ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বুধবার দাবি করেছেন, গাজা উপত্যকার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ইসরায়েল তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’ থেকে পিছু হটবে না। গাজা সফরের সময় দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ এবং উপত্যকাকে সামরিকীকরণমুক্ত করার ওপর জোর দেন। এদিকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে মধ্যস্থতাকারীদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বুধবার গাজা উপত্যকা সফরের সময় বলেছেন, উপত্যকার ৬০ শতাংশ এলাকা বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এই অবস্থান থেকে পিছু হটার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
গাজা উপত্যকা থেকে ধারণ করা একটি ভিডিওতে নেতানিয়াহুকে বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পরা অবস্থায় দেখা যায়। টেলিগ্রাম প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, “আমি গাজা উপত্যকায় আছি।”
নেতানিয়াহু আরও বলেন, “আজ আমরা এই এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করছি এবং এই রেখায়—হলুদ রেখায়—অটল রয়েছি। আমাদের সামনে আরও কাজ রয়েছে এবং হামাসকে নিরস্ত্র করা ও গাজাকে সামরিকীকরণ থেকে বিরত রাখা পর্যন্ত আমরা তা সম্পন্ন করব। গাজা ইসরায়েলের জন্য আর কোনো হুমকি হয়ে থাকবে না।”
‘হলুদ রেখা’ বলতে সেই সীমারেখাকে বোঝানো হচ্ছে, যে পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজায় যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনার প্রথম ধাপের অংশ হিসেবে সেনা প্রত্যাহার করেছিল।
নেতানিয়াহু বলেন, “আমরা এই খাতের ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করি এবং আমরা পিছু হটব না।”
তিনি আরও জানান, আগের দিন ইসরায়েলি বাহিনী হামাসের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রধানকে গ্রেপ্তার করেছে। নেতানিয়াহুর ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যাবে বলে তারা আশা করছেন।
ইসরায়েলি চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা উপত্যকায় নেতানিয়াহুর সফরের সময় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধান ইয়াল জামিরও তার সঙ্গে ছিলেন।
নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার শুরু করার আগে হামাসকে সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্র হতে হবে। তবে হামাসের অবস্থান হলো, গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর পর্যায়ক্রমিক ও সুশৃঙ্খল প্রত্যাহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তারা নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে প্রস্তুত রয়েছে।
এর আগে নেতানিয়াহু গাজার জন্য প্রস্তাবিত ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যানের কথা জানিয়েছিলেন এবং হামাসের নিরস্ত্রীকরণকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। যদিও ৩১ জুলাই শান্তি পরিষদ প্রকাশিত রোডম্যাপে হামাসের নিরস্ত্রীকরণের পাশাপাশি গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কথাও বলা হয়েছিল।
এদিকে, মধ্যস্থতাকারীরা ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও সহিংসতা ও চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।
গাজা উপত্যকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনীর যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২৬২ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং আরও ৪ হাজার ১৬৮ জন আহত হয়েছেন।
২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে। এতে ৭৩ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৪ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। নিহত ও আহতদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক নারী ও শিশু রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি এই যুদ্ধে গাজার বেসামরিক অবকাঠামোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, উপত্যকার প্রায় ৯০ শতাংশ অবকাঠামো কোনো না কোনোভাবে ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থান, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং সেনা প্রত্যাহারের শর্ত নিয়ে বিরোধের মধ্যেই যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা এবং গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও বহাল রয়েছে।
মতামত