ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পাঠানো প্রস্তাবনার প্রেক্ষিতে প্রদান করা এক বিশেষ ফতোয়ায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতীব ও মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়ার আমীনুত তালীম মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক জানিয়েছেন, ‘জীবনস্বত্ব সংরক্ষিত রেখে হেবা’ করার প্রস্তাব ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অবৈধ ও বাতিল। তিনি স্পষ্ট করেন যে, মুসলিম উত্তরাধিকার আইন একটি অপরিবর্তনীয় ফরয বিধান এবং সামাজিক অজুহাতে কুরআন-সুন্নাহর বণ্টননীতি পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই।
সম্পত্তি হস্তান্তরে ‘জীবনস্বত্ব সংরক্ষিত রেখে হেবা’ (দান) করার প্রস্তাবকে কুরআন-সুন্নাহ ও ইসলামী শরিয়তের পরিপন্থী এবং বাতিল বলে ফতোয়া দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ফকীহ ও মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকার আমীনুত তালীম মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো একটি লিখিত চিঠির প্রাতিষ্ঠানিক জবাবে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতীব এ ফতোয়া প্রদান করেন।
প্রস্তাবনার প্রেক্ষাপট ও আপত্তি
মোঃ আশিকুল ইসলাম নামক এক আবেদনকারীর প্রস্তাবনার ভিত্তিতে ধর্ম মন্ত্রণালয় এ মতামত আহ্বান করে। প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়, বর্তমান সমাজে মৃত ব্যক্তির কোনো পুত্রসন্তান না থাকলে কন্যারা নির্ধারিত অংশ (অর্ধেক বা দুই-তৃতীয়াংশ) পাওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি ‘আসাবা’ হিসেবে মৃতের ভাই বা দূরবর্তী পুরুষ আত্মীয়দের কাছে চলে যায়। বাস্তবে এসব আত্মীয়রা অনেক সময় মৃতের পরিবার বা কন্যাদের দেখভাল করেন না। অন্যদিকে জীবদ্দশায় সাধারণ হেবা করলে পিতা-মাতা নিজের সম্পত্তির মালিকানা হারিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন। এই প্রেক্ষাপটে দাতা জীবদ্দশায় আয় ও ব্যবস্থাপনা ভোগ করবেন এবং মৃত্যুর পর সম্পত্তি কন্যার কাছে হস্তান্তরিত হবে—এমন ‘জীবনস্বত্ব সংরক্ষিত হেবা’ চালুর প্রস্তাব করা হয়।
ইসলামী শরিয়তের অবস্থান ও ফতোয়ার মূল বক্তব্য
মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়ার ফতোয়ায় বলা হয়, এ প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নির্ধারিত মিরাস বা উত্তরাধিকার আইনের ওপর অন্যায্য সমালোচনা করা এবং শরিয়তপ্রদত্ত ‘আসাবা’র (নিকটতম পুরুষ আত্মীয়) প্রাপ্য হক থেকে তাদের বঞ্চিত করা।
অপরিবর্তনীয় ঐশী বিধান: পুত্রসন্তান না থাকলে কন্যাদের নির্ধারিত অংশ দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পদ আসাবারা পাবে—এটি কুরআন ও হাদিসের অকাট্য বিধান। পবিত্র কুরআনের নির্দেশ ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ দ্বারা এটি প্রমাণিত। সমাজ পরিবর্তনের অজুহাতে এই ঐশী বিধান পুনর্বিবেচনা বা পরিবর্তন করার কোনো এখতিয়ার কারো নেই। কুরআনের মিরাস আইন লঙ্ঘন করা মারাত্মক অপরাধ এবং এর পরিণাম জাহান্নামের শাস্তির শামিল (সূরা নিসা: ১৩-১৪)।
আসাবার অধিকার ও ঐতিহাসিক উদাহরণ: সহীহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, রাসূল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন নির্ধারিত অংশীদারদের বণ্টনের পর অবশিষ্ট অংশ নিকটতম পুরুষ আত্মীয়কে দেওয়ার জন্য। উহুদ যুদ্ধে শহীদ সাদ বিন রবী (রা.)-এর ঐতিহাসিক ঘটনায় রাসূল (সা.) আল্লাহর নির্দেশে তাঁর দুই কন্যাকে দুই-তৃতীয়াংশ, স্ত্রীকে এক-অষ্টমাংশ এবং অবশিষ্ট সম্পত্তি মৃতের ভাইকে প্রদান করেছিলেন।
‘জীবনস্বত্ব সংরক্ষিত হেবা’ কেন বাাাতিল?
ফতোয়ায় এই প্রস্তাবটি অবৈধ ও বাতিল হওয়ার ৪টি প্রধান কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে:
১. মিরাস বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে হেবা: যে হেবার মূল উদ্দেশ্যই নির্ধারিত ওয়ারিশদের বঞ্চিত করা, তা শরিয়তে স্পষ্ট হারাম।
২. অসিয়তের রূপ ধারণ: জীবদ্দশায় হেবা করে মৃত্যুর পর কার্যকর করার শর্ত দেওয়া মূলত একটি ‘অসিয়ত’। আর ওয়ারিশের পক্ষে অসিয়ত করা ইসলামে সম্পূর্ণ বাতিল।
৩. দখল বা হস্তান্তরের (কবযা) অভাব: হেবা বৈধ হওয়ার জন্য গ্রহীতার কাছে সম্পত্তির পূর্ণ দখল ও মালিকানা হস্তান্তর করা শর্ত। নিজের দখলে রেখে মৃত্যুর পর মালিক বানানোর শর্ত শরিয়ত স্বীকার করে না।
৪. স্ববিরোধী শর্ত: হেবা হলো তাৎক্ষণিক মালিকানা হস্তান্তর। 'আমি বেঁচে থাকতে আয় ভোগ করব, কিন্তু মৃত্যুর পর তুমি পাবে'—এ জাতীয় স্ববিরোধী শর্ত যুক্ত হেবা আলেম ও ফকীহদের সর্বসম্মত মতে অকার্যকর।
ফতোয়ার সমাপনীতে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে, মুসলিম উত্তরাধিকার আইন একটি ইজমাসম্মত ঐশী বিধান। শাসক বা রাষ্ট্রের দায়িত্ব আল্লাহর দেওয়া আইন বাস্তবায়ন করা, নিজস্ব তৈরি আইন বান্দার ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়।
মতামত