ফ্রান্সে নির্বাচন কেন্দ্র করে মুসলিমবিরোধী উসকানিমূলক রাজনীতি তীব্র আকার ধারণ করায় উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক দল 'ন্যাশনাল র্যালি' (RN)-র জ্যেষ্ঠ নেতাদের বিরুদ্ধে প্যারিস পাবলিক প্রসিকিউটরের কাছে অপরাধমূলক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ফরাসি পরিবেশবাদী দল গ্রিনসের এমপি সাবরিনা সেবাইহি বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) প্যারিস পাবলিক প্রসিকিউটর লর বেকুয়া-এর কাছে এই আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার বিভাগীয় অভিযোগ দায়ের করেন। ডানপন্থীরা আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতায় এলে প্রকাশ্য স্থানে হিজাব পরা নিষিদ্ধ করা এবং হিজাব পরিহিত নারীদের ওপর জরিমানা আরোপের যে ঘোষণা দিয়েছে, সেটিকে ধর্মীয় বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে এই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ফ্রান্সের আগামী ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উগ্র ডানপন্থী শক্তিগুলোর মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারণা এবং ইসলামোফোবিয়া নতুন রূপ ধারণ করেছে। চরম ডানপন্থী রাজনৈতিক দল 'ন্যাশনাল র্যালি' (RN)-র নেতারা সাম্প্রতিক প্রচারণায় প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে, নির্বাচনে জয়ী হয়ে তারা ক্ষমতায় এলে জনসমক্ষে হিজাব পরা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করবেন এবং কোনো মুসলিম নারী হিজাব পরলে তাঁকে মোটা অঙ্কের অর্থদণ্ড বা জরিমানা করা হবে।
উগ্র ডানপন্থীদের এই চরম বৈষম্যমূলক ও উসকানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক ও আইনি অবস্থান নিয়েছেন ফরাসি পার্লামেন্ট সদস্য (এমপি) সাবরিনা সেবাইহি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি জানান, উগ্র ডানপন্থী নেতাদের এসব বক্তব্যের বিরুদ্ধে তিনি প্যারিসের প্রধান সরকারি কৌঁসুলি লর বেকুয়া (Laure Beccuau)-এর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অপরাধমূলক মামলা দায়ের করেছেন।
সংসদ সদস্য সেবাইহি তাঁর অভিযোগে তুলে ধরেন যে, গত ৪৮ ঘণ্টায় ন্যাশনাল র্যালি দলের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জাতীয় গণমাধ্যমে হিজাব নিষিদ্ধ করা, হিজাব পরিহিত নারীদের ওপর পুলিশি জরিমানা আরোপ করা এবং বিষয়টি নিয়ে গণভোট আয়োজনের পক্ষে একের পর এক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে 'ন্যাশনাল র্যালি'র এমপি জ্যাঁ-ফিলিপ তাঙ্গি প্রকাশ্যে জানান, তাঁদের দল ক্ষমতায় গেলে হিজাব পরিহিতদের জরিমানা করা হবে।
সাবরিনা সেবাইহি যুক্তি দেন, এসব বক্তব্য মূলত ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে উসকানি ও বৈষম্য তৈরি করছে, যা ১৮৮১ সালের ২৯ জুলাই প্রণীত ফরাসি প্রেস আইনের ২৪ নম্বর ধারার স্পষ্ট লঙ্ঘন। ওই আইনে ধর্মীয় বা অন্য কোনো পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য ও ঘৃণা উসকে দেওয়াকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আদালতের কাছে তাঁর আবেদন—যাতে বিচার বিভাগ খতিয়ে দেখে যে এসব বক্তব্য ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর সামিল কি না।
এমপি সেবাইহি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এই সমস্ত প্রস্তাবনার আড়ালে বস্তুত মুসলিম নারীদের টার্গেট করে এক নোংরা ও বৈষম্যমূলক রাজনীতির নকশা তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, বর্ণবাদ এবং ইসলামোফোবিয়াকে কখনোই স্বাভাবিক ঘটনা বা রাজনীতির সাধারণ অংশ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।"
উল্লেখ্য, ফ্রান্সে রাষ্ট্রীয়ভাবে মুসলিমদের ওপর দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন কঠোর প্রশাসনিক বিধিনিষেধ জারি রয়েছে। ২০০৪ সাল থেকে দেশটির প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের হিজাব পরা নিষিদ্ধ এবং সরকারি কর্মচারীদের জন্যও কর্মস্থলে ধর্মীয় পোশাক পরা বেআইনি। এরপরও উগ্র ডানপন্থীরা সাধারণ রাস্তায় ও সর্বসাধারণের ব্যবহার্য স্থানেও মুসলিম নারীদের পর্দা করার অধিকার পুরোপুরি কেড়ে নিতে চায়।
ফ্রান্সে আগামী ২০২৭ সালের ১৮ এপ্রিল প্রথম ধাপের এবং ২ মে দ্বিতীয় ধাপের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। টানা দুই মেয়াদ দায়িত্বে থাকায় বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সংবিধান অনুযায়ী আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। এই সুযোগে উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো মুসলিমবিদ্বেষ ও ইসলামোফোবিয়াকে হাতিয়ার করে জনমত গঠন ও ভোট ব্যাংক তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো ফরাসি রাজনীতিতে মুসলিমদের এভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানোর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
মতামত