ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর হাতে দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে অন্যায়ভাবে বন্দি থাকার পর অবশেষে মুক্তি পেয়ে নিজ ঘরে ফিরেছেন দুই লেবানিজ নাগরিক। শুক্রবার সীমান্ত ক্রসিংয়ে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির হাতে তাদের হস্তান্তর করা হয়। সেখান থেকে সেনা নজরদারি ও প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা শেষে তারা পরিবারের কাছে ফিরে যান। কোনো অপরাধ প্রমাণ ছাড়াই এতদিন ধরে বেসামরিক নাগরিকদের বন্দি রাখার ঘটনায় দখলদার ইসরায়েলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র পুনরায় প্রকাশ্যে এসেছে।
আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের মাধ্যমে হস্তান্তর ও মুক্তি শুক্রবার ইসরায়েল কর্তৃক লেবাননের নাগরিক হুসেইন আয়াশ ও আলি শৌর এবং সিরীয় নাগরিক আসাদ হাসিকি ও উইসাম সামাওয়িকে মুক্তি দেয়া হয়। রাস আল-নাকুরা সীমান্ত ক্রসিংয়ে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) কাছে তাদের হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তীতে তাদের টায়ার শহরে অবস্থিত লেবানীয় সেনাবাহিনীর 'বেনোয়া বারাকাত' ব্যারাকে নেয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শেষে আয়াশ নাবাতিয়েহ জেলার হারুফ শহরে তার পৈতৃক বাড়িতে এবং শৌর টায়ারের নিজ বাসভবনে পৌঁছান। তবে মুক্ত পাওয়া দুই সিরীয় নাগরিকের পরবর্তী গন্তব্য সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
এর আগে বৃহস্পতিবার প্রায় ১১ মাস বন্দি থাকার পর মালিক কামাল রাজি নামে এক লেবানিজ যুবককে মুক্তি দেয়া হয়। ফলে টানা দুই দিনে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়াল পাঁচে।
অপরাধহীন নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে যে, তদন্ত শেষে মুক্তিপ্রাপ্ত পাঁচজনের কারও বিরুদ্ধেই কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী বা সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাদেরকে অন্যায়ভাবে বা নির্বিচারে আটক রাখার কোনো যৌক্তিকতা ছিল না বলেও স্বীকার করে তেল আবিব। বহু মাস, এমনকি কারও কারও ক্ষেত্রে প্রায় এক বছর পর এই স্বীকারোক্তি প্রমান করে যে ইসরায়েল লেবাননের সীমানায় নিয়মিত স্বেচ্ছাচারী গ্রেপ্তার অভিযান চালিয়ে আসছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আন্তর্জাতিক আইনের অবমাননা লেবাননের মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই মুক্তিকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছে না। দেশটির জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, বেসামরিক এলাকায় সাধারণ কাজকর্ম করার সময়—যেমন নার্স, শ্রমিক, জেলে, মেষপালক ও নিজ গ্রামে ফিরতে থাকা সাধারণ মানুষদের ইসরায়েলি বাহিনী অন্যায়ভাবে তুলে নিয়ে গেছে।
কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সম্পূর্ণ বেসামরিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্যক্তিদের এভাবে গ্রেপ্তার করা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার সনদের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদের চরম লঙ্ঘন। একই সঙ্গে আটককৃতদের জোরপূর্বক গুম করা এবং চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ৭৬ নম্বর অনুচ্ছেদ ভেঙে লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি কারাগারে স্থানান্তর করা আন্তর্জাতিক অপরাধের শামিল।
জিম্মি বনাম যুদ্ধবন্দী ইসরায়েলি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নাবিহ আওয়াডার মতে, মুক্তির আগে পর্যন্ত লেবানন ভূখণ্ড থেকে অপহৃত ৩৬ জন বেসামরিক নাগরিক ইসরায়েলের কাছে বন্দি ছিলেন, যদিও তেল আবিব ৩৩ জনের কথা স্বীকার করছিল। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর নিজ গ্রামে ফেরার চেষ্টাকালে অন্তত ২১ জন বেসামরিক নাগরিককে ইসরায়েলি বাহিনী জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়।
লেবানন সরকার নিশ্চিত করেছে যে, অপহৃত এই বেসামরিক ব্যক্তিরা কোনো যুদ্ধবন্দী নন, বরং তারা জিম্মি। কারণ লেবাননের হাতে কোনো ইসরায়েলি বন্দি নেই যা বিনিময় করা যেতে পারে। নেতানিয়াহু প্রশাসন অতীত ইতিহাস টেনে এই বন্দিমুক্তিকে আশির দশকের পুরনো তল্লাশির সঙ্গে জোড়ার চেষ্টা করলেও, বৈরুতের সরকারি সূত্র জানায় যে রাষ্ট্রপতি জোসেফ আউনের ওয়াশিংটন কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের কারণেই ইসরায়েল এই মুক্তিতে বাধ্য হয়েছে। গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি আগ্রাসনে লেবাননে ৪,৩৫৪ জনেরও বেশি প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১২,৩২৫ জন আহত হয়েছেন, পাশাপাশি দশ লক্ষেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
মতামত