্রেক্ষাপটে আবারো লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে বাংলাভাষী ও দরিদ্র মুসলিম শ্রমিকদের। শনিবার সকাল ৬:৩০ থেকে ৭:৩০ টার মধ্যে বেঙ্গালুরুর বিভিন্ন বস্তি এলাকায় আকস্মিক অভিযান চালায় কর্নাটক পুলিশের একাধিক টিম। কোনো অগ্রিম নোটিশ বা বৈধ আইনি পরোয়ানা ছাড়াই বস্তিবাসীদের ঘরে ঢুকে কাগজপত্র তল্লাশির নামে তাণ্ডব চালানো হয়।
পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ (PUCL), অল ইন্ডিয়া লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ফর জাস্টিস (AILAJ), ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স রাইটস ইউনিয়ন (DWRU) এবং অল ইন্ডিয়া সেন্ট্রাল কাউন্সিল অফ ট্রেড ইউনিয়নস (AICCTU)-এর যৌথ প্রতিনিধিদল পরিদর্শন শেষে নিশ্চিত করেছে যে, ভারতীয় নাগরিকত্বের বৈধ কাগজপত্র প্রদর্শনের পরেও অনেককে জোরপূর্বক পুলিশের গাড়ি, বাস, কনভেনশন সেন্টার ও বিয়ের হলে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।
অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত প্রধান এলাকা ও আটকের আনুমানিক হিসাব:
• পারাপ্পানা অগ্রহারা পুলিশ স্টেশন: ৪’শ এর বেশি (কুদলু, রায়সান্দ্রা, শান্তিপুরা ও চূড়াসান্দ্রা থেকে)
• বান্দেপাল্যা পুলিশ স্টেশন: ২০০+ জন (৪টি ভিন্ন বস্তি থেকে)
• হেব্বাগোডি পুলিশ স্টেশন: প্রায় ১৫০ জন
• সোমাসুন্দরাপাল্যা পুলিশ স্টেশন: ৭৫ জন
• ভার্থুর পুলিশ স্টেশন: ৪১ জন (নারীসহ)
• এইচএএল, মারাতাহাল্লি, হোয়াইটফিল্ড ও মহাদেবপুরা: আরও ৮০+ জন
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও পুলিশি নির্যাতন
অধিকার রক্ষা কর্মীদের দায়ের করা অভিযোগে জানা গেছে, আটকদের অধিকাংশকেই চরম অমানবিক আচরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ভার্থুর থানায় আটকদের মধ্যে অন্তত ছয়জন নিশ্চিত করেছেন যে, পুলিশ তাদের লাঠি দিয়ে পেটানো শুরু করে। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে গুরুতর আহত হয়েছেন ৩০ বছর বয়সী এক যুবক। এছাড়া ৬০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকেও ছাড় দেয়নি পুলিশ।
হেব্বাগোডি এলাকায় পুলিশ তল্লাশির সময় সাধারণ মানুষের ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে এবং সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করে। অন্তত ৫০টিরও বেশি মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করা হয়। মোবাইল ফোনে কেবল কোনো আন্তর্জাতিক নম্বর (বিশেষ করে বাংলাদেশের) কল লিস্টে পাওয়ার অজুহাতে একাধিক ব্যক্তিকে সরাসরি ফরেনার্স আঞ্চলিক রেজিস্ট্রেশন অফিসে (FRRO) পাঠানো হয়েছে। নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়েছে—ফোনে কোনো বিদেশি নম্বর থাকা কোনোভাবেই অপরাধ বা বিদেশি নাগরিকত্বের প্রমাণ হতে পারে না।
ভারতের সংবিধান ও আইনি বিধির চরম লঙ্ঘন
অভিযোগে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ভারতের নতুন ফৌজদারি আইন ‘ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা, ২০২৩’ (BNSS)-এর ৩৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কাউকে গ্রেপ্তার করতে হলে তার সুনির্দিষ্ট কারণ থাকতে হবে এবং তা নথিবদ্ধ করতে হবে। বেঙ্গালুরু পুলিশ কোনো নিয়ম না মেনে এই গণগ্রেপ্তার চালিয়েছে, যা ভারতের নিজস্ব সংবিধান ও সার্বজনীন মানবাধিকার সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
আইনজীবীরা থানার সামনে পৌঁছালে তাদের সঙ্গে অত্যন্ত শত্রুভাবাপন্ন আচরণ করা হয়। পুলিশ তাদের আটকদের সঙ্গে কথা বলতে দেয়নি, উপরন্তু সাংবাদিকদের ও আইনজীবীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা এবং “অবৈধ অভিবাসীদের সহযোগিতার” হুমকি দেওয়া হয়।
অধিকার রক্ষা সংগঠনগুলোর মূল দাবি
১. আটক সকল শ্রমিককে অবিলম্বে এবং নিংশর্তে মুক্তি দেওয়া।
২. আহতদের সুচিকিৎসা প্রদান ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান।
৩. ঘটনাটির একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে বিচার এবং দোষী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর (FIR) দায়ের।
৪. অভিযানের সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ ও থানা নথিপত্র সংরক্ষণের নির্দেশ।

আপনার মতামত লিখুন