সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন পরিস্থিতিতে তুরস্কের সামরিক ভূমিকা কেবল নতুন সিরীয় সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং দেশের সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে জানিয়েছেন ফ্রি সিরিয়ান আর্মির (এফএসএ) প্রাক্তন যোদ্ধা মাজদ আল-দিন মাহসুন। গত বুধবার সন্ধ্যায় ইসরায়েলি সরকারি সম্প্রচার কর্পোরেশনকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে আসাদ পতনের পর সিরিয়ার ওপর ইসরায়েলের অব্যাহত বিমান হামলা ও উস্কানিমূলক আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এই সিরীয় যোদ্ধা।
সিরিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং ভৌগোলিক রাজনীতির পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট নিয়ে সম্প্রতি ইসরায়েলি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন মুক্ত সিরীয় বাহিনীর প্রাক্তন যোদ্ধা মাজদ আল-দিন মাহসুন। বর্তমানে উত্তর সিরিয়ার আজাজ শহরে বসবাসরত মাহসুন সরাসরি ভিডিও কলের মাধ্যমে ইসরায়েলি সম্প্রচার কর্তৃপক্ষকে সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন।
প্রশিক্ষণ ও সামরিক পুনর্গঠনে তুরস্কের ভূমিকা:
সাক্ষাৎকারে মাহসুন স্পষ্ট করে বলেন যে, বাশার আল-আসাদ শাসনের পতনের আগে ও পরের সামরিক প্রেক্ষাপটে আঙ্কারার ভূমিকায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আগে তুরস্কের সহায়তা ছিল মূলত রসদ এবং সরাসরি সামরিক অপারেশনের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে আইএসআইএস (আইএস)-এর হুমকি মোকাবেলা এবং তুরস্কের সীমান্তে বিচ্ছিন্নতাবাদী কুর্দিদের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গঠন প্রতিরোধ করতে তুর্কি বাহিনীকে কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সিরিয়ার ভূমিতে তুর্কি বাহিনীর সরাসরি কোনো যুদ্ধের মিশন নেই। মাহসুনের ভাষ্যমতে, "উত্তর সিরিয়ায় কোনো তুর্কি সামরিক ঘাঁটি বা সার্বভৌম ভূখণ্ডের ওপর তুর্কি নিয়ন্ত্রণের অস্তিত্ব নেই। তাদের উপস্থিতি কেবল মাত্র আমাদের নতুন সিরীয় সেনাবাহিনীকে সুসংগঠিত করা, প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং আধুনিকায়ন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।" তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে সিরীয় সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের তীব্র সংকট রয়েছে, যার ওপর আবার সম্প্রতি ইসরায়েলি হামলায় ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
সিরিয়ায় তুরস্কের জনসমর্থন ও সার্বভৌমত্ব:
সিরিয়ার জনগণের কাছে তুরস্কের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসিত বলে মন্তব্য করেন মাহসুন। তিনি বলেন, যুদ্ধের চরম সংকটময় দিনগুলোতে তুরস্ক যেভাবে সিরীয়দের পাশে দাঁড়িয়েছিল এবং আসাদ শাসনের পতনের শেষ দিন পর্যন্ত সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছিল, সেজন্য দেশটির উত্তরাঞ্চলে আঙ্কারার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। তবে একই সাথে তিনি মনে করিয়ে দেন যে, সিরিয়া একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। দেশের অভ্যন্তরীণ ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত "সিরীয়দের নিজেদের, এতে অন্য কারো কর্তৃত্ব নেই" বলে তিনি জোর দাবি জানান।
ইসরায়েলের নির্বাচনী রাজনীতি ও হামলা:
সম্প্রতি সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের আবু আল-দুহুর সামরিক বিমানবন্দরে ইসরায়েলের বিমান হামলার কঠোর সমালোচনা করেন মাহসুন। তিনি এই হামলাকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং আসন্ন ২৭শে অক্টোবরের নেসেট (ইসরায়েলি সংসদ) নির্বাচনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত বলে মনে করেন।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক অবস্থান টিকিয়ে রাখতে এবং লিকুদ পার্টির নির্বাচনী সমর্থন পুনরুদ্ধার করতে আঞ্চলিক উত্তেজনা জিইয়ে রাখছেন বলে মাহসুন মন্তব্য করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "সিরিয়া এবং সিরিয়ার জনগণ কারও সাথে নতুন করে যুদ্ধ চায় না। আমরা শান্তি চাই, তবে সেই শান্তি হতে হবে ১৯৬৭ সাল থেকে দখলকৃত গোলান মালভূমি এবং সিরীয় ভূখণ্ড ফেরত দেওয়ার ভিত্তিতে।"
আঙ্কারার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া:
ইসরায়েলি অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আঙ্কারা জানিয়েছে, সিরিয়ার সরকারের সাথে তাদের সকল ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা সম্পূর্ণরূপে বৈধ এবং এটি একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। তুরস্কের রাষ্ট্রপতির যোগাযোগ অধিদপ্তর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নেতানিয়াহুর সরকার তাদের নির্বাচনী ফায়দা হাসিল করতে কৃত্রিম 'নিরাপত্তা ঝুঁকি' তৈরি করছে এবং তুরস্ককে নতুন হুমকি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করতে চাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশও নেতানিয়াহু সরকারের এই আগ্রাসী নীতির সমালোচনা করেছে। ইসরায়েলি চ্যানেল ১২-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে তুরস্কের বিরুদ্ধে অযাচিত উত্তেজনা সৃষ্টি না করার পরামর্শ দিয়েছেন।
মতামত