বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কওমী টাইমস

এক সপ্তাহ পর স্বজনদের জীবিত পাওয়ার আশা ছেড়ে খড়ের পুতুল পুড়িয়ে শেষকৃত্য সম্পন্ন; জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য উন্নত বিশ্বের দায়বদ্ধতা ও আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান নেপালের প্রধানমন্ত্রীর।

নেপালে নিখোঁজ হাজারো মানুষের জন্য প্রতিকী শেষকৃত্য পালন করছেন স্বজনেরা


কওমী টাইমস ডেস্ক
কওমী টাইমস ডেস্ক
প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নেপালে নিখোঁজ হাজারো মানুষের জন্য প্রতিকী শেষকৃত্য পালন করছেন স্বজনেরা

হিমালয় কন্যা নেপালে গত ২৬ আগস্ট এক নজিরবিহীন প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে যায়। উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহের একাংশ ভেঙ্গে পড়ার ফলে জমে থাকা জমাট বরফ, বিশালাকার পাথর ও ধ্বংসাবশেষ সহ হিমাঙ্কের নীচের তাপমাত্রার পানির এক বিশাল ঢেউ চীন-নেপাল সীমান্ত পেরিয়ে গড়িয়ে পড়ে নদী উপত্যকায়। এ প্রলয়ঙ্করি পাহাড়ি ঢলে মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে শত শত বাড়িঘর ও গ্রাম।

টানা এক সপ্তাহ ধরে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র, হাসপাতাল ও মর্গে মর্গে খুঁজেও প্রিয়জনদের কোনো সন্ধান না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আশা ছেড়ে দিয়েছেন স্বজনেরা। হিন্দু ধর্মানুষ্ঠান মেনে মৃতদেহের অনুপস্থিতিতে খড়ের তৈরি প্রতিকৃতি (পুতুল) দাহ করে তাঁদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা শুরু হয়েছে। নূয়াকোটের ত্রিশূলি নদীর তীরে চোখের জলে ভাসছিলেন দোলমা নেওয়ার তামাং। চীন সীমান্তে কাজ করতে যাওয়া স্বামীর প্রতীকী দাহ করার পর তিনি অশ্রুসজল কণ্ঠে এএফপি-কে বলেন, "তাঁর আত্মা যেন মুক্তি পায়, তিনি যেখানেই থাকুন যেন শান্তিতে থাকতে পারেন—সেই জন্যই আমাদের এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করতে হলো। আমি বারবার তাঁকে ফোন করেছিলাম, কিন্তু তিনি আর কখনো ফোন ধরেননি।"

ভয়াবহ এ দুর্যোগের এক সপ্তাহ পার হলেও নেপালি উদ্ধারকর্মীরা কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে জীবিতদের উদ্ধারে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গগুলোতে মিটার মিটার পুরু কাদার আস্তরণ জমে আছে, যেখানে এখনও ড্রিলিং ও ক্ষণস্থায়ী বিস্ফোরক ব্যবহার করে উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত কেবল মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তবে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খেনাল আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, "অলৌকিক ঘটনা ঘটতেই পারে। এই মুহূর্তে আমি আশা পুরোপুরি ছেড়ে দিতে চাই না।"

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, নেপালে এখন পর্যন্ত ১,১১৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৩,৯১৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে চীনা অংশের তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যু ও ৫৪৬ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উভয় দেশ মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ১,১৩০ এবং নিখোঁজ প্রায় ৪,৪৬২ জন। নিখোঁজদের মধ্যে ৩০টিরও বেশি দেশের ৮০০ জনেরও বেশি বিদেশী নাগরিক রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে পর্বতারোহণে আসা পর্যটক এবং তিব্বতের পবিত্র কৈলাশ পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাওয়া পুণ্যার্থীরা অন্তর্ভুক্ত।

নেপালের হাসপাতালগুলোর মর্গে লাশের স্তূপ জমে যাওয়ায় ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর নাম না জানা শত শত মরদেহ গণকবর দেওয়া হচ্ছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় সতর্ক করে বলেছেন, হিমালয় অঞ্চল বৈশ্বিক উষ্ণায়নের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে নেপালের অবদান নগণ্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম পরিণতি তাঁদেরই সহ্য করতে হচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন, "জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সংকট, আর এই দুর্যোগ মোকাবিলা ও পুনর্গঠনও পুরো বিশ্বের যৌথ দায়িত্ব।"

দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের জেরে এক বছর আগে সরকার পতনের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি পার করা ক্ষুদ্র অর্থনীতির নেপালের জন্য এ বিপুল ক্ষত কাটিয়ে ওঠা অত্যন্ত কঠিন। নেপাল সরকার সতর্ক করেছে যে, সড়ক, জলবিদ্যুৎ ও অবকাঠামো পুনর্গঠনে কয়েক শত কোটি ডলারের প্রয়োজন হবে।

বিষয় : নেপাল

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


নেপালে নিখোঁজ হাজারো মানুষের জন্য প্রতিকী শেষকৃত্য পালন করছেন স্বজনেরা

প্রকাশের তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

হিমালয় কন্যা নেপালে গত ২৬ আগস্ট এক নজিরবিহীন প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে যায়। উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহের একাংশ ভেঙ্গে পড়ার ফলে জমে থাকা জমাট বরফ, বিশালাকার পাথর ও ধ্বংসাবশেষ সহ হিমাঙ্কের নীচের তাপমাত্রার পানির এক বিশাল ঢেউ চীন-নেপাল সীমান্ত পেরিয়ে গড়িয়ে পড়ে নদী উপত্যকায়। এ প্রলয়ঙ্করি পাহাড়ি ঢলে মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে শত শত বাড়িঘর ও গ্রাম।

টানা এক সপ্তাহ ধরে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র, হাসপাতাল ও মর্গে মর্গে খুঁজেও প্রিয়জনদের কোনো সন্ধান না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আশা ছেড়ে দিয়েছেন স্বজনেরা। হিন্দু ধর্মানুষ্ঠান মেনে মৃতদেহের অনুপস্থিতিতে খড়ের তৈরি প্রতিকৃতি (পুতুল) দাহ করে তাঁদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা শুরু হয়েছে। নূয়াকোটের ত্রিশূলি নদীর তীরে চোখের জলে ভাসছিলেন দোলমা নেওয়ার তামাং। চীন সীমান্তে কাজ করতে যাওয়া স্বামীর প্রতীকী দাহ করার পর তিনি অশ্রুসজল কণ্ঠে এএফপি-কে বলেন, "তাঁর আত্মা যেন মুক্তি পায়, তিনি যেখানেই থাকুন যেন শান্তিতে থাকতে পারেন—সেই জন্যই আমাদের এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করতে হলো। আমি বারবার তাঁকে ফোন করেছিলাম, কিন্তু তিনি আর কখনো ফোন ধরেননি।"

ভয়াবহ এ দুর্যোগের এক সপ্তাহ পার হলেও নেপালি উদ্ধারকর্মীরা কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে জীবিতদের উদ্ধারে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গগুলোতে মিটার মিটার পুরু কাদার আস্তরণ জমে আছে, যেখানে এখনও ড্রিলিং ও ক্ষণস্থায়ী বিস্ফোরক ব্যবহার করে উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত কেবল মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তবে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খেনাল আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, "অলৌকিক ঘটনা ঘটতেই পারে। এই মুহূর্তে আমি আশা পুরোপুরি ছেড়ে দিতে চাই না।"

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, নেপালে এখন পর্যন্ত ১,১১৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৩,৯১৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে চীনা অংশের তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যু ও ৫৪৬ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উভয় দেশ মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ১,১৩০ এবং নিখোঁজ প্রায় ৪,৪৬২ জন। নিখোঁজদের মধ্যে ৩০টিরও বেশি দেশের ৮০০ জনেরও বেশি বিদেশী নাগরিক রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে পর্বতারোহণে আসা পর্যটক এবং তিব্বতের পবিত্র কৈলাশ পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাওয়া পুণ্যার্থীরা অন্তর্ভুক্ত।

নেপালের হাসপাতালগুলোর মর্গে লাশের স্তূপ জমে যাওয়ায় ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর নাম না জানা শত শত মরদেহ গণকবর দেওয়া হচ্ছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় সতর্ক করে বলেছেন, হিমালয় অঞ্চল বৈশ্বিক উষ্ণায়নের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে নেপালের অবদান নগণ্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম পরিণতি তাঁদেরই সহ্য করতে হচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন, "জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সংকট, আর এই দুর্যোগ মোকাবিলা ও পুনর্গঠনও পুরো বিশ্বের যৌথ দায়িত্ব।"

দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের জেরে এক বছর আগে সরকার পতনের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি পার করা ক্ষুদ্র অর্থনীতির নেপালের জন্য এ বিপুল ক্ষত কাটিয়ে ওঠা অত্যন্ত কঠিন। নেপাল সরকার সতর্ক করেছে যে, সড়ক, জলবিদ্যুৎ ও অবকাঠামো পুনর্গঠনে কয়েক শত কোটি ডলারের প্রয়োজন হবে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ