জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কের প্রথম দিনে সংস্থার বিদায়ী মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ফিলিস্তিনে চলমান ইসরায়েলি সহিংসতাকে তার এক দশকের মেয়াদে দেখা "নজিরবিহীন গণহত্যা ও ধ্বংসলীলা" হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। গাজা ও পশ্চিম তীরে চলমান নৃশংসতা বন্ধের পাশাপাশি ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে দুই-রাষ্ট্রীয় সমাধান রক্ষার আকুল আকুতি জানান তিনি। একই সাথে, সাধারণ পরিষদের নবনির্বাচিত সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বিশ্বের অর্জিত সাফল্য বজায় রাখতে এবং সংকট নিরসনে একটি আধুনিক ও ফলপ্রসূ জাতিসংঘ গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।
বিশ্বের প্রতিটি প্রান্ত থেকে আগত বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক শুরু হয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে নিজের ১০ বছরের মেয়াদে শেষবারের মতো বক্তব্য রাখতে গিয়ে মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বৈশ্বিক সংকটের একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "আমাদের পৃথিবীর ভূ-রাজনৈতিক ফাটলগুলো দিন দিন আরও চওড়া হচ্ছে এবং তা গভীর গিরিখাতে রূপ নিচ্ছে।"
গাজায় নজিরবিহীন হত্যাযজ্ঞ ও পশ্চিম তীরে জাতিগত নিধন
নিজের অর্ধঘণ্টাব্যাপী বিদায়ী ভাষণে আন্তোনিও গুতেরেস সবচেয়ে জোরালো বক্তব্য দেন মধ্যপ্রাচ্য ও ফিলিস্তিন পরিস্থিতি নিয়ে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের চালানো সামরিক অভিযান সম্পর্কে তিনি বলেন:
"জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে আমার দায়িত্ব পালনকালে গাজার ফিলিস্তিনিদের ওপর যেভাবে গণহত্যা ও ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছে, আমি এমন ভয়াবহতা আর কোথাও দেখিনি।"
গুতেরেস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তথাকথিত যুদ্ধবিরতিগুলো কেবল "ছোট আকারের সাময়িক বিরতি" ছাড়া আর কিছুই নয়, যা সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নির্মম মূল্য পরিশোধের শামিল। তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, ফিলিস্তিনের দখলকৃত পশ্চিম তীরে সহিংসতা, জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং বেআইনি ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ শান্তির পথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে এবং সেখানে ফিলিস্তিনিদের ওপর পূর্ণাঙ্গ 'জাতিগত নিধনের' (Ethnic Cleansing) চরম ঝুঁকি তৈরি করেছে। তিনি স্পষ্ট কণ্ঠে জানান, চোখের সামনে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে 'দুই-রাষ্ট্রীয় সমাধান' বিলুপ্ত হতে দেওয়া যাবে না।
গুতেরেস জোর দিয়ে বলেন, বিশ্বে আন্তর্জাতিক আইনকে একপাশে সরিয়ে রাখা হয়েছে, বেসামরিক মানুষদের সরাসরি লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে, এমনকি ক্ষুধাকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণকর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক সংকট ও মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান
গুতেরেস তার বক্তব্যে গাজা ছাড়াও বিশ্বজুড়ে চলমান অন্যান্য সংকটের কথা তুলে ধরেন। তিনি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, বাইরে থেকে উসকানি দেওয়া সুদানের গৃহযুদ্ধ এবং মিয়ানমারে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও গণ-বাস্তুচ্যুতির চিত্র উল্লেখ করেন, যা বিশ্ববাসীর নজর এড়িয়ে যাওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
একই সাথে তিনি প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-ভিত্তিক মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিশ্বকে সতর্ক করেন। তিনি বলেন:
- মানুষ এখন ক্রমেই প্রযুক্তির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করছে, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
- বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর ঘাতক রোবট (Killer Robots) এখন সামরিক বাস্তবে পরিণত হয়েছে।
- জীবন-মৃত্যুর মতো অতি সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কখনোই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা যন্ত্রের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।
তিনি তেল ও জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর সমালোচনা করে বলেন, বছরের পর বছর তারা বায়ুমণ্ডলকে একটি উন্মুক্ত নর্দমার মতো ব্যবহার করে মুনাফা লুটছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে পশ্চিমাদের শীর্ষ ৫টি তেল কোম্পানি প্রায় অর্ধ-ট্রিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছে। বিশ্বকে রক্ষার জন্য এই লুটপাট ও শোষণ অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানান তিনি।
নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার ও আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব
জাতিসংঘের কার্যকারিতা বাড়াতে এর সংস্কার প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেন গুতেরেস। তিনি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদকে ২১ শতকের বাস্তবতার আলোকেও নতুন করে পুনর্গঠন করতে হবে। এখনো ভেটো ক্ষমতা বা স্থায়ী আসনে আফ্রিকার কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকা সম্পর্কে তিনি বলেন, "একবিংশ শতাব্দীতে এসে আফ্রিকান প্রতিনিধিত্বহীন নিরাপত্তা পরিষদ সম্পূর্ণ অবিচার এবং অন্যায্য।"
সভাপতির ভাষণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান: 'বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি এড়ানোই জাতিসংঘের সাফল্য'
সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান তার বক্তব্যে জাতিসংঘের প্রাসঙ্গিকতা ও বিশ্বস্ততা পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক সংকট নতুন নয়, তবে এই ব্যবস্থার বিকল্প বিশ্ব ভাবতেও পারে না।
খলিলুর রহমান বলেন:
- ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত এই বিশ্বমঞ্চের সবচেয়ে বড় অবদান ও মূল অঙ্গীকার হলো — আন্তর্জাতিক সমাজকে আরেকটি সম্ভাব্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলা থেকে দূরে রাখা।
- ফিলিস্তিন সংকট দশকের পর দশক ধরে সমাধানহীন অবস্থায় ঝুলে আছে। গাজা, সুদান, ইউক্রেন, মিয়ানমার ও মধ্যপ্রাচ্যে এখনো সংঘাত চলছে।
- জাতিসংঘ সম্পর্কে জনগণের আস্থা এমনি এমনি তৈরি হবে না; তা অর্জিত হবে এখানে নেওয়া সিদ্ধান্ত, প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে সাধারণ মানুষের জীবনমানের দৃশ্যমান ফলাফলের মাধ্যমে।
খলিলুর রহমান নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো পুনর্গঠন, প্রযুক্তির সুবিচারমূলক বণ্টন এবং এআই প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
জাতিসংঘের এই অধিবেশনে বিশ্বনেতারা একদিকে যেমন বিশ্ব ব্যবস্থার দুর্বলতা মেনে নিয়েছেন, অন্যদিকে গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চালিত ইসরায়েলি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে গুতেরেসের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে মুক্তিকামী মানুষেরই আক্ষেপ।
মতামত