মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কওমী টাইমস

শান্তির নামে নতুন সামরিকীকরণ ও সফট পাওয়ারের আড়ালে অস্ত্র প্রতিযোগিতা; সংকটে ফিলিস্তিন ও উপসাগরীয় নিরাপত্তা

মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী যুদ্ধের আশঙ্কা: ওয়াশিংটন-ইসরাইল অক্ষ ও মুসলিম বিশ্ব


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী যুদ্ধের আশঙ্কা: ওয়াশিংটন-ইসরাইল অক্ষ ও মুসলিম বিশ্ব

মধ্যপ্রাচ্যে সাময়িক উত্তেজনার পরিবর্তে যুদ্ধ ও সংঘাত এখন আঞ্চলিক রাজনীতির এক স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাম্প্রতিক সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা এই প্রবণতাকে আরও উসকে দিচ্ছে। শান্তির দোহাই দিয়ে গড়ে ওঠা নতুন নিরাপত্তা কাঠামো বাস্তবে ফিলিস্তিনসহ মুসলিম বিশ্বের দীর্ঘস্থায়ী বিরোধগুলোকে উপেক্ষা করে এক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র প্রতিযোগিতার জন্ম দিচ্ছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের নীতিকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নিরাপত্তা মেরুকরণ শুরু হয়েছে। গত এক দশকে অর্থনীতি, কূটনীতি, বিনিয়োগ ও মানবিক সহায়তার মাধ্যমে আবুধাবি যে ‘সফট পাওয়ার’ বা কোমল শক্তি তৈরি করেছিল, তা এখন দ্রুত সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতার দিকে মোড় নিয়েছে। ফলে আবুধাবির আঞ্চলিক ভূমিকা শুধু অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং সামরিক শক্তির শক্তিতে পরিণত হচ্ছে।

২০২০ সালের বিতর্কিত আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের পর ইসরাইল ও আমিরাতের মধ্যকার সম্পর্ক অভূতপূর্ব গতিতে বিস্তৃত হয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বাইরে গিয়ে নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এখন চরম গভীরতায় পৌঁছেছে। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (RUSI) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) কাঠামোর সাথে ইসরাইলকে সংযুক্ত করার পরই ইসরাইল-আমিরাত নিরাপত্তা অক্ষ জোরালো রূপ নেয়।

তবে কেবল দ্বিপক্ষীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে এই ভূরাজনীতি ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে সৌদি আরব, আমিরাত ও কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তার তথাকথিত প্রধান গ্যারান্টর হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ও সংঘাত প্রমাণ করেছে—যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তার নিজস্ব কৌশলগত অগ্রাধিকারই প্রধান, মিত্রদের নিরাপত্তা নয়। এ কারণে উপসাগরীয় মুসলিম দেশগুলো এখন ওয়াশিংটনের ‘নিরাপত্তা ছাতার’ ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপত্তার মূল উত্তর যদি হয় কেবল আরও অস্ত্র, সামরিক ঘাঁটি ও প্রতিরক্ষা চুক্তি, তবে তা নিরাপত্তাহীনতা দূর না করে সংঘাতের অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে। এক মুসলিম দেশের অস্ত্র প্রতিযোগিতা বা ইসরাইলের সাথে জোট অন্য দেশের কাছে হুমকি হয়ে দাঁড়াবে, যা পুরো অঞ্চলে এক বিপজ্জনক অস্ত্র প্রতিযোগিতার চক্র তৈরি করছে।

ইরানকে কেন্দ্র করে বাড়তে থাকা উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সংঘাতের প্রভাবে সমুদ্রপথ এবং উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামো এখন চরম হুমকির মুখে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে নতুন বিধিনিষেধ এবং জ্বালানি অবকাঠামো আক্রমণের হুমকির পটভূমিতে আমিরাত বিকল্প বাণিজ্যপথ ও বন্দর তৈরির চেষ্টা করছে।

এই পুরো সামরিকীকরণের কেন্দ্রে রয়েছে ফিলিস্তিন ইস্যু। আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের সমর্থকেরা অর্থনৈতিক নির্ভরতাকে শান্তির পথ হিসেবে দেখালেও, সমালোচক ও মুসলিম বিশ্বের বুদ্ধিজীবীদের স্পষ্ট বক্তব্য—ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া শুধু রাষ্ট্রগুলোর চুক্তি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ কিংবা সংঘাতের মূল কারণ দূর করতে পারবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং ইসরাইলের সাথে আরব দেশগুলোর সম্পর্কের পরিধি বাড়ানোর মাধ্যমে যে নতুন নিরাপত্তা রূপরেখা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে, তা মধ্যপ্রাচ্যকে সামরিক জোট ও পাল্টা প্রতিরোধের চক্রে বন্দি করার রূপরেখা মাত্র। মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কেবল ওয়াশিংটন, তেল আবিব বা আবুধাবি নির্ধারণ করবে না; বরং ইরান, সৌদি আরব, কাতার, তুরস্কসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

বিষয় : ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬


মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী যুদ্ধের আশঙ্কা: ওয়াশিংটন-ইসরাইল অক্ষ ও মুসলিম বিশ্ব

প্রকাশের তারিখ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

মধ্যপ্রাচ্যে সাময়িক উত্তেজনার পরিবর্তে যুদ্ধ ও সংঘাত এখন আঞ্চলিক রাজনীতির এক স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাম্প্রতিক সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা এই প্রবণতাকে আরও উসকে দিচ্ছে। শান্তির দোহাই দিয়ে গড়ে ওঠা নতুন নিরাপত্তা কাঠামো বাস্তবে ফিলিস্তিনসহ মুসলিম বিশ্বের দীর্ঘস্থায়ী বিরোধগুলোকে উপেক্ষা করে এক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র প্রতিযোগিতার জন্ম দিচ্ছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের নীতিকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নিরাপত্তা মেরুকরণ শুরু হয়েছে। গত এক দশকে অর্থনীতি, কূটনীতি, বিনিয়োগ ও মানবিক সহায়তার মাধ্যমে আবুধাবি যে ‘সফট পাওয়ার’ বা কোমল শক্তি তৈরি করেছিল, তা এখন দ্রুত সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতার দিকে মোড় নিয়েছে। ফলে আবুধাবির আঞ্চলিক ভূমিকা শুধু অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং সামরিক শক্তির শক্তিতে পরিণত হচ্ছে।

২০২০ সালের বিতর্কিত আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের পর ইসরাইল ও আমিরাতের মধ্যকার সম্পর্ক অভূতপূর্ব গতিতে বিস্তৃত হয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বাইরে গিয়ে নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এখন চরম গভীরতায় পৌঁছেছে। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (RUSI) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) কাঠামোর সাথে ইসরাইলকে সংযুক্ত করার পরই ইসরাইল-আমিরাত নিরাপত্তা অক্ষ জোরালো রূপ নেয়।

তবে কেবল দ্বিপক্ষীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে এই ভূরাজনীতি ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে সৌদি আরব, আমিরাত ও কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তার তথাকথিত প্রধান গ্যারান্টর হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ও সংঘাত প্রমাণ করেছে—যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তার নিজস্ব কৌশলগত অগ্রাধিকারই প্রধান, মিত্রদের নিরাপত্তা নয়। এ কারণে উপসাগরীয় মুসলিম দেশগুলো এখন ওয়াশিংটনের ‘নিরাপত্তা ছাতার’ ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপত্তার মূল উত্তর যদি হয় কেবল আরও অস্ত্র, সামরিক ঘাঁটি ও প্রতিরক্ষা চুক্তি, তবে তা নিরাপত্তাহীনতা দূর না করে সংঘাতের অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে। এক মুসলিম দেশের অস্ত্র প্রতিযোগিতা বা ইসরাইলের সাথে জোট অন্য দেশের কাছে হুমকি হয়ে দাঁড়াবে, যা পুরো অঞ্চলে এক বিপজ্জনক অস্ত্র প্রতিযোগিতার চক্র তৈরি করছে।

ইরানকে কেন্দ্র করে বাড়তে থাকা উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সংঘাতের প্রভাবে সমুদ্রপথ এবং উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামো এখন চরম হুমকির মুখে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে নতুন বিধিনিষেধ এবং জ্বালানি অবকাঠামো আক্রমণের হুমকির পটভূমিতে আমিরাত বিকল্প বাণিজ্যপথ ও বন্দর তৈরির চেষ্টা করছে।

এই পুরো সামরিকীকরণের কেন্দ্রে রয়েছে ফিলিস্তিন ইস্যু। আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের সমর্থকেরা অর্থনৈতিক নির্ভরতাকে শান্তির পথ হিসেবে দেখালেও, সমালোচক ও মুসলিম বিশ্বের বুদ্ধিজীবীদের স্পষ্ট বক্তব্য—ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া শুধু রাষ্ট্রগুলোর চুক্তি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ কিংবা সংঘাতের মূল কারণ দূর করতে পারবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং ইসরাইলের সাথে আরব দেশগুলোর সম্পর্কের পরিধি বাড়ানোর মাধ্যমে যে নতুন নিরাপত্তা রূপরেখা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে, তা মধ্যপ্রাচ্যকে সামরিক জোট ও পাল্টা প্রতিরোধের চক্রে বন্দি করার রূপরেখা মাত্র। মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কেবল ওয়াশিংটন, তেল আবিব বা আবুধাবি নির্ধারণ করবে না; বরং ইরান, সৌদি আরব, কাতার, তুরস্কসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ